শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের বীজ বপন করা এক প্রত্যয়ী নারী: নিখাত ফাতিমা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
নিখাত ফাতিমা
নিখাত ফাতিমা
 
শ্রীলতা এম

ধন-সম্পদ বা প্রাচুর্য নয়, সমাজ পরিবর্তনের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে থাকে মানুষের সময়, মানসিক দৃঢ়তা, সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষার মধ্যে। আর সেই শিক্ষা যখন একজন সচেতন ও প্রত্যয়ী নারীর হাতে পৌঁছয়, তখন সমাজ রূপান্তরের যাত্রা আরও দ্রুত ও গভীর হয়ে ওঠে। এই সত্যের উজ্জ্বল উদাহরণ নিখাত ফাতিমা, যিনি গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা ও সমাজসেবার মাধ্যমে অসংখ্য নারী ও তরুণ-তরুণীর জীবনে আলোর দিশা দেখিয়ে চলেছেন।
 
নিখাত ফাতিমা সোয়াইল চেন্নাইয়ের এমডব্লিউএ ম্যাট্রিকুলেশন স্কুলের প্রধান। তিনি একাডেমি ফর উইমেন-এর সহ-সভাপতি হওয়ার পাশাপাশি মুসলিম যুবক-যুবতী ও নারীদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সংগঠনের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে কাজ করছেন।
 
MWA স্কুলের শিখর্থীদের সঙ্গে
 
জয়ললিতা, জয়ন্তী নটরাজন ও কানিমোঝির মতো খ্যাতনামা প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দেওয়া সেক্রেড হার্ট স্কুলে ছাত্রী থাকা অবস্থাতেই তাঁর এই যাত্রার সূচনা। এনসিসি ক্যাডেট হিসেবে তিনি একটি অনাথ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রকল্পে অংশ নেন। এই অভিজ্ঞতাই আজীবন শিক্ষা ও সমাজসেবার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহের বীজ রোপণ করে।
 
এরপর তিনি শিক্ষাগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পাঁচটি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন এবং প্রায় ১,৫০০ ছাত্রছাত্রী নিয়ে একটি বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। অল ইন্ডিয়া হাজ (AIH)-এর অধীনে একাডেমি ফর উইমেন-এর সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নিখাত জানান, তামিলনাড়ুর মেয়েদের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি টানা ৩০ বছর ধরে কাজ করেছেন।
 
শৈশব থেকেই শিশু ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন তিনি লালন করেছিলেন, তা আজ শতাধিক তরুণ-তরুণী; বিশেষত মেয়েদের, জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। অল্প বয়সেই তিনি একাডেমির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। এই প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টিদের মধ্যে ছিলেন আর্কটের নবাব এবং তাঁর দাদু-দিদিমা; যাঁদের পরিবার নবাবদের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল।
 
যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, একজন নারীর পক্ষে এমন অবস্থানে পৌঁছনো কি সহজ ছিল? উত্তরে তিনি বলেন, “এটা কখনোই সহজ ছিল না। কিন্তু যখন সুযোগ আসে, তখন মেয়েদের ক্ষমতায়িত করা যায় এবং নারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।”
 
MWA স্কুলের শ্রেণীকক্ষ
 
তিনি এই ভাবনাটি তাঁর রিয়েল এস্টেট ব্যবসার উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, যা একই সঙ্গে একটি ব্যবসা ও প্রশিক্ষণ মডেল হিসেবে কাজ করে। তিনি বলেন, “আমি এমন তরুণ-তরুণীদের খুঁজে বের করি যাদের চাকরির প্রয়োজন। পাশাপাশি একক মা, বিধবা ও সমাজের সেই মানুষগুলোকেও চিহ্নিত করি যাদের ডিগ্রি নেই এবং নিয়মিত কাজ থেকে বঞ্চিত। তারা প্রথমে ২০,০০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করে। প্রশিক্ষণের পর আমি তাদের এমন চাকরি দিই, যেখানে তারা মাসে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারে।”
 
তিনি আরও বলেন, ইংরেজি ভাষা শেখা তরুণ-তরুণী উভয়ের জন্যই এক শক্তিশালী ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। ২০২৭ সালে শতবর্ষ পূর্ণ করতে চলা তাঁর বিদ্যালয়ে ২০ শতাংশ ছাত্রছাত্রীকে বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়া হয়। এখানে একটি সমন্বিত শিক্ষামডেল অনুসরণ করা হয়, যেখানে খেলাধুলা, ধর্মীয় শিক্ষা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং রাজ্য পাঠ্যক্রমের উপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মতে, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় তামিলনাড়ুতে মুসলিম নারীদের সামাজিক মর্যাদা উন্নত হওয়ার পেছনে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 
পেরিয়ার আন্দোলন ও দ্রাবিড় সংস্কৃতির সর্বাঙ্গীণ চরিত্রকেই তিনি এর কৃতিত্ব দেন; যেখানে মানুষ আগে নিজেকে তামিল হিসেবে পরিচয় দেয়। তিনি বলেন, “দক্ষিণ ভারতের মানুষ সুযোগের জন্য সংগ্রাম করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল।”
 
তিনি আরও বলেন, “উত্তরের তুলনায় এখানে মুসলিমদের অবস্থান ভালো এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক সাধারণত শান্তিপূর্ণ। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ সমাজের মধ্যে ‘নিজে বাঁচো, অন্যকেও বাঁচতে দাও’; এই মনোভাব প্রবল। উত্তর ভারত থেকে বিভাজনমূলক ধারণা ঢুকলেই সমস্যা দেখা দেয়।”
 
MWA স্কুলে একটি অনুষ্ঠানে
 
তামিলনাড়ু অর্গানাইজেশন অব মুসলিম এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনস (OMEIAT)-এর বোর্ড সদস্য হিসেবে তিনি রাজ্যজুড়ে ৩০০টি সংযুক্ত বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সেক্রেড হার্ট স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী জয়ললিতা, জয়ন্তী নটরাজন ও কানিমোঝির মতো বিশিষ্ট সদস্যদের সঙ্গে নিখাত নিজেও এর প্রাক্তন ছাত্র সংসদ SHAA-এর সভাপতি ছিলেন।
 
তবে অল ইন্ডিয়া হাজ (AIH)-এর অধীনে মহিলা একাডেমির নেতৃত্বকেই তিনি তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান বলে মনে করেন। এই একাডেমি মেয়েদের জন্য মধ্যম স্তরের পাঠ্যক্রম পরিচালনা করে এবং ১৮০ জন ছাত্রীকে কাউন্সেলিং, ফ্যাশন ডিজাইন ও টেইলারিংয়ের মতো ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করে।
 
নিখাতের মতে, সামাজিক উদ্যোগ চালাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, “টাকার চেয়ে সময় বেশি দরকার। সঙ্গে চাই ভালো আর্থিক ব্যবস্থাপনা। লক্ষ্য শুধু দান করা নয়, আয় সৃষ্টিও হতে হবে।” এই দর্শনই তিনি তাঁর প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনুসরণ করেন। ছাত্রছাত্রীদের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা জোগাড় করা হয় এবং ক্ষতি ছাড়া ব্রেক-ইভেনে পৌঁছনোর লক্ষ্য স্থির করা হয়। সাফল্যের জন্য তিনি চাকরির বাজারের চাহিদাও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, “মনোবিজ্ঞানের শিক্ষকদের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। এক বছরের ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা মেয়েরা বিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহজেই চাকরি পেয়ে যায়।”
 
MWA স্কুলে ফ্যান্সি ড্রেস প্রতিযোগিতা
 
নিজের ধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্মকে বোঝার গুরুত্বের উপরও তিনি জোর দেন। তাঁর কথায়, “আজকের শিশুদের তুলনায় আমরা রামায়ণ সম্পর্কে বেশি জানতাম। এতে চিন্তার পরিসর বাড়ে। সেই কারণেই আমরা ধর্মশিক্ষা দিই, কারণ কোনো ধর্মই ঘৃণার শিক্ষা দেয় না।”
 
নিখাত মনে করেন, অজ্ঞতাই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সন্দেহ ও ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয়। ইসলাম প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখ্যা করেন, “‘সালাম ওয়ালাইকুম’ অর্থ হলো, অন্যের জন্য শান্তি কামনা করা। যে শান্তি কামনা করে, সে কীভাবে কারও ক্ষতি চাইতে পারে?”
 
৫৫ বছর বয়সী, তিন সন্তানের জননী ও এক নানী হিসেবে নিখাত ফাতিমা এখন ধীরে ধীরে নিজের অধিকাংশ দায়িত্ব থেকে সরে আসতে চান। দীর্ঘ দশকের সেবাযাত্রার দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে তিনি বলেন, “আমি ইতিমধ্যেই বহু সংগঠনের নেতৃত্বের দায়িত্ব অন্যদের হাতে তুলে দিয়েছি।”