শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও যার পথ আটকাতে পারেনি, আড়াই ফুট উচ্চতার সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন ওয়াজির মহম্মদ

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 8 h ago
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও যার পথ আটকাতে পারেনি, আড়াই ফুট উচ্চতার সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন ওয়াজির মহম্মদ
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও যার পথ আটকাতে পারেনি, আড়াই ফুট উচ্চতার সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন ওয়াজির মহম্মদ
 
ফারহান ইজরাইলি / জয়পুর

উচ্চতা মাত্র আড়াই ফুট, ওজনও ২০ কিলোগ্রামের কম। জন্ম থেকেই এমন এক বিরল রোগে আক্রান্ত তিনি, যার কোনও চিকিৎসা এখনও গোটা বিশ্বে নেই। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতাকে অবশ্য নিজের জীবনের বাধা হতে দেননি জয়পুরের চার দরওয়াজা এলাকার বাসিন্দা ওয়াজির মহম্মদ। কথা বলার সময় তাঁর আত্মবিশ্বাসই যেন সেই লড়াইয়ের প্রমাণ। ‘আওয়াজ - দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় ওয়াজির স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আমি নিজেকে শুধু ছোট রিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না, কারণ এর থেকেও অনেক বড় সাফল্য অর্জন করার সাহস আমার রয়েছে।”
 
গুরুতর শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ওয়াজির নিজেকে কখনও অসহায় মনে করেননি। কারও করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকা বা কারও কাছে সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে তিনি নিজের সাহসের উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবে নিজের কনটেন্ট তৈরি করা শুরু করেন। আজ নিজের একাগ্রতার জোরে তিনি একজন পরিচিত ডিজিটাল ক্রিয়েটর এবং সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছেন। নিজের সমস্ত খরচ তিনি নিজেই বহন করেন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে যথেষ্ট উপার্জনও করছেন।
 

যখন হাড় তুলোর মতো নরম হয়ে যায়
 
২০০৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করা ওয়াজির জন্মের পর থেকেই অস্টিওজেনেসিস ইমপারফেক্টা (Osteogenesis Imperfecta - Brittle Bone Disease) নামের একটি গুরুতর রোগে আক্রান্ত। এই রোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তুলো চেপে ধরলে যেভাবে চ্যাপ্টা হয়ে যায়, তাঁর হাড়ও ঠিক ততটাই ভঙ্গুর। হাড় ভেঙে যাওয়ার পর তা সঙ্গে সঙ্গে জোড়া লাগে না এবং ফ্র্যাকচার না হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঁকা হতে শুরু করে। চিকিৎসকদের মতে, এটি একটি জিনগত রোগ এবং এর কোনও স্থায়ী চিকিৎসা নেই। তাঁর বোন খুশনুমাও একই রোগে আক্রান্ত।
 
রোগের ভয়ে ওয়াজির প্রথম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত কখনও স্কুলে যেতে পারেননি। তাঁর মা তসলিম আখতারের সবসময় ভয় ছিল, খেলতে থাকা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তিনি হয়তো আঘাত পেতে পারেন বা তাঁর হাড় ভেঙে যেতে পারে। তাই দুই ভাই-বোনের প্রাথমিক শিক্ষা বাড়িতেই হয়েছিল। কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ওয়াজির স্কুলে যাওয়ার জন্য জেদ ধরেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে স্কুলে যাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মা ভয় পেয়েও তাঁকে অনুমতি দেন।
 
স্কুলের পরিবেশ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ভালো ছিল। সহপাঠী এবং শিক্ষকরা ওয়াজিরকে আন্তরিকভাবে আপন করে নেন। তাঁর কোঁকড়ানো চুলের জন্য সবাই আদর করে তাঁকে “ঘবরু” বলে ডাকতেন। ওয়াজির মনে করেন, কেউ কখনও তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা করেনি, বরং সবাই তাঁকে সাহায্যই করতেন। তবে আশপাশের কিছু মানুষ কটাক্ষ করে বলতেন, এমন অবস্থায় পড়াশোনা করে কী লাভ হবে! কিন্তু তাঁর পরিবার সবসময় ঢালের মতো তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। অলংকারের কাজের সঙ্গে যুক্ত বাবা আবরার মহম্মদ এবং ভাই আদিল মহম্মদ সবসময় তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন।
 
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন এবং ভাইরাল রিলের শুরু
 
দশম শ্রেণির পড়াশোনার জন্য ওয়াজির কোটায় যান এবং নিজের মামার কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন। দশম শ্রেণিতে ৫৯ শতাংশ নম্বর পাওয়ার পর তিনি একটি সরকারি স্কুল থেকে বিজ্ঞান শাখা (জীববিজ্ঞান) নিয়ে দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ‘NEET’ পরীক্ষায় বসেন, যদিও সফল হতে পারেননি। সেই সময়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়ে উঠেছিল, যার কারণে একই সঙ্গে পড়াশোনা এবং ভিডিও তৈরির কাজ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ওয়াজিরের কথায়, তাঁর দুটি স্বপ্ন ছিল, একটি হল বিখ্যাত হওয়া এবং অন্যটি হল চিকিৎসক হওয়া। এর মধ্যে একটি স্বপ্ন প্রায় পূরণ হয়েছে, কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নিজের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে চান।
 
ওয়াজির মহম্মদ
 
ভিডিও বানানোর যাত্রা ২০১৬ সালে Musically অ্যাপের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, যা পরে TikTok হয়ে যায়। সেই সময় ওয়াজিরের নিজের কোনও ফোন ছিল না। তিনি নিজের আত্মীয় ভাই ইজহারের মোবাইলের মাধ্যমে শখ করে ভিডিও বানাতেন। পরবর্তী সময়ে পড়াশোনার জন্য যখন একটি স্মার্টফোন পান, তখন ইনস্টাগ্রাম রিল তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
 
দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় বিখ্যাত কবি রাহাত ইন্দোরির একটি শায়েরির উপর তৈরি তাঁর একটি রিল হঠাৎ ভাইরাল হয়ে যায়। সেই ভিডিওটি লাখ লাখ ভিউ পায়। এরপর থেকেই যেন সাফল্যের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। তাঁর ভিডিও প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন থেকে ৩০ মিলিয়ন মানুষ দেখতে শুরু করেন। মাত্র আট দিনের মধ্যে তাঁর ফলোয়ারের সংখ্যা ৪,০০০ থেকে বেড়ে ৭৫,০০০ হয়ে যায়। সেই সময় পর্যন্ত তিনি বাড়ির মধ্যেই ভিডিও বানাতেন এবং এমনকি প্রতিবেশীরাও জানতেন না যে তাঁদের মধ্যেই একজন সোশ্যাল মিডিয়া তারকা লুকিয়ে রয়েছেন। পরে তাঁর ভাই এবং আত্মীয় ভাই প্রথমবারের মতো তাঁকে বাইরে নিয়ে গিয়ে শুট করতে শুরু করেন।
 
যখন অহংকার এবং স্ট্রাইকে রিচ কমিয়ে দিল

হঠাৎ পাওয়া এই সাফল্য সামলানো এতটা সহজ ছিল না। ওয়াজির কোনও দ্বিধা ছাড়াই স্বীকার করেন যে কম বয়সে পাওয়া এই খ্যাতির কারণে তাঁর মনে অজান্তেই কিছুটা অহংকারের ভাব ঢুকে পড়েছিল। এর মধ্যেই একটি প্রমোশনাল ভিডিওতে ইনস্টাগ্রামের কমিউনিটি গাইডলাইন ভঙ্গ হওয়ায় অ্যাকাউন্টে স্ট্রাইক আসে। যে অ্যাকাউন্টের রিচ একদিন ১০০ মিলিয়নে পৌঁছেছিল, সেটি দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করে।
 
২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়টা তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। ফলোয়ারের সংখ্যা ৭৫,০০০ থেকে কমে সরাসরি ৪৫,০০০-এ নেমে আসে। কিন্তু ওয়াজির হাল ছাড়েননি। তিনি বিশ্বাস করেন, নিজের ভুল স্বীকার করেই মানুষ জীবনে এগিয়ে যেতে পারে। হার মেনে নেওয়ার পরিবর্তে তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যান।
 
ওয়াজির মহম্মদ
 
পুরনো বন্ধুরাও এই কঠিন সময়ে তাঁর সঙ্গে ছিলেন। বন্ধু জিশানের মাধ্যমে তিনি ক্রিয়েটর সাকিবের সঙ্গে পরিচিত হন এবং দু’জনে মিলে কনটেন্ট তৈরি করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে অ্যাকাউন্ট থেকে স্ট্রাইক সরে যায়, ভিডিও আবার ভাইরাল হতে শুরু করে এবং ফলোয়ারের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
 
জাতীয় পরিচয় এবং ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম
 
আজ ওয়াজির মহম্মদকে বড় বড় অনুষ্ঠানে সেলিব্রিটি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। জয়পুরের বিড়লা অডিটোরিয়ামে তাঁকে ‘জয়পুর বেস্ট ক্রিয়েটর অ্যাওয়ার্ড ২০২৩’ দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছিল। এরপর ‘ইনফ্লুয়েন্সার বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। সম্প্রতি, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে গাজিয়াবাদে আয়োজিত একটি এনার্জি ড্রিঙ্ক ইভেন্টে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন, যেখানে তিনি নৃত্য প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করেন। এছাড়াও, জয়পুরে অনুষ্ঠিত স্ন্যাপচ্যাটের অফিসিয়াল ক্রিয়েটর মিটআপেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
 
বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে ওয়াজিরের ৩.৫ লাখেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে। ফেসবুকে প্রায় ১ লাখ মানুষ তাঁকে ফলো করেন এবং ইউটিউবেও ১৩ হাজারেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার যুক্ত হয়েছেন। তিনি এখনও পর্যন্ত ৫০০ থেকে ৬০০টি ভিডিও তৈরি করেছেন, যেগুলিতে গড়ে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত ভিউ আসে।
 
ওয়াজির মহম্মদ
 
তিনি অ্যাকশন, ড্রামা, কমেডি এবং ইমোশনাল স্টোরিটেলিং, সব ধরনের কনটেন্ট তৈরি করেন। শুটিং মোবাইলের মাধ্যমে হয় এবং এডিটিংয়ের কাজও তিনি নিজেই করেন, কারণ নিজের কাজে সৃজনশীলতার সঙ্গে কোনও ধরনের আপস করতে চান না। বাড়িতে ভিডিও শুট করার ক্ষেত্রে তাঁর বৌদি ফাহরিন তাঁকে সাহায্য করেন।
 
নিজের পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ওয়াজির আজ সমাজের সামনে একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। এখন তাঁর লক্ষ্য ‘বিগ বস’-এর মতো বড় রিয়েলিটি শো এবং বলিউডের রুপালি পর্দা। তাঁর জীবনের দর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট, “নিজের জন্য যত বড় স্বপ্ন দেখবেন, তত বড় সাফল্য অর্জন করতে পারবেন। কখনও ভাববেন না যে আপনার যাত্রা এতেই শেষ।”