ইছামতির পাড়ে শতাব্দী প্রাচীন পুজোকে ঘিরে আজও এক হয়ে যান হিন্দু-মুসলিম সহ সব সম্প্রদায়ের মানুষজন। অতীতের হ্যাজাকের আলো থেকে আধুনিক আলোকসজ্জায় মেতে উঠলেও কয়েক শো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পানিতরের দুর্গাপুজোর আবেগে পড়েনি সময়ের ছাপ। উল্টে বলা যায়, সময়ের হাত ধরে এই দুর্গাপুজো আজ হয়ে উঠেছে ধর্মের গণ্ডি ছাপিয়ে মিলন ও সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের পানিতর গ্রামের ইছামতির পাড়ে এই পুজোর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে অবিভক্ত বাংলার স্মৃতির সঙ্গে। স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের তরফে জানা যায়, তারিণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে নাকি এই পুজো শুরু হয়েছিল একচালা ঘর থেকেই। আয়োজন আর সময়ের হাত ধরে বদলেছে পুজোর পরিকাঠামো।
ইছামতির পাড়ে শতাব্দী প্রাচীন পুজো
দেখতে দেখতে এই দুর্গাপুজো একচালা ঘরের জায়গায় তৈরি হয়েছে পাকা মন্দির, সঙ্গে ধুনির ঘর। কিন্তু বলা যায় যুগের সঙ্গে পাল্লা দিলেও কিন্তু বদলায়নি এই পুজোর ঐতিহ্য, মানুষের আবেগ কিংবা বাঙালীর প্রিয় উৎসবের মূল সুর। উল্লেখ্য, এই বনেদী দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম স্ত্রী গৌরী দেবীর বাপের বাড়ির এই পুজো নিয়ে এখানকার স্থানীয়রা নানা কথা জানালেন। ইছামতি নদী আর এখানকার জনজীবনের সঙ্গে এই পুজোর গভীর সম্পর্কের কথাও উঠে আসে তাঁদের কথায়। এই স্মৃতিগুলোই যেন এই পুজোকে দিয়েছে আরও বাড়তি আকর্ষণ। পুজোর চার দিন ধরে বসিরহাটের পানিতর জুড়ে তৈরি হয় অন্য পরিবেশ। ষষ্ঠী, সপ্তমীর থেকে অষ্টমীর দিন এখানে ভিড় বাড়ে কয়েকগুণ। ঘোজাডাঙা সীমান্ত-সহ অন্য জেলা থেকেও প্রচুর দর্শনার্থীরা আসেন প্রতিমা দেখতে। তবে এই পুজোর সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্প্রীতির অনন্য নির্দশন।
বাড়ির পুরোনো একটি ছবি
স্থানীয়দের কথায়, বছরের পর বছর হিন্দু-মুসলিম সহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই পুজোয় একসঙ্গে অংশগ্রহণ করে আনন্দে মেতে ওঠেন। পুজোর আয়োজন থেকে প্রতিমা দর্শন, সর্বত্রই দেখা যায় সকলে একসঙ্গে মিলেমিশে থাকার ছবিটাকে।
আর বিসর্জনের দিন সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে আরও আবেগঘন। কাঁধে প্রতিমা নিয়ে ইছামতির দিকে এগিয়ে চলেন শত শত মানুষ। ইছামতিতে প্রতিমা বিসর্জনের পর একে অপরকে আলিঙ্গন করে চলে মিষ্টিমুখ। দীর্ঘদিনের এই প্রথাই যেন বলে দেয়, উৎসবের আনন্দের কোনও ধর্মীয় সীমানা নেই।
শতাব্দীর ইতিহাস পেরিয়ে পানিতরের এই পুজো তাই আজ আর শুধু কোনও পরিবারের পুজোতে সীমাবদ্ধ নেই। ইছামতির পাড়ে যা হয়ে উঠেছে মানুষের পুজো। এখানে এলে বোঝা যাবে, ইতিহাসের সঙ্গে হাত মেলায় সম্প্রীতি, আর ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে যায় ভ্রাতৃত্বের বার্তা।