‘Where is My Train’ থেকে ReginApp: এক সমস্যাকে সুযোগে বদলে সাফল্যের শিখরে আহমদ নিজাম
আমানা ফারুক / নয়াদিল্লি
আজকের দিনে আপনি যদি কোনও রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে প্রতি দু’জনের মধ্যে একজনের হাতে মোবাইল ফোন দেখতে পাবেন। মানুষ রেললাইনের দিকে কম এবং নিজেদের ফোনের স্ক্রিনের দিকে বেশি তাকিয়ে থাকে। তারা শুধু একটি জিনিসই চেক করছে, ‘আমার ট্রেন কোথায়’। আজ এটি খুবই সাধারণ একটি বিষয় বলে মনে হয়। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এই জাদুকরী অ্যাপের নেপথ্যের গল্পটা কী?
এই গল্প এমন এক যুবকের, যিনি নিজের সমস্যাকেই একটি বড় সুযোগে পরিণত করেছিলেন। আহমদ নিজাম মোহিউদ্দিন, এই সেই নাম, যিনি ভারতীয় রেলের কোটি কোটি যাত্রীর সফরকে আরও সহজ করে দিয়েছেন।
স্টেশনের সেই অস্থিরতা থেকেই জন্ম নিল বড় এক ভাবনা
সময়টা ২০১৫ সাল। আহমদ নিজামের কোথাও যাওয়ার জন্য ট্রেন ধরার কথা ছিল। তিনি সময়মতো স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিলেন, কিন্তু ভারতীয় রেলের ক্ষেত্রে যেমনটা প্রায়ই হয়, ট্রেন ছিল দেরিতে। প্ল্যাটফর্মে বসে থাকতে থাকতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। আহমদ বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন। সেই সময় রেলের অনুসন্ধান কাউন্টারে প্রচণ্ড ভিড় হতো। ফোনে ট্রেনের লাইভ লোকেশন জানার কোনও নির্ভুল উপায়ও ছিল না। ঠিক সেই সময় প্ল্যাটফর্মে বসে থাকা আহমদের মাথায় বিদ্যুতের মতো একটি ভাবনা ঝলকে উঠল।
সেই সময় উবার ও ওলার মতো ট্যাক্সি সংস্থাগুলি ভারতে নিজেদের পরিসর বাড়াচ্ছিল। এই অ্যাপগুলির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, আপনি নিজের ফোনেই দেখতে পারতেন আপনার ট্যাক্সি এই মুহূর্তে কোথায় রয়েছে এবং কতক্ষণে আপনার কাছে পৌঁছবে। আহমদ ভাবলেন, যদি রাস্তায় চলা একটি গাড়িকে ট্র্যাক করা যায়, তাহলে হাজার হাজার টন ওজনের এবং রেললাইনের উপর দিয়ে ছুটে চলা বিশাল ট্রেনকে কেন ট্র্যাক করা যাবে না? এই মুহূর্ত থেকেই “Where is My Train” অ্যাপের ভিত্তি তৈরি হয়।
“Where is My Train” অ্যাপ
ইন্টারনেটের অভাব আর মোবাইল টাওয়ারের জাদুকরী ফর্মুলা
আহমদ ২০১৩ সালে তাঁর সংস্থা “Sigmoid Labs” শুরু করেছিলেন। এই সংস্থা ডেটা ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করত। আহমদ তাঁর দলের সঙ্গে মিলে ট্রেন ট্র্যাকিং অ্যাপ নিয়ে কাজ শুরু করেন। শুরুর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রায় এক বছর ধরে তাঁরা শুধুই ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই সময় ভারতে আজকের মতো সবার হাতে সস্তা ইন্টারনেট ও 4G ডেটা ছিল না। অধিকাংশ এলাকাতেই নেটওয়ার্কের প্রবল সমস্যা ছিল।
এখানেই কাজে আসে আহমদের বুদ্ধিমত্তা। তিনি ভাবলেন, অ্যাপটি যদি শুধু ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে এটি কখনও সফল হতে পারবে না। তিনি এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করলেন, যা ইন্টারনেট ছাড়াও কাজ করতে পারে। তিনি মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল ব্যবহার করলেন। কোনও যাত্রী যখন ট্রেনের ভিতরে থাকেন, তখন তাঁর ফোন আশপাশের মোবাইল টাওয়ারগুলির সঙ্গে যুক্ত থাকে। আহমদের অ্যাপ এই ‘সেল টাওয়ার’ ডেটা ব্যবহার করে ট্রেনের সঠিক অবস্থান জানাতে শুরু করে। এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এখন যাত্রীরা ইন্টারনেট ছাড়াই জানতে পারতেন, তাঁদের ট্রেন পরবর্তী স্টেশনে কখন পৌঁছবে।
“Where is My Train” অ্যাপ
যখন গুগলের নজরে পড়ল এই দেশীয় প্রতিভা
আহমদের এই অ্যাপ দেখতে দেখতে সারা দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। লক্ষ লক্ষ মানুষ এটি ব্যবহার করতে শুরু করলেন। এর সরলতা এবং ইন্টারনেট ছাড়াই চলার বৈশিষ্ট্য বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রযুক্তি সংস্থা গুগলের নজর কেড়ে নেয়। সেই সময় গুগল তাদের “Next Billion Users” অভিযানে কাজ করছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন মানুষদের কাছে পৌঁছনো, যারা প্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন।
২০১৮ সালে একটি বড় খবর সামনে আসে। গুগল আহমদ নিজামের সংস্থা “Sigmoid Labs” এবং তাঁদের এই অ্যাপটি কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাজারে আলোচনা ছিল, এই চুক্তিটি প্রায় ৩০০ কোটি টাকায় হয়েছিল। যদিও উভয় পক্ষের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করা হয়নি, তবুও ভারতীয় স্টার্টআপ জগতের জন্য এটি ছিল একটি বড় সাফল্য। আহমদের এই অফলাইন ট্র্যাকিংয়ের ধারণায় গুগল এতটাই প্রভাবিত হয়েছিল যে, তারা এটিকে নিজেদের সিস্টেমের অংশ করে নেয়।
“Where is My Train” অ্যাপ
সাফল্যের শিখরে, তারপর নতুন এক শুরু
গুগলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর আহমদ নিজাম সেখানে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রায় চার বছর তিনি গুগলে নিজের পরিষেবা দেন। সেখানে তিনি বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিকে বোঝা এবং সেটিকে আরও উন্নত করার কাজে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আহমদের ভিতরের উদ্যোক্তা চুপ করে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তিনি গুগলের আরামদায়ক চাকরি ছেড়ে দেন। তাঁর মনে তখন নতুন কিছু করার অস্থিরতা।
২০২৩ সালে আহমদ তাঁর নতুন স্টার্টআপ “ReginApp” চালু করেন। আজকের দিনে যেখানে প্রত্যেকেই মোবাইলের আসক্তি নিয়ে সমস্যায় ভুগছেন, আহমদ সেই সমস্যারই সমাধান খুঁজে বের করেছেন। তাঁর এই নতুন অ্যাপ মানুষকে মোবাইলের আসক্তি কমাতে এবং একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে। এই অ্যাপ রিল ও শর্টসের মতো মনোযোগ বিচ্ছিন্নকারী ফিচারগুলিকে ব্লক করে।
আজ এই নতুন অ্যাপটিরও ১০ লক্ষের বেশি ব্যবহারকারী রয়েছে। আহমদের এই যাত্রা দেখিয়ে দেয়, আপনার কাছে যদি কোনও সমস্যার সঠিক সমাধান থাকে, তাহলে সাফল্য নিজেই আপনার কাছে এগিয়ে আসে। আহমদ নিজাম আজ কোটি কোটি ভারতীয়ের কাছে অনুপ্রেরণা, যিনি একটি সাধারণ প্রশ্নের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন।