শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
চলতি বছর রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। তূনমূল সরকার বিদায় নিয়েছে। রাজ্যে এখন এসেছে বিজেপি সরকার। সেই রকম পরিবর্তনের হাওয়াও এবার লেগেছে কুমোরটুলিতেও। গত ১০ বছরে রাজ্যে দুর্গাপুজো আর থিম সমার্থক হয়ে উঠেছে। তবে শিল্পীদের একাংশের মতে, এ বছর সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। থিমের ঠাকুরের পরিবর্তে চাহিদা বেশি সাবেকি প্রতিমার।
কুমোরটুলির নামকরা শিল্পী মিন্টু পালের কথায়, ‘‘এ বার পুজোয় সাবেকি ঠাকুরের চাহিদাই বেশি বলে মনে হচ্ছে। পুজো এ বার ভালই হবে বলে মনে হয়।’’
শিল্পী মন্টু পালের তৈরি সাবেকিয়ানার মূর্তি
সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, "থিমের মূর্তির চেয়ে বিদেশের মাটিতে ঐতিহ্যবাহী বা সাবেকিয়ানার প্রতিমার চাহিদা এবারও সবচেয়ে বেশি। এই সাবেকিয়ানার প্রতিমা এবারও আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সুবিধার জন্য এবং আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে এই মূর্তিগুলো সাধারণত মজবুত ফাইবার বা হালকা ওজনের বিশেষ উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়। আর দীর্ঘ সমুদ্র বা বিমান যাত্রার কারণে এই প্রতিমাগুলো তৈরির কাজ অনেক আগে শুরু হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তা জাহাজ বা বিমানে বিদেশে রওনা হয়ে যায়।"
অনেক মৃৎশিল্পীও বলছেন, কুমারটুলিতে এবার থিম বা কাল্পনিক মূর্তির চেয়ে সাবেকি বা ঐতিহ্যবাহী দুর্গা প্রতিমার চাহিদা অনেক বেশি। এর কারণ, পুজো কমিটিগুলোর মানসিকতার বদল হয়েছে, বাজেট সংকোচন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতির প্রভাবের কারণেই মূলত থিম সরিয়ে সাবেকিয়ানার দিকে ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা।
অনেক শিল্পী বলছেন,গত বছরগুলোর তুলনায় অনেক পুজো কমিটিরই বাজেট এবার কিছুটা কাটছাঁট হয়েছে। থিম বা কাল্পনিক আধুনিক রূপের প্রতিমা তৈরিতে খরচ অনেক বেশি হয়। সেই তুলনায় ডাকের সাজ বা শোলার সাজের একচালার সাবেকি প্রতিমা তৈরি অনেক বেশি সাশ্রয়ী, যা বাজেটের মধ্যে খাপ খেয়ে যায়।
শিল্পী মন্টু পালের তৈরি সাবেকিয়ানার মূর্তি
তাঁদের মতে, রাজ্যের পরিবর্তনের কারণে পুজো কমিটিগুলোর মধ্যেও অনুদান এবং স্পনসরশিপ পাওয়া নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অহেতুক জাঁকজমক বা থিমের পেছনে অতিরিক্ত খরচ না করে উদ্যোক্তারা ঐতিহ্যের মধ্যে থেকেই পুজো সারতে চাইছেন।
তারা এও বলছেন, বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত থিমের রমরমা দেখার পর, পুজো উদ্যোক্তা ও সাধারণ দর্শনার্থী, উভয়ের মধ্যেই একটা ক্লান্তি এসেছে। মানুষ এখন মায়ের সেই চেনা শান্ত রূপ, টানা চোখ এবং সনাতনী একচালার সাবেকি রূপটিই বেশি পছন্দ করছেন।
তাই দেশ-বিদেশে ও বিভিন্ন বহুতল আবাসনে ছোট ও মাঝারি মাপের সাবেকি একচালার প্রতিমার চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। তাছাড়া এই ধরনের প্রতিমা সহজে বহনযোগ্য এবং ঘরোয়া পরিবেশে পুজোর জন্য কোন ঝামেলা নেই।
শিল্পী মন্টু পালের তৈরি সাবেকিয়ানার মূর্তি
কুমারটুলির এক দোকানদার বিশ্বজিৎ সেন বলছেন,"বারোয়ারি পুজো কমিটিগুলো এবার ডাকের সাজ, শোলার সাজ এবং বনেদি বাড়ির ধাঁচের একচালার প্রতিমার প্রতি বেশি ঝুঁকছে। ফলে শিল্পীরাও থিম ছেড়ে সাবেকি প্রতিমা গড়তেই বেশি ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এবার পুজোয় দর্শকরা শুধু সাবেকি পুজোই বেশি দেখবেন এমন নয়, তবে ২০২৬ সালের দুর্গোৎসবে সাবেকিয়ানার প্রতি ঝোঁক এবং গুরুত্ব অনেকটাই বাড়ছে। এবারের পুজোয় থিম এবং সাবেকি পুজোর মধ্যে একটি বড় লড়াই ও ভারসাম্য দেখা যাবে।