শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
বিকেল নামছে কলকাতা ময়দানে। দূরে কোথাও বাঁশির শব্দ, কোথাও বলের ধাক্কা, কোথাও তরুণ ফুটবলারদের দৌড়। অথচ সেই চেনা কোলাহলের আড়ালে ময়দানের অন্য একটি ছবি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সারি সারি পুরনো টেন্ট। কোথাও তালা ঝুলছে, কোথাও ভাঙা গেট, কোথাও মলিন হয়ে যাওয়া নেমপ্লেট। কোনও কোনও টেন্টের ভিতর এখনও জ্বলছে একটি ক্ষীণ আলো, যেন নিভে যেতে বসা এক ফুটবল-ঐতিহ্যের শেষ প্রদীপ।
এই টেন্টগুলির দেওয়ালে ঝুলছে পুরনো ফুটবলারদের ছবি। কাঠের টেবিলের পাশে পড়ে রয়েছে ছেঁড়া মোজা, পুরনো বুট, বল। এক কোণে হয়তো পড়ে আছে কয়েক বছর আগের কোনও দলের জার্সি। আর বাইরে বসে থাকা বৃদ্ধ পাহারাদারটি জানেন না, আগামী মরসুমে আদৌ দল নামবে কি না। কর্মকর্তারা আসেন ছ’মাসে, নয় মাসে একবার। তবু তিনি থেকে যান। কারণ ক্লাবটা তাঁর কাছে শুধু একটি টেন্ট নয়, একটি স্মৃতি।
কলকাতা ময়দানের এই ছোট ছোট ক্লাবগুলিই একসময় ছিল বাংলার ফুটবলের আঁতুড়ঘর। এখান থেকেই উঠে এসেছে একের পর এক প্রতিভা। গলির কিশোরকে তুলে এনে ডাল-ভাত খাইয়ে, টেন্টে রেখে, বছরের পর বছর অনুশীলন করিয়ে ফুটবলার বানিয়েছে এই ক্লাবগুলি। বড় ক্লাবের আলোয় যাঁদের নাম আমরা মনে রাখি, তাঁদের অনেকের প্রথম পায়ের ছাপ ছিল এই ছোট ক্লাবগুলির ঘাসে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়ছে।
একসময় ময়দানে ৬০০-রও বেশি ক্লাব ছিল। খাতায়-কলমে এখন সংখ্যাটা ৩০০-র বেশি। কিন্তু নিয়মিতভাবে টিকে রয়েছে প্রায় ১৫০টি ক্লাব। রেসকোর্স থেকে কিডার রোড, খিদিরপুর রোড, সারি সারি পুরনো টেন্ট আজ সেই হারিয়ে যেতে বসা ফুটবল সংস্কৃতির সাক্ষী।
প্রশ্নটা তাই শুধু কয়েকটি ক্লাবের অস্তিত্বের নয়। প্রশ্নটা বাংলা ফুটবলের সেই ভিতটা নিয়ে, যেখান থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফুটবলার তৈরি হয়েছে। আর সেই কারণেই কলকাতা ময়দানের টিমটিমে আলোয় তাকালে আজ শুধু একটি ক্লাবের দুর্দশা দেখা যায় না, দেখা যায় বাংলা ফুটবলের একটি যুগের ধীরে ধীরে অন্ধকারে চলে যাওয়ার ছবি।
কয়েক লাখ টাকাতেই চলে একটি গোটা মরসুম
ময়দানের তৃতীয় থেকে পঞ্চম ডিভিশনের ক্লাবগুলিই আসলে এই ফুটবল কাঠামোর ভিত। প্রিমিয়ার ডিভিশনে অর্থের কিছুটা জোগান থাকলেও নিচের ডিভিশনের ক্লাবগুলি মূলত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও আবেগের উপর নির্ভরশীল।
আইএফএ-র আনুষ্ঠানিক বাজেট তালিকা না থাকলেও মাঠের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে তৃতীয় ডিভিশনের একটি দলের এক বছরের বাজেট প্রায় ২.৫ থেকে ৩.৫ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে আইএফএ-র এন্ট্রি ফি প্রায় ৪০ হাজার টাকা। জার্সি ও বুটে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার। এর সঙ্গে মাঠভাড়া, রেফারির ফি এবং অন্যান্য খরচ রয়েছে।
চতুর্থ ডিভিশনে বাজেট আরও কম, প্রায় ১.৫ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা। এন্ট্রি ফি প্রায় ২৫ হাজার টাকা। পঞ্চম ডিভিশনে একটি দলের গোটা মরসুমের বাজেট কখনও ৮০ হাজার টাকা, কখনও দেড় লক্ষ টাকার মধ্যে। এন্ট্রি ফি প্রায় ১৫ হাজার টাকা, জার্সি ও বুটে খরচ প্রায় ২০ হাজার। এই টাকার বড় অংশই আসে ক্লাব কর্মকর্তাদের পকেট থেকে। নিয়মিত স্পনসর নেই। নিচের ডিভিশনের ক্লাবগুলিকে আইএফএ থেকেও সরাসরি আর্থিক সহায়তা মেলে না।
ফুটবলারদের পারিশ্রমিকও নামমাত্র
এই ক্লাবগুলিতে মাসিক বেতন বলে কার্যত কিছু নেই। তিন-চার মাসের মরসুমের জন্য এককালীন টাকা দেওয়া হয়। তৃতীয় ডিভিশনে ভালো ফুটবলাররা মরসুমে পান প্রায় ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা, সঙ্গে এক জোড়া বুট। নতুনদের ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। কারও ক্ষেত্রে বুট, জার্সি ও যাতায়াতের খরচও দেওয়া হয়।
পঞ্চম ডিভিশনে পারিশ্রমিক আরও কম, প্রায় ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা। কেউ কেউ ম্যাচপিছু ৫০০ টাকা পান। এঁদের অধিকাংশের বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছর। পাড়ার ক্লাবের হয়ে খেলে তাঁরা অর্থের চেয়ে পরিচয় ও সুযোগের আশায় মাঠে নামেন। অন্যদিকে কলকাতা ফুটবল লিগের প্রিমিয়ারের একজন ফুটবলার মাসে প্রায় ৭৫ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন, যদিও সেটিও সাধারণত মরসুমের কয়েক মাসের জন্য।
তাই পঞ্চম ডিভিশনের তরুণ ফুটবলারের স্বপ্নটা অন্যরকম। আজ পঞ্চম ডিভিশন, কাল চতুর্থ, তারপর তৃতীয়। ভাগ্য সহায় হলে দ্বিতীয় ডিভিশন কিংবা প্রিমিয়ারের কোনও ছোট ক্লাবে জায়গা পাওয়া। সেখান থেকেই হয়তো বড় মঞ্চের দরজা খুলবে।
প্রতিভা তৈরি করে ছোট ক্লাব, লাভ নেয় বড়রা
একসময় এরিয়ান্স, খিদিরপুর, রেলওয়ে এফসির মতো ক্লাব ১৭-১৮ বছরের ছেলেদের বছরের পর বছর ধরে প্রশিক্ষণ দিত। থাকার ব্যবস্থা করত, খেলাত, তৈরি করত। তারপর সেই ফুটবলার একটু পরিণত হলেই বড় ক্লাবের নজরে পড়তেন। অনেক ক্ষেত্রেই বিনা ট্রান্সফার ফি বা উল্লেখযোগ্য ডেভেলপমেন্ট ফি ছাড়াই তাঁরা চলে যেতেন বড় দলে।ফলে ছোট ক্লাবগুলির প্রশ্ন, তারা যদি দু’বছর-তিন বছর টাকা খরচ করে একজন ফুটবলার তৈরি করে, তাঁর চলে যাওয়ার সময় ক্লাবের প্রাপ্তি কী?এই কারণেই এখন অনেক ছোট ক্লাব দীর্ঘমেয়াদি ফুটবলার তৈরির বদলে অন্য রাজ্য থেকে তৈরি ফুটবলার এনে তিন-চার মাসের জন্য দল চালানোর পথ বেছে নিচ্ছে।
নেশায় চলে ময়দানের অনেক ক্লাব
ময়দানের বহু ক্লাব আজ পেশাদার ব্যবস্থাপনায় নয়, আবেগে টিকে আছে। এখনও এমন কর্মকর্তা রয়েছেন যাঁদের বয়স সত্তর পেরিয়েছে। নিজের পেনশনের টাকা খরচ করে ক্লাব চালান। বিকেলে বাইক কিংবা গাড়ি নিয়ে আসেন, কয়েক ঘণ্টা টেন্টে বসেন, তারপর বাড়ি ফেরেন।
পরিবারের কেউ কেউ বলেন, “ক্লাবটা বিক্রি করে দাও।”উত্তর আসে, “এটা শুধু ক্লাব নয়, এটা আমার বাবার স্মৃতি।”এই আবেগের কারণেই হয়তো এখনও ময়দানের প্রায় ১০০টি টেন্টে বিকেল চারটে থেকে ছ’টা পর্যন্ত বলের শব্দ শোনা যায়। নিভে যায়নি সব আলো।
ঐতিহ্য আঁকড়ে খিদিরপুর
ময়দানের ছোট ক্লাবগুলির মধ্যে খিদিরপুরের ইতিহাস আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। শতবর্ষ পেরোনো এই ক্লাব থেকে উঠে এসেছেন মেওয়ালাল, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, গৌতম সরকার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ফুটবলার। পরবর্তী সময়ে মেহতাব হোসেন ও শিল্টন পালও এই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
১৯৮৫ সালের আইএফএ শিল্ডে উরুগুয়ের বিখ্যাত পেনারোলের বিরুদ্ধেও খেলেছিল খিদিরপুর। ২০২৬ সালে কলকাতা প্রিমিয়ার ডিভিশনে খেলছে ক্লাবটি। কিন্তু ঐতিহ্যের তুলনায় আর্থিক অবস্থা নড়বড়ে। বছরে বাজেট প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা। ফুটবলারদের তিন মাসের জন্য দেওয়া হয় প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
আই-লিগে খেলার সুযোগ এলেও অর্থের অভাবে দল গড়া সম্ভব হয় না। প্রশিক্ষণের জন্য ভূকৈলাসের মাঠই ভরসা। বর্ষায় সেই মাঠে অনুশীলন কার্যত বন্ধ। ময়দানের টেন্টও হাঁটুসমান জলে ডুবে যায়। ফলে অন্য মাঠ, এমনকি ইস্টবেঙ্গল গ্রাউন্ডও ভাড়া নিতে হয়।
ক্লাবের সভাপতি আকাশ দাসের কথায়, অতীতের খিদিরপুরের ঐতিহ্য ধরে রাখাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। পুরনো ফুটবলাররা কোচ হয়ে ফিরে আসায় ক্লাব এখনও টিকে আছে। ২০২৬ সালের মে মাস থেকে খিদিরপুর স্পোর্টিং ক্লাবের প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রাক্তন ফুটবলার মেহতাব হোসেন।
প্রতীকী ছবি
কেন আর ফুটবলার তৈরি হচ্ছে না?
মেহতাবের কথায়, আগে মেটিয়াব্রুজ, গার্ডেনরিচ, খিদিরপুরের গলি থেকে ১৪-১৫ বছরের ছেলেদের তুলে এনে টেন্টে রাখা হতো। ডাল-ভাত খাইয়ে বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তিন বছর ধরে একজন ফুটবলারকে তৈরি করার পর সে ময়দানে প্রতিষ্ঠিত হতো। এখন সেই ব্যবস্থা প্রায় নেই।
একজন ফুটবলারকে তিন বছর ধরে খাওয়ানো, থাকার ব্যবস্থা করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া, সব মিলিয়ে খরচ অনেক। বাজেট যখন ২০-২৫ লক্ষ টাকায় পৌঁছে যায়, তখন ছোট ক্লাবগুলির পক্ষে সেই দায়িত্ব নেওয়া কঠিন।তার উপর ভালো প্রতিভাবান কিশোরদের অনেকেই এখন বিভিন্ন ফুটবল অ্যাকাডেমিতে চলে যায়। সেখানে থাকার জায়গা, খাবার এবং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি থাকে নানা সুযোগ-সুবিধা।
আরও একটি বড় সমস্যা পরিকাঠামো। খিদিরপুরের নিজস্ব অনুশীলন মাঠ নেই। ব্রাউনফিল্ড এখন ট্রাক স্ট্যান্ড। বর্ষায় হাঁটুসমান জলে তিন মাস অনুশীলন বন্ধ থাকে।কোচিং ব্যবস্থাতেও এসেছে পরিবর্তন। আগে একটি ক্লাবে দীর্ঘদিন একই কোচ কাজ করতেন। এখন প্রতিবছর কোচ বদলে যায়। ধারাবাহিক কোচিং পরিকল্পনা নেই। অনূর্ধ্ব-১৩ বা অনূর্ধ্ব-১৫ স্তরে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে নেই।
যে ক্লাবগুলি একসময় ছিল প্রতিভার কারখানা
খিদিরপুরের মতোই এরিয়ান্স, রাজস্থান ক্লাব, তালতলা ইনস্টিটিউট, রেনবো এসি, পাঠচক্র, সাদার্ন সমিতি, পিয়ারলেস, ময়দানের একাধিক ছোট ক্লাব একসময় ছিল ফুটবলার তৈরির কারিগর। এই ক্লাবগুলির হাত ধরে বহু প্রতিভাবান ফুটবলার বড় ক্লাব, এমনকি জাতীয় দলের দরজাতেও পৌঁছেছেন।কিন্তু আজ সেই ক্লাবগুলির অনেকেই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই লড়াই করছে। চলছে, কোনওরকমে চলছে।
ময়দান বাঁচাতে বদল দরকার
কলকাতা ময়দানের ফুটবল শুধু মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহামেডানের গল্প নয়। এই ফুটবলের ভিত তৈরি করে ছোট ছোট ক্লাব, ছোট ছোট টেন্ট, অল্প পয়সায় খেলা কিশোর-তরুণ এবং কয়েকজন আবেগী কর্মকর্তা।এই ক্লাবগুলিই ভবিষ্যতের ফুটবলার তৈরির প্রথম জায়গা।
তাই ময়দানের ছোট ক্লাবগুলিকে টিকিয়ে রাখতে আইএফএ-র আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, ছোট ডিভিশনের ক্লাবগুলির জন্য নিয়মিত গ্র্যান্ট, উন্নত অনুশীলন পরিকাঠামো এবং ফুটবলার তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ফুটবলার তৈরি করা ক্লাব যাতে তাঁদের প্রশিক্ষণের বিনিময়ে ন্যায্য আর্থিক সুবিধা পায়, সেই ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
নইলে একদিন হয়তো টেন্টগুলো থাকবে, নেমপ্লেটও থাকবে, শুধু থাকবে না বলের শব্দ।টিমটিম করে জ্বলা সেই ল্যাম্পের আলোয় তখন শুধু পুরনো ছবিগুলিই সাক্ষ্য দেবে, একসময় এখানে ফুটবল খেলা হতো।