হাসপাতালের দরজায় ক্ষুধার্ত মুখ, বদলে গেল এক তরুণের জীবন—জিশান মজিদের ‘অ্যান্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড’-এর মানবিক লড়াই

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 6 h ago
হাসপাতালের দরজায় ক্ষুধার্ত মুখ, বদলে গেল এক তরুণের জীবন—জিশান মজিদের ‘অ্যান্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড’-এর মানবিক লড়াই
হাসপাতালের দরজায় ক্ষুধার্ত মুখ, বদলে গেল এক তরুণের জীবন—জিশান মজিদের ‘অ্যান্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড’-এর মানবিক লড়াই
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

কলকাতা শহর কখনও থেমে থাকে না। সকাল থেকে রাত, রাত পেরিয়ে ভোর, হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলেন নিজের নিজের গন্তব্যে। কেউ জীবিকার সন্ধানে, কেউ চিকিৎসার আশায়, কেউ বা প্রিয়জনকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টায়। এই শহরেরই কোনও এক ব্যস্ত রাস্তায় একদিন থেমে গিয়েছিলেন এক তরুণ। তাঁর সামনে তখন এক আহত মানুষ পড়ে ছিলেন। অন্যেরা হয়তো পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন। কিন্তু তিনি তা পারেননি।
 
আহত মানুষটিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন জিশান মজিদ। সেই একটি ঘটনাই তাঁর জীবনকে অন্য এক পথে নিয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছে জিশান শুধু একজন আহত মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন দেখেননি। দেখেছিলেন আরও বড় এক বাস্তবতা। দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে কলকাতার সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা অসংখ্য মানুষ।
 
 ‘অ্যান্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড’- সংগঠন
 
রোগীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারের সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকুই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ওষুধের টাকা জোগাড় করতেই যখন হিমশিম খেতে হচ্ছে, তখন খাবার জোগাড় করা অনেকের কাছেই হয়ে উঠছে বিলাসিতা। হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা সেই মানুষগুলির মুখে তখন একসঙ্গে লেখা থাকে উৎকণ্ঠা, অসহায়তা আর ক্ষুধা। জিশানের নিজের সংগঠনের বর্ণনা অনুযায়ী, NRS হাসপাতালে এমন পরিস্থিতি দেখেই তাঁর মনে জন্ম নেয় মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার ভাবনা।
 
সেখান থেকেই শুরু। ২০১৮ সালের মে মাসে খাবার বিতরণের উদ্যোগ শুরু করেন জিশান। প্রথম দিকে ছিল মাত্র ৪০টি খাবারের প্যাকেট। বাড়িতে রান্না, নিজের উদ্যোগে খাবার পৌঁছে দেওয়া, এইভাবেই শুরু হয়েছিল পথচলা। পরে সেই ছোট্ট উদ্যোগ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। Anti Hunger Squad Foundation-এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, NRS হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় রোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সংগঠনটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তার ক্ষেত্রেও কাজ করছে।
 
কিন্তু জিশানের গল্পের সবচেয়ে বড় জায়গাটি সংখ্যায় নয়। তাঁর গল্পের আসল শক্তি মানুষের মুখে। একজন অসুস্থ মানুষের পাশে বসে থাকা মা। সারারাত হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষা করা বাবা। দূর গ্রামের বাড়ি থেকে ছুটে আসা কোনও পরিবারের সদস্য। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে হাতে আর খাবারের টাকা না থাকা কোনও মানুষ। এই মানুষগুলির কাছে একবেলা গরম খাবার হয়তো শুধু খাবার নয়। সেটি এক মুহূর্তের স্বস্তি। একটুখানি মানবিক আশ্বাস। এই কঠিন সময়ে কেউ তাঁদের কথা ভাবছে, এই অনুভূতিটুকুও কম বড় নয়।
 
জিশান সেই অনুভূতিটাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে বহুবার। GetBengal-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সপ্তাহান্তে জিশান নিজের গাড়িতে বাড়িতে তৈরি খাবার নিয়ে সরকারি হাসপাতালের সামনে পৌঁছতেন এবং রোগীর পরিবারের হাতে বিনামূল্যে খাবার তুলে দিতেন।
 
২০২০ সালে মহামারির সময় তাঁর কাজ আরও বিস্তৃত হয়। TheSite-এর প্রতিবেদনে জিশান জানিয়েছিলেন, লকডাউনের সময় রাস্তায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে তিনি সুরক্ষা সরঞ্জাম পরে বাইরে বেরিয়ে মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যান।
 
একজন তরুণ ব্যবসায়ী হয়েও সপ্তাহের ব্যস্ততার বাইরে নিজের সময়কে তিনি অন্যভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। অবসর, বিনোদন কিংবা নিজের জন্য সময় কাটানোর বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ।
 
এখানেই জিশান মজিদের গল্পটি আলাদা। কারণ সমাজসেবা অনেক সময় দূরের কোনও বড় আদর্শের মতো মনে হয়। কিন্তু জিশানের কাজ দেখায়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুরু হতে পারে একেবারে সামনে থাকা একজন মানুষকে দিয়ে। তাঁর প্রয়োজনটা বুঝে। তাঁর হাতে খাবারের প্যাকেট তুলে দিয়ে। তাঁর অসহায়তার সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে।
 
 ‘অ্যান্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড’- সংগঠন
 
এই ভাবনাই পরে Anti Hunger Squad Foundation-এর কাজকে আরও বিস্তৃত করে। সংগঠনটির বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য বিতরণের পাশাপাশি চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষা, শিশুদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ, নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন, বিশেষভাবে সক্ষম মানুষের সহায়তা এবং দুর্যোগের সময়ে ত্রাণকাজও তাদের কর্মকাণ্ডের অংশ।
 
অর্থাৎ যে যাত্রার শুরু হয়েছিল ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে, তা ধীরে ধীরে মানুষের সামগ্রিক প্রয়োজনের দিকে এগিয়েছে। এই পথচলার একটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মানুষকে সাহায্য করার সময় তাঁর পরিচয়ের চেয়ে প্রয়োজনকে বড় করে দেখা।
 
ক্ষুধার কোনও ধর্ম নেই। অসুস্থতারও কোনও ধর্ম নেই। হাসপাতালের বাইরে রাত কাটানো মানুষের কাছে সে মুহূর্তে সবচেয়ে বড় পরিচয়, সে একজন অসহায় মানুষ। জিশানের উদ্যোগ সেই মানবিক সত্যকেই সামনে আনে। এই দর্শনের সঙ্গে সংগঠনের মূল বার্তাও মিলে যায়, “Acknowledge the entire human race as one.”
 
আজও সেই কাজ থেমে নেই। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যেও NRS হাসপাতালের বাইরে খাবার ও ফল বিতরণ, বিভিন্ন মানবিক ক্লিনিক, চিকিৎসা সহায়তা এবং শিশুদের জন্য খাবার বিতরণের মতো কর্মসূচির উল্লেখ পাওয়া যায়। জিশানের LinkedIn প্রোফাইলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে St. Joseph’s College, Kolkata-এর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘Student Hunger Brigade’ কর্মসূচিতেও রোগীর পরিবারের সদস্য ও প্রয়োজনমতো মানুষের মধ্যে খাবার ও ফল বিতরণ করা হয়েছিল। একই সময়ে ‘Humanity Clinic’-এর মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ার কর্মসূচির কথাও তিনি জানিয়েছেন।
 
একটি ছোট্ট মানবিক উপলব্ধি থেকে শুরু হওয়া কাজ যে এত দূর যেতে পারে, জিশান মজিদের পথচলা তারই উদাহরণ। তবে এই গল্পকে শুধু ‘খাবার বিলির গল্প’ বললে ভুল হবে। কারণ একজন ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি প্রশ্ন করা, কেন সে ক্ষুধার্ত? কেন একটি পরিবার চিকিৎসার জন্য এসে খাবারের টাকা হারিয়ে ফেলে? কেন একটি শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়?
 
সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টাও রয়েছে জিশানের কাজের মধ্যে। Anti Hunger Squad Foundation-এর প্রকাশিত একটি উদাহরণে কলকাতার দ্বাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে শিক্ষার খরচে সহায়তা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, মেয়েটি একক মায়ের সন্তান এবং পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
 
অর্থাৎ ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জিশান বুঝেছেন, মানুষের জীবনের সমস্যাগুলি আলাদা আলাদা ঘরে থাকে না। খাবারের অভাবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয় এবং নিরাপত্তার প্রশ্নও। এই কারণেই তাঁর উদ্যোগের গল্পে একটি খাবারের প্যাকেটের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
 
 ‘অ্যান্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড’- সংগঠন
 
কলকাতার রাস্তায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে যান। কেউ তাদের দেখে থামেন, কেউ দেখেও এগিয়ে যান। জিশান একদিন থেমেছিলেন। সেই থেমে যাওয়াই বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন।
 
একজন আহত মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত থেকে শুরু হয়েছিল যে পথচলা, তা আজ বহু মানুষের কাছে খাবার, চিকিৎসা ও সহায়তার দরজা খুলেছে। সংগঠনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত Anti Hunger Squad Foundation এখন খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষমতায়নের মতো একাধিক ক্ষেত্রে কাজ করছে। সমাজ বদলের গল্প সবসময় কোনও বিশাল মঞ্চে লেখা হয় না। কখনও তা লেখা হয় হাসপাতালের গেটের পাশে। কখনও একটি খাবারের প্যাকেটের মধ্যে। কখনও কোনও অসহায় মানুষের কাঁধে হাত রেখে।
 
জিশান মজিদের গল্পও তেমনই। তিনি হয়তো কোনওদিন ভাবেননি, একটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্ত তাঁর জীবনের এত বড় অধ্যায়ের সূচনা করবে। কিন্তু কখনও কখনও মানুষের জীবনে একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। সেই মুহূর্ত আমাদের শেখায়, অন্যের কষ্ট দেখে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া সহজ, কিন্তু থেমে দাঁড়ানোই মানবিকতার প্রথম পরীক্ষা।
 
জিশান থেমেছিলেন। তারপর শুধু একজনকে সাহায্য করে থেমে থাকেননি। নিজের সেই অনুভূতিকে একটি দীর্ঘ সামাজিক উদ্যোগে পরিণত করেছেন। আজ হাসপাতালের সামনে যখন কোনও অসহায় মানুষের হাতে একবেলা খাবার পৌঁছে যায়, তখন তার সঙ্গে পৌঁছে যায় আরও একটি বার্তা, এই শহর এখনও পুরোপুরি নির্দয় হয়ে যায়নি। এখনও এমন মানুষ আছেন, যাঁরা অপরিচিত মানুষের ক্ষুধাকেও নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন।
 
আর সেই কারণেই জিশান মজিদের গল্প শুধু একজন তরুণের গল্প নয়। এটি কলকাতার মানবিক মুখের গল্প।একটি থেমে দাঁড়ানোর গল্প। একটি খাবারের প্যাকেট থেকে শুরু হওয়া এক দীর্ঘ পথচলার গল্প। আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের জন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই পুরনো, অথচ আজও সবচেয়ে প্রয়োজনীয় গল্প।


শেহতীয়া খবৰ