তরুণ নন্দী, কলকাতা
উৎসবের রং আলাদা হতে পারে, কিন্তু বাংলার মাটিতে উৎসবের আবেগ বহু সময়েই ছাপিয়ে যায় ধর্মের গণ্ডি। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের দণ্ডীরহাটে বসু বাড়ির দুর্গাপুজো যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো এই পুজোয় আজও টিকে রয়েছে এমন এক রীতি, যা এলাকার হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ছবিকে আরও উজ্জ্বল করে।
বসু পরিবারের দাবি, প্রায় ৩৪৭ বছর আগে জমিদার রাধামাধব বসুর হাত ধরে এই দুর্গাপুজোর সূচনা। সময় বদলেছে, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, বদলেছে সমাজের অনেক চিত্র। কিন্তু বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পুজোর একাধিক প্রাচীন রীতি এখনও ধরে রেখেছে পরিবার।
এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ‘কলাচ্ছড়া’ প্রতিমা। পরিবারের প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একসময় ঠাকুরদালানে প্রচুর পায়রার আনাগোনা ছিল। সেই কারণে প্রতিমার দুটি হাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর বিন্দুবাসী দেবী স্বপ্নাদেশ পান বলে পরিবারের দাবি। সেই স্বপ্নাদেশে জানানো হয়, পুজো বন্ধ করা যাবে না। প্রতিমার থাকবে আটটি ছোট হাত এবং দুটি বড় হাত। সেই থেকেই এই বিশেষ আকৃতির প্রতিমার প্রচলন।
বিসর্জনের আগে যে রীতিতে মিশে যায় সম্প্রীতির বার্তা
বসু বাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে আলোচিত ঐতিহ্যগুলির একটি বিসর্জনের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের দাবি, বিসর্জনের আগে প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি পরিবারের বাড়িতে। সেখানেই নির্দিষ্ট রীতি মেনে প্রতিমার কাঠামো কাটার পর শুরু হয় বিসর্জনের পরবর্তী আচার।
এরপর কাহারপাড়ায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে হয় সিঁদুর খেলা-সহ নানা প্রথাগত অনুষ্ঠান। অর্থাৎ দেবীকে ঘিরে উৎসবের শেষ পর্বেও একসঙ্গে সামিল হন এলাকার বিভিন্ন ধর্মের মানুষ।
শেষে আসে বিসর্জনের পালা। চার দোলা ও বারো বেয়ারার কাঁধে প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইছামতীর ঘাটে। সেখানেই সম্পন্ন হয় বিসর্জন।
পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে সাংস্কৃতিক ইতিহাসও
শুধু ধর্মীয় আচার নয়, দণ্ডীরহাটের বসু বাড়ির ঠাকুরদালান একসময় এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও অন্যতম কেন্দ্র ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। পরিবারের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নাট্যচর্চার স্মৃতিও। একসময় এই ঠাকুরদালানে মঞ্চস্থ হয়েছিল রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকার ও অভিনেতা মনোজ মিত্রের জনপ্রিয় নাটক ‘শাহজাহান’—এমন কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।
দণ্ডীরহাটের বসু বাড়ির দুর্গাপুজো তাই শুধু একটি পরিবারের পুজো নয়। শতাব্দী পেরিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। প্রতিমার বিশেষ রূপ থেকে শুরু করে বিসর্জনের আগে মুসলিম পরিবারের বাড়িতে যাওয়ার রীতি—সব মিলিয়ে এই পুজো বহন করে চলেছে সম্প্রীতির এক দীর্ঘ উত্তরাধিকার।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও দণ্ডীরহাটের এই প্রাচীন পুজো যেন আজও মনে করিয়ে দেয়—উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মের কোনও বিভাজন নেই।