আলোর শহরে ফিরল পুরনো সম্পর্ক, রেজিস্ট্রি ভবনের হাত ধরে নতুন সেতুবন্ধন ভারত-ফ্রান্সের
দেবকিশোর চক্রবর্তী
আলো শুধু অন্ধকার দূর করে না, কখনও কখনও আলো ফিরিয়ে আনে ইতিহাসকেও। পুরনো সম্পর্কের দরজায় কড়া নাড়ে, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঠিক তেমনই এক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল হুগলির চন্দননগর, আলোর শহর। গঙ্গার বুক চিরে লঞ্চ এসে যখন রানিঘাটে ভিড়ল, তখন নদীর ধারে সাজানো আলোর সামিয়ানা যেন বলে দিচ্ছিল, এ শুধু কোনও সরকারি অনুষ্ঠানের সন্ধ্যা নয়; এ ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের নতুন করে হাত মেলানোর মুহূর্ত।
প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো, দীর্ঘদিন ধরে মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে থাকা চন্দননগরের ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি ভবনের পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হল এদিন। আর সেই উদ্বোধনকে ঘিরেই যেন নতুন প্রাণ পেল শহরের ফরাসি স্মৃতি, পুরনো স্থাপত্য এবং ভারত-ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক।
শুক্রবার সন্ধ্যায় চন্দননগরের স্ট্র্যান্ডজুড়ে ছিল চোখ ধাঁধানো আলোর সাজ। নদীর হাওয়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল বাংলা ও ফরাসি সংস্কৃতির সুর। কোথাও বাংলা গান, কোথাও ফরাসি গান, কোথাও নৃত্য পরিবেশনা। ভারত ও ফ্রান্সের পতাকা হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে স্কুলপড়ুয়ারা। মনে হচ্ছিল, পুরনো ইতিহাসের পাতাগুলি যেন হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে নতুন প্রজন্মের হাতে।
চন্দননগরে ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি ভবন এবং স্ট্র্যান্ড-এর দৃশ্য
কলকাতা থেকে গঙ্গাপথে লঞ্চে করে অতিথিদের চন্দননগরে পৌঁছনোর দৃশ্যও ছিল অন্যরকম। রানিঘাট থেকে ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি ভবন এবং স্ট্র্যান্ড পর্যন্ত গোটা পথ সাজানো হয়েছিল আলোর সামিয়ানায়। উৎসবের আবহে শহর যেন নিজের অতীতকে সামনে এনে ভবিষ্যতের দিকে তাকাল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত রিয়েলি মাতু, রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ-সহ একাধিক মন্ত্রী ও বিশিষ্টজন। উপস্থিত ছিলেন জেলার কয়েকজন বিজেপি বিধায়কও। অনুষ্ঠানে চন্দননগরকে ঘিরে উৎসবের প্রস্তাব উঠে আসে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের তরফে। সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানান রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী। ফলে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে শুধু স্মৃতির পাতায় আটকে না রেখে তাকে উৎসব, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হল।
চন্দননগরের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক কোনও সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। এই শহরের অলিগলি, স্থাপত্য, নদীর ঘাট, পুরনো বাড়ি, সবকিছুর মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে ফরাসি উপস্থিতির দীর্ঘ ইতিহাস। তাই রেজিস্ট্রি ভবনের সংস্কার শুধু একটি পুরনো বাড়িকে নতুন করে দাঁড় করানোর প্রকল্প নয়। এটি যেন একটি সময়কে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। একটি শহরের স্মৃতিকে তার নিজস্ব মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে দুই দেশের পক্ষ থেকেই সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে নদী পর্যটনকে ঘিরে চন্দননগরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে। গঙ্গাকে কেন্দ্র করে কলকাতা থেকে চন্দননগর পর্যন্ত জলপথকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারলে শুধু পর্যটন নয়, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন দরজা খুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব বরুণ কুমার রায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু কারণে এই অনুষ্ঠান আটকে ছিল। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হল। অন্যদিকে স্থপতি ঐশ্বর্য টিপনিস স্লাইডের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি ভবনের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ভবনটির স্থাপত্যিক চরিত্র ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেই কীভাবে তাকে নতুন করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যায়, সেই ভাবনাই উঠে আসে তাঁর উপস্থাপনায়।
তবে শুক্রবারের সন্ধ্যার সবচেয়ে বড় বার্তাটি হয়তো ছিল অন্য জায়গায়। ইতিহাস কখনও কেবল পুরনো দিনের গল্প নয়। তাকে যদি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে সেই ইতিহাসই হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের সম্পদ। চন্দননগরের রেজিস্ট্রি ভবন তাই শুধু ইট-কাঠ-পাথরের একটি স্থাপনা নয়, এ শহরের বহু বছরের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও দুই দেশের সম্পর্কের নীরব সাক্ষী।
একদিকে গঙ্গার কালো জলে আলোর প্রতিবিম্ব, অন্যদিকে স্ট্র্যান্ডজুড়ে ভারত ও ফ্রান্সের পতাকা। শিশুদের হাতে দুই দেশের পতাকা, বাতাসে বাংলা ও ফরাসি গানের সুর, এই দৃশ্যের মধ্যে যেন কোনও বিভাজন ছিল না। ছিল না দূরত্বের অহংকার। ছিল সংস্কৃতির হাত ধরে কাছে আসার এক সহজ বার্তা।
চন্দননগর যে শুধু একটি শহর নয়, সে একটি জীবন্ত ইতিহাস, শুক্রবারের অনুষ্ঠান যেন আবার সেই কথাই মনে করিয়ে দিল। পুরনো রেজিস্ট্রি ভবনের সংস্কারের হাত ধরে যদি নদী পর্যটন, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন অধ্যায় শুরু হয়, তবে এই উদ্যোগ শুধু একটি ভবনকে বাঁচাবে না; বাঁচাবে একটি শহরের স্মৃতি এবং তার আন্তর্জাতিক পরিচয়কেও।
আলোর শহর চন্দননগর তাই এদিন শুধু আলোয় সাজেনি। আলো ফেলেছে নিজের অতীতের ওপর। আর সেই আলোয় ভারত ও ফ্রান্সের পুরনো সম্পর্ক যেন নতুন করে খুঁজে পেল ভবিষ্যতের পথ। ইতিহাসের শহরে তাই এদিন উৎসব ছিল শুধু সংস্কারের নয়, সম্প্রীতির, বন্ধুত্বের এবং নতুন সম্ভাবনারও।