‘জেন জি দেশবিরোধী নয়, আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম’: ছাত্র আন্দোলন নিয়ে মোহন ভাগবতের বার্তা

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 d ago
‘জেন জি দেশবিরোধী নয়, আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম’: ছাত্র আন্দোলন নিয়ে মোহন ভাগবতের বার্তা
‘জেন জি দেশবিরোধী নয়, আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম’: ছাত্র আন্দোলন নিয়ে মোহন ভাগবতের বার্তা
 
মুম্বই:

প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম ও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র আন্দোলন আপাতত থেমে গেলেও, আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই আন্দোলন এবং নতুন প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত।

মুম্বইয়ে বৃহস্পতিবার নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এক সংলাপ অনুষ্ঠানে ভাগবত স্পষ্ট করে বলেন, জেন জি বা জেন আলফার প্রতিবাদকে দেশবিরোধী হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাঁর মতে, প্রতিবাদ গণতন্ত্রে মত প্রকাশ ও সংলাপেরই একটি মাধ্যম। তরুণদের সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে আলোচনা করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে এক তরুণ তাঁকে প্রশ্ন করেন, প্রতিবাদে অংশ নিলে অনেক সময় তাঁদের ‘দেশবিরোধী’ বা ‘বিদেশি এজেন্ট’ বলে চিহ্নিত করা হয়। জবাবে ভাগবত বলেন, জেন জি প্রতিবাদ করলে তারা দেশবিরোধী নয়। তারা দেশেরই মানুষ এবং আগামী দিনের প্রজন্ম। তাঁদের সঙ্গে আপনত্বের সম্পর্ক তৈরি করে কথা বলতে হবে।

ভাগবতের বক্তব্য, তরুণদের বক্তব্য যেমন শোনা দরকার, তেমনই তাঁদের প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত উত্তর দেওয়াও প্রয়োজন। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি প্রশ্ন করে এবং কোনও বিষয় অন্ধভাবে মেনে নিতে চায় না।

‘জেন জি ও জেন আলফা বেশি সৎ’

নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরে ভাগবত বলেন, জেন জি এবং জেন আলফা বর্তমান প্রজন্মের তুলনায় বেশি সৎ। তাঁর মতে, আগের প্রজন্মে বড়দের কথা মেনে নেওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম প্রশ্ন করে এবং যুক্তির মাধ্যমে উত্তর জানতে চায়।তাই তরুণদের প্রতিবাদকে শুধুমাত্র বিরোধিতা হিসেবে না দেখে তাঁদের সমস্যার জায়গাটি বোঝার চেষ্টা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভাগবতের কথায়, কোনও তরুণ যদি ক্ষোভ প্রকাশ করে বা প্রতিবাদে রাস্তায় নামে, তাহলে ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে সে শুধুমাত্র বিরোধিতা করার জন্যই তা করছে। তার পিছনে কোনও বাস্তব সমস্যা বা অসন্তোষ থাকতে পারে। সেই সমস্যার সমাধান করাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত।

আন্দোলনও গণতান্ত্রিক সংলাপের অংশ

ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গে ভাগবত বলেন, আন্দোলনও সংলাপের একটি পদ্ধতি। গণতন্ত্রে আলোচনা, মতবিনিময় এবং বিতর্কের মাধ্যমে ঐকমত্য তৈরির সুযোগ থাকে।

তবে প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়ে তিনি সংবিধান মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও সাংবিধানিক কাঠামো ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রাখা জরুরি।

ছাত্র আন্দোলন ঘিরে ‘দেশবিরোধী’ বিতর্ক

প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন একসময় জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে ছাত্রদের মিছিল ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘাত ও বলপ্রয়োগের অভিযোগের পর আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিতর্ক আরও তীব্র হয়।

আন্দোলনের সময় কিছু ছাত্রের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে সমালোচনা হয়। কয়েকটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আইনি অভিযোগও দায়ের হয়েছে। এর পরেই আন্দোলনকারীদের একাংশকে ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়।

আন্দোলন থামার পর মুম্বইয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের একটি অনুষ্ঠানে সংঘের সহ সরকার্যবাহ অতুল লিময়ের বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে আসে। তিনি দাবি করেছিলেন, আন্দোলনটি শুধু বিজেপি বা সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না; এর মধ্যে দেশ ও সংবিধানবিরোধী প্রবণতাও ছিল। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।

তবে মোহন ভাগবতের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর সামনে এসেছে। তিনি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, জেন জি-র প্রতিবাদকে দেশবিরোধী বলে দেখা তাঁর অবস্থান নয়।

প্রধানমন্ত্রীর বার্তার সঙ্গেও মিল

তরুণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ভাগবতের বক্তব্যের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগের বার্তারও মিল রয়েছে। আন্দোলনের সময় কিছু তরুণের বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও, মোদি তাঁদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা বোঝার এবং ভুল হলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়।

এবার সংঘপ্রধানও একই ধরনের সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন। ফলে ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে আরএসএস ও বিজেপির তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির কৌশল নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

‘শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক কিছু করার প্রয়োজন’

শুধু আন্দোলনকারীদের আচরণ নয়, তাঁদের আন্দোলনের মূল কারণ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন ভাগবত। তিনি স্বীকার করেন, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও অনেক কিছু করার প্রয়োজন রয়েছে।

তাঁর বক্তব্যের মূল সুর—অভিযোগ যদি বাস্তব হয়, তাহলে সেই সমস্যা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। আলোচনার পরেও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তখন পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

তরুণদের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর বার্তা

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাত্র আন্দোলন আপাতত স্তিমিত হলেও এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা, সরকারি পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে যে ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছে, তা সহজে শেষ হওয়ার নয়।

এই পরিস্থিতিতে মোহন ভাগবতের বক্তব্যকে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের শুধু সমালোচনা না করে তাঁদের বক্তব্য শোনা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই ভাগবতের বার্তা স্পষ্ট—প্রতিবাদ মানেই দেশবিরোধিতা নয়, প্রশ্ন করাও অপরাধ নয়। নতুন প্রজন্মকে বোঝার জন্য প্রয়োজন সংঘাত নয়, সংলাপ।