গৌড়ের ‘পুরানা পির’ আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান (রহ.): চিশতিয়া সাধনার আলোয় মালদার পিরানা পির দরগাহ

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 3 d ago
গৌড়ের ‘পুরানা পির’ আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান (রহ.): চিশতিয়া সাধনার আলোয় মালদার পিরানা পির দরগাহ
গৌড়ের ‘পুরানা পির’ আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান (রহ.): চিশতিয়া সাধনার আলোয় মালদার পিরানা পির দরগাহ
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

মালদার প্রাচীন গৌড় নগরীর ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, প্রাসাদ আর মসজিদের ইতিহাস নয়। এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার সুফি সাধনারও দীর্ঘ ঐতিহ্য। সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম শেখ আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান (রহ.)। গৌড়ের সাগরদিঘির কাছে অবস্থিত তাঁর সমাধিসৌধ ও দরগাহ আজ পিরানা পির নামে পরিচিত। মালদা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই দরগাহ মালদা শহর থেকে প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এবং আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান চিশতিয়া বাংলায় প্রতিষ্ঠা ও সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান (রহ.) ছিলেন দিল্লির প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর শিষ্য। দিল্লিতে তিনি ইসলামি শাস্ত্রে গভীর শিক্ষা লাভ করেন এবং নিজামউদ্দিন আউলিয়ার কাছ থেকে আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও খেলাফত লাভ করেন। তাঁর পাণ্ডিত্য ও আধ্যাত্মিক মর্যাদার জন্য নিজামউদ্দিন আউলিয়া তাঁকে ‘আইনা-ই-হিন্দুস্তান’ বা ‘হিন্দুস্তানের দর্পণ’ নামে অভিহিত করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
 
 মালদার পিরানা পির দরগাহে প্রবেশের পথে ভক্তরা। গৌড়ের এই দরগাহ আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান (রহ.)-এর স্মৃতিবাহী গুরুত্বপূর্ণ সুফি কেন্দ্র।
 
নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মৃত্যুর পর আখি সিরাজ বাংলায় ফিরে আসেন এবং গৌড় ও পান্ডুয়া অঞ্চলে সুফি আদর্শ প্রচার শুরু করেন। বাংলায় চিশতিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠা ও সংগঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রধান শিষ্যদের অন্যতম ছিলেন মখদুম শেখ আলাউল হক (রহ.), যাঁর হাত ধরে পান্ডুয়াতেও চিশতিয়া সুফি ঐতিহ্য আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে আখি সিরাজের খানকাহ শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল শিক্ষা, নৈতিক চর্চা এবং মানবিকতারও কেন্দ্র।
 
আখি সিরাজউদ্দিন ওসমানের জীবনের সঙ্গে গৌড়ের সম্পর্ক নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে বদাউনের বাসিন্দা বলে মনে করা হলেও আধুনিক গবেষণায় সেই ধারণা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঐতিহাসিক আবদুল হক দেহলভির আখবার-উল-আখিয়ার গ্রন্থে তাঁকে ‘আখি সিরাজ গৌরি’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি গৌড়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন তথ্যের পক্ষে ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
 
তাঁর মৃত্যুসন ৭৫৮ হিজরি, অর্থাৎ ১৩৫৭ খ্রিস্টাব্দ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে গৌড়ের সাগরদিঘির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে তাঁর পবিত্র পোশাক দাফন করা স্থানের কাছেই সমাহিত করা হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত। পরবর্তীকালে তাঁর সমাধির ওপর মাজার বা সমাধিসৌধ নির্মিত হয়। বর্তমান পিরানা পির দরগাহ সেই ঐতিহ্যেরই ধারক।
 
গৌড়ের ‘পুরানা পির’ হজরত আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান (রহ.)-এর পিরানা পির দরগাহের মাজার। চিশতিয়াসুফি ঐতিহ্যের এই স্মৃতিবিজড়িত স্থানে ভক্তরা শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা নিবেদন করেন।
 
‘পিরান-ই-পির’ নামটি নিয়ে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা দরকার। স্থানীয় মানুষের মধ্যে আখি সিরাজউদ্দিনকে ‘পুরানা পির’ বা ‘পিরান-ই-পির’ নামে ডাকার প্রচলন ছিল। ‘পুরানা পির’ অর্থ পুরনো পির, আর ‘পিরান-ই-পির’ অর্থ পিরদের পির। তবে ঐতিহাসিক সূত্রের বিচারে ‘পুরানা পির’ নামটিই বেশি সম্ভাব্য, কারণ ‘পিরান-ই-পির’ উপাধিটি ভারতীয় মুসলিম সমাজে সাধারণত হজরত আবদুল কাদির জিলানির সঙ্গে যুক্ত। তাই সংবাদ প্রতিবেদনে ‘গৌড়ের পুরানা পির’ বলা অধিকতর নিরাপদ।
 
দরগাহটির বর্তমান স্থাপত্যও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। সমাধিসৌধের প্রবেশপথের সঙ্গে যুক্ত দুটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, এর দুটি দরজা পরবর্তী কালে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহের আমলে নির্মিত হয়েছিল। হোসেন শাহ দরগাহে পানীয় জলের জন্য একটি শেড বা সিকায়াও নির্মাণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ সুফি সাধকের প্রতি সুলতানি আমলের শাসকদের শ্রদ্ধা ও পৃষ্ঠপোষকতারও একটি বাস্তব নিদর্শন এই দরগাহ।
 
আজও পিরানা পির দরগাহে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসেন। প্রতি বছর ঈদ-উল-ফিতরের দিন আখি সিরাজউদ্দিনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। এই সময় পান্ডুয়া থেকে মখদুম জাহানিয়া জাহানগাশতের ঝান্ডা এবং নূর কুতুবুল আলমের পাঞ্জা শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে গৌড়ের এই দরগাহে নিয়ে আসার ঐতিহ্য রয়েছে। এই রীতি গৌড় ও পান্ডুয়ার সুফি কেন্দ্রগুলির পারস্পরিক ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে আজও জীবন্ত রাখে।
 
গৌড়ের ‘পুরানা পির’ হজরত আখি সিরাজউদ্দিন ওসমান (রহ.)-এর পিরানা পির দরগাহের মাজার। চিশতিয়াসুফি ঐতিহ্যের এই স্মৃতিবিজড়িত স্থানে ভক্তরা শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা নিবেদন করেন।
 
সাগরদিঘির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিরানা পির তাই শুধু একটি সমাধিসৌধ নয়। এটি বাংলায় চিশতিয়া সুফি ঐতিহ্যের বিকাশ, গৌড়ের মধ্যযুগীয় ইতিহাস এবং মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এক জীবন্ত স্মারক। রাজ্য সরকারের পর্যটন তথ্যেও পিরানা পিরকে মালদার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দর্শনীয় স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।


শেহতীয়া খবৰ