কলকাতার গলিতে আজও বেঁচে কাদেরিয়া খানকার ঐতিহ্য ২২ নম্বর খানকা শরিফ লেনে সুফি সাধনা, পাণ্ডুলিপি ও ওয়াক্‌ফের ইতিহাস

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
কাদেরিয়া খানকা
কাদেরিয়া খানকা
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

শহরের ব্যস্ততা, যানজট আর বহুতলের ভিড়ের আড়ালে কলকাতার পুরনো গলিগুলিতে এখনও টিকে রয়েছে এমন কিছু ইতিহাস, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার সুফি সাধনা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সম্প্রীতির দীর্ঘ পরম্পরা। তালতলা-মৌলালি এলাকার ২২, খানকা শরিফ লেন তেমনই এক ঠিকানা। এখানেই রয়েছে খানকা শরিফ-এ-কাদেরিয়া, কাদেরিয়া সুফি সিলসিলার সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক খানকা।
 
খানকা মানেই শুধু মসজিদ নয়। সুফি পরম্পরায় খানকা ছিল পীর-মুর্শিদের আধ্যাত্মিক সাধনা, শিষ্যদের শিক্ষা, ধর্মীয় আলোচনা এবং মানুষের আশ্রয়ের কেন্দ্র। কলকাতার মুসলিম সমাজ নিয়ে প্রকাশিত Cultural Profile of Calcutta-তে কাদেরিয়া, চিশতিয়া ও নকশবন্দিয়া, এই তিনটি সুফি সিলসিলার প্রভাবের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কেন্দ্রীয় কলকাতায় কাদেরিয়া সিলসিলার একটি বড় খানকার কথা এবং কিদ্দরপুর ও বেনিয়াপুকুরে তার উপকেন্দ্র থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
 
এই ঐতিহ্যের কেন্দ্রেই উঠে আসে হজরত শাহ মুর্শিদ আলি কাদেরি-র নাম। ২০২২ সালে তালতলা নিয়ে আয়োজিত একটি ঐতিহ্য-পরিক্রমা সম্পর্কে Times of India-র প্রতিবেদনে ২২, খানকা শরিফ লেনের Khanquah Sharif-e-Quadariya-কে তাঁর প্রতিষ্ঠিত খানকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, অবিভক্ত বাংলায় সুফিবাদ বিস্তারে এই খানকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
 
কাদেরিয়া খানকা
 
শাহ মুর্শিদ আলি কাদেরি শুধু সুফি সাধকই ছিলেন না, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার পণ্ডিত হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ পিএইচডি গবেষণাও হয়েছে। ২০১৪ সালে ‘Syed Shah Murshed Ali Alquaderi – A Renowned Saint of Bengal, Scholar of Arabic, Persian and Urdu’ শিরোনামে সেই গবেষণা সম্পন্ন হয়। ফলে তাঁর জীবন ও কলকাতার কাদেরিয়া পরম্পরা শুধুমাত্র পারিবারিক স্মৃতির বিষয় নয়, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও তা গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে।
 
এই খানকার আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এর গ্রন্থাগার ও পাণ্ডুলিপির ঐতিহ্য। সংবাদসূত্রে জানা যায়, খানকা চত্বরে একটি মসজিদের পাশাপাশি একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। সেখানে বহু ফারসি ও আরবি বই এবং পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানটি একসময় শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার জায়গা ছিল না; ধর্মীয় জ্ঞান, সুফি সাহিত্য ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবেও তার ভূমিকা ছিল।
 
খানকার ইতিহাসের সঙ্গে ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থার যোগসূত্রও নথিভুক্ত। ১৯৭৭ সালের একটি কলকাতা হাইকোর্টের মামলায় খানকা শরিফ লেনের কাদেরিয়া ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি নিয়ে উত্তরাধিকার ও পরিচালনা সংক্রান্ত দীর্ঘ আইনি বিবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। আদালতের নথিতে ১৯৩১ ও ১৯৩৩ সালের ওয়াক্‌ফ দলিল এবং ১৯৩৬ সালে ওয়াক্‌ফ এস্টেট হিসেবে নথিভুক্তির প্রসঙ্গ রয়েছে। সেখানে খানকা শরিফ লেনের ২৩ নম্বর সম্পত্তির উল্লেখও রয়েছে।
 
তবে বর্তমান খানকার ঠিকানা হিসেবে ২২ নম্বর ব্যবহৃত হয়। ফলে ২২ ও ২৩ নম্বর সম্পত্তির পারস্পরিক সম্পর্কটি পুরনো পৌর নথি ও ওয়াক্‌ফের মূল দলিল দেখে আরও যাচাই করা প্রয়োজন। ইতিহাসের এই সূক্ষ্ম জায়গাতেই গবেষণার গুরুত্ব।
 
কাদেরিয়া পরিবারের ঐতিহ্যবিষয়ক সূত্রে জানা যায়, মেদিনীপুরের কাদেরিয়া পরম্পরা থেকেই শাহ মুর্শিদ আলি কাদেরির কলকাতা-পর্বের সূত্রপাত। পরবর্তীকালে কলকাতার কেন্দ্রস্থলে এই খানকা কাদেরিয়া সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক নথিতে কিদ্দরপুর ও বেনিয়াপুকুরে কাদেরিয়া খানকার উপকেন্দ্র থাকার উল্লেখও সেই বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
 
আজ শহরের দ্রুত বদলে যাওয়া চেহারার মধ্যেও খানকা শরিফ লেনের এই প্রতিষ্ঠানটি তাই শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়। এটি কলকাতার মুসলিম সমাজের ইতিহাস, বাংলায় সুফি সাধনার বিস্তার, আরবি-ফারসি জ্ঞানচর্চা এবং ওয়াক্‌ফ-ভিত্তিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের একটি জীবন্ত দলিল।
 
তালতলার সরু গলিতে হয়তো তার চারপাশে আধুনিক কলকাতার কোলাহল। কিন্তু খানকা শরিফের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, এই শহরের পরিচয় শুধু ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, রাজপথ আর বাণিজ্যের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। তার অলিগলির ভিতরেও লুকিয়ে রয়েছে সুফি সাধনা, জ্ঞানচর্চা এবং বহুত্বের এক দীর্ঘ উত্তরাধিকার।


শেহতীয়া খবৰ