বাসি রুটি খেয়ে রাত কাটানো বৃদ্ধার পাশে পুলিশ, এসিপি ইমরানের মানবিক উদ্যোগে মুগ্ধ সবাই
অনিকা মাহেশ্বরি
পৃথিবীতে অনেকেই বড় বড় কাজের মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করেন। কিন্তু এমন কিছু মানুষও রয়েছেন, যাঁদের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে কোনও অসহায় মানুষের মুখে ফিরিয়ে আনা হাসির মধ্য দিয়ে। ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসহায়কে অবলম্বন জোগানো কিংবা নিঃসঙ্গ কোনও মানুষকে এই অনুভূতি দেওয়া যে পৃথিবীতে তিনি একেবারে একা নন, সম্ভবত এটাই মানবতার সবচেয়ে সুন্দর রূপ। আগ্রায় পুলিশ আধিকারিক ইমরান আহমেদ এক বৃদ্ধার পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার এই ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
উত্তরপ্রদেশের আগ্রা জেলার ডৌকি এলাকার নারগাঁওয়ে বসবাস করেন ভুরি দেবী। অভাব-অনটন তাঁর নিত্যসঙ্গী। পরিস্থিতি এমনই যে, কখনও কখনও দু’বেলা খাবার জোগাড় করার মতো সামর্থ্যও তাঁর থাকে না। একদিন ঘরে আটা না থাকায় আগের রাতের বাসি রুটি খেয়েই তাঁকে দিন কাটাতে হয়। এটি কেবল একজন মহিলার দারিদ্র্যের কাহিনি নয়, বরং সেই অগণিত মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি, যাঁদের দুর্দশা প্রায়শই সমাজের নজরের আড়ালেই থেকে যায়।
এসিপি ইমরান আহমেদ ও তাঁর সহকর্মীরা ভুরি দেবীকে সাহায্য প্রদান করার একটি দৃশ্য
কিন্তু সেদিন ভুরি দেবীর জীবনে এক সুখকর পরিবর্তন আসে, যখন তাঁর বাড়ির সামনে এসে পৌঁছয় পুলিশের একটি গাড়ি। গাড়িটি দেখে ভয়ে শিউরে ওঠেন তিনি। হয়তো তাঁর মনে হয়েছিল, পুলিশ তাঁকে কুঁড়েঘর থেকে উচ্ছেদ করতে এসেছে। কিন্তু সেদিন পুলিশের উর্দির উদ্দেশ্য কাউকে ভয় দেখানো নয়, বরং এক অসহায় মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
উর্দির আড়ালে মানবিকতার মুখ
আগ্রার ফতেহাবাদ এলাকার অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ (এসিপি) ইমরান আহমেদের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল পৌঁছে যায় ভুরি দেবীর কুঁড়েঘরে। পুলিশকর্মীরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলে ধীরে ধীরে সামনে আসে তাঁর জীবনের নানা সমস্যার কথা। ভুরি দেবী জানান, তাঁর আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে কাজের সন্ধানে ছেলেকে আমেদাবাদে পাঠাতে হয়েছে। তিনি নিজে গ্রামে কৃষকদের জমির উপর তৈরি একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরে বসবাস করেন।
কথোপকথনের মাধ্যমে তাঁর প্রয়োজনের কথা জানতে পেরে পুলিশকর্মীরা তাঁকে রেশনসামগ্রী, শাকসবজি এবং একটি নতুন শাড়ি তুলে দেন। এই সাহায্য কেবল খাবার কিংবা পোশাক পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জীবনের কঠিন পরিস্থিতি যখন তাঁকে প্রায় একা করে দিয়েছিল, তখন এই উদ্যোগ তাঁর কাছে আপনজনের পাশে থাকার মতোই এক অনুভূতি এনে দেয়।
এই কথা শুনে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এসিপি ইমরান আহমেদ বলেন, “দাদি ( ঠাকুমা), এবার আপনি তাজা রুটি বানিয়ে খাবেন।” কথাগুলি হয়তো খুবই ছোট, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সংবেদনশীলতা ছিল অনেক বড়। কোনও অভাবী মানুষকে খাবার দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ। কিন্তু তাঁর কষ্টকে উপলব্ধি করে তাঁকে আপনজনের মতো অনুভব করানো সেই সাহায্যকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
এসিপি ইমরান আহমেদ ও তাঁর সহকর্মীরা ভুরি দেবীকে সাহায্য প্রদান করার একটি দৃশ্য
সাহায্য শুধু রেশনের নয়, ভরসারও
ভুরি দেবী জানান, পুলিশের গাড়ি দেখে তিনি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো পুলিশ তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে এসেছে। তাঁর আশঙ্কার কথা শুনে এসিপি তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে, তাঁকে উচ্ছেদ করতে পুলিশ সেখানে আসেনি। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য শুধু আর্থিক সংস্থান নয়, সংবেদনশীলতাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় কোনও বিপর্যস্ত মানুষের খাবার, পোশাক কিংবা আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি ভরসারও প্রয়োজন হয়। তাঁকে এই বিশ্বাস দেওয়া দরকার যে সমাজে এমন মানুষও রয়েছেন, যাঁরা তাঁর কষ্টকে গুরুত্ব দেন।
ভুরি দেবী পুলিশকর্মীদের সামনে নিজের আরও একটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, কেউ তাঁর মাটির উনুনটি ভেঙে দেয়। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশকর্মীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দেন। বসবাসের জন্য এক টুকরো জমির ব্যবস্থাও করে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি, যাতে নিজের একটি ঝুপড়ি তৈরি করে থাকতে পারেন। এ বিষয়ে এসিপি গ্রামপ্রধানের সঙ্গে কথা বলে সাহায্যের পথ খুঁজে বের করার আশ্বাস দেন।
পুলিশকর্মীরা আরও জানান, গ্রামপ্রধানের সঙ্গে আলোচনা করা হবে, যাতে নিয়মিতভাবে ওই বৃদ্ধার কাছে গম ও চাল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। তবে এই ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে চালু হয়েছে কি না, তার স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। এই উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই যে, সাহায্যকে কেবল এক দিনের স্বস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃদ্ধার মৌলিক চাহিদা এবং ভবিষ্যতের সমস্যাগুলির দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।
এক বৃদ্ধার যন্ত্রণা, সমাজের দায়িত্ব
এই সাক্ষাতের সময় ভুরি দেবী এমন একটি কথাও বলেন, যা তাঁর মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সংকোচের পরিচয় দেয়। তিনি জানান, একবার কোনও কাজে থানায় গিয়ে সেখানে জল পান করেছিলেন। এরপর থেকেই তাঁর মনে অপরাধবোধ তৈরি হয়। তাঁর ধারণা ছিল, জীবনে তিনি এমন কোনও কাজ করেননি, যার জন্য তাঁকে থানায় যেতে হবে।
এসিপি ইমরান আহমেদ ও তাঁর সহকর্মীরা ভুরি দেবীকে সাহায্য প্রদান করার একটি দৃশ্য
তাঁর এই বক্তব্য বুঝিয়ে দেয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কোনও অসহায় মানুষের কথা সম্মানের সঙ্গে শোনা এবং তাঁর সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়াও পরিষেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। তবে পুলিশকর্মীরা যখন নিজেদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সামাজিক সংবেদনশীলতার পরিচয় দেন, তখন সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও মজবুত হয়। ভুরি দেবীর ক্ষেত্রে পুলিশের দলের এই আচরণ সেই বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
কে এই এসিপি ইমরান আহমেদ?
এসিপি ইমরান আহমেদ উত্তরপ্রদেশ প্রাদেশিক পুলিশ পরিষেবা (পিপিএস)-এর ২০১৬ ব্যাচের আধিকারিক। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি আগ্রায় কর্মরত রয়েছেন। মূলত লখনউয়ের বাসিন্দা ইমরান আহমেদ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি), রুরকি থেকে বিটেক এবং এমটেক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর বাবার নাম আনোয়ার আলি এবং তাঁর জন্ম ১৯৮৬ সালের ৬ জুলাই।
তাঁর শিক্ষাগত ও পেশাগত কৃতিত্বের পাশাপাশি এই ঘটনায় তাঁর মানবিক দিকটিও সামনে এসেছে। কোনও আধিকারিকের দায়িত্ব কেবল নিজের পদসংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিজের অধিকার ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সমাজের দুর্বল শ্রেণির মানুষের সমস্যা বোঝা এবং তার সমাধানে অবদান রাখাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। ভুরি দেবীর কুঁড়েঘরে পৌঁছে তাঁর প্রয়োজনগুলি বোঝার উদ্যোগ সেই সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গিরই উদাহরণ।
মানবতা আজও বেঁচে আছে
বর্তমান সময়ে যখন সমাজে ক্রমবর্ধমান আর্থিক বৈষম্য, নিঃসঙ্গতা ও স্বার্থপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, তখন এই ধরনের ঘটনা নতুন করে আশার আলো দেখায়। এমন ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, মানবতার পরিচয় দিতে কোনও বড় মঞ্চ, ভাষণ কিংবা পুরস্কারের প্রয়োজন হয় না। তার সবচেয়ে সত্যিকারের রূপ প্রায়শই দেখা যায় কোনও ছোট্ট কুঁড়েঘরে, ক্ষুধার্ত মানুষের থালায় কিংবা কোনও বৃদ্ধার চোখে ফিরে আসা আনন্দের ঝিলিকে।
ভুরি দেবীকে রেশনসামগ্রী দেওয়া ছিল তাঁর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর একটি প্রচেষ্টা। কিন্তু এই ঘটনার বার্তা তার চেয়েও অনেক বড়। সেই বার্তা হল, কারও কষ্ট দেখে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত নয়, কারও ক্ষুধাকে তাঁর ভাগ্য বলে মেনে নিয়ে তাঁকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা উচিত নয় এবং কারও দুর্বলতাকে তাঁর অক্ষমতা হিসেবে না দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। মানুষের জীবন কেবল নিজের জন্য বেঁচে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। পরিবার, সমাজ এবং পৃথিবীর প্রতিও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যখন কোনও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়াই, তখন শুধু তাঁর সমস্যাই কমাই না, বরং সমাজে বিশ্বাস, সহযোগিতা ও আত্মীয়তার অনুভূতিকেও আরও শক্তিশালী করি।
প্রত্যেকের পক্ষেই নিয়মিত কোনও ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া কিংবা কোনও গৃহহীন মানুষের জন্য বাড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কোনও বৃদ্ধার কথা মন দিয়ে শোনা, কোনও অভাবী মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে কাউকে সাহায্য করা কিংবা বিপর্যস্ত কোনও মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করাও বড় কাজ হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, মানবতার প্রকৃত পরিচয় এই দিয়ে হয় না যে আমাদের কত অর্থ, কত বড় পদ কিংবা কত ক্ষমতা রয়েছে। বরং তা নির্ভর করে, আমাদের উপস্থিতি অন্য কোনও মানুষের জীবনকে কতটা সহজ করে তুলতে পারছে, তার উপর। এসিপি ইমরান আহমেদ এবং তাঁর দলের এই উদ্যোগ আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়, অন্যের পাশে দাঁড়ানো কেবল একটি ভালো কাজ নয়, বরং মানবজীবনের অন্যতম মৌলিক মূল্যবোধ। কারণ যে সমাজে একজন মানুষ অন্যের ক্ষুধাকে নিজের উদ্বেগ বলে মনে করতে শেখেন, সেই সমাজে আশার আলো কখনও নিভে যায় না। সেখানে মানবতা আজও বেঁচে থাকে।