সমাজসেবার অর্থ জোগাড়ে ইনস্টাগ্রাম রিলসকে হাতিয়ার করে মানবতার নজির মুস্তাকিমের

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
ব্যবসার লাভের ৫০ শতাংশই দান, সমাজসেবার অর্থ জোগাড়ে ইনস্টাগ্রাম রিলসকে হাতিয়ার করে মানবতার নজির মুস্তাকিমের
ব্যবসার লাভের ৫০ শতাংশই দান, সমাজসেবার অর্থ জোগাড়ে ইনস্টাগ্রাম রিলসকে হাতিয়ার করে মানবতার নজির মুস্তাকিমের
 
ভক্তি চালক 

প্রকৃতির রুদ্ররোষে এক রাতেই মাথার উপর থেকে ছাদটুকু হারিয়েছিলেন ৮২ বছরের বাৎসলা খোট ও তাঁর ১১০ বছর বয়সি মা। প্রায় সাত-আট মাস আগের সেই ঘটনা। মুষলধারে বৃষ্টিতে চালের ফাঁক দিয়ে ঝরছিল জল, আর ভাঙাচোরা ঝুপড়ির ভিতরে অসহায়ভাবে কাঁপছিলেন মা-মেয়ে। অন্ধকার সেই রাতে তাঁদের আশ্রয়টুকুও মাটিতে মিশে যায়। দুই বৃদ্ধার এমন দুরবস্থা দেখে স্থির থাকতে পারেননি সাংলি জেলার আস্তা গ্রামের বাসিন্দা মুস্তাকিম ফারুক নাদাফ। তাঁদের অসহায়তার কথা ভেবে সারা রাত অস্থির হয়ে কাটে তাঁর।
 
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিজের কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করে এবং বন্ধুদের সহযোগিতায় কয়েক দিনের মধ্যেই ওই দুই বৃদ্ধার মাথার উপর তৈরি করে দেন মজবুত টিনের ছাউনি। শুধু তাই নয়, তাঁদের ঘরে পৌঁছে দেন পাখা, গ্যাসের উনুন এবং এক বছরের রসদ। নতুন করে গড়ে দেন তাঁদের আশ্রয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই প্রথম অভিজ্ঞতাই সাংলি জেলার আস্তা এলাকার বাসিন্দা মুস্তাকিমের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।
 
মুস্তাকিম ফারুক নাদাফ
 
জীবনের প্রথম সেই সাহায্যের স্মৃতি রোমন্থন করে মুস্তাকিম বলেন, “ওই মা-মেয়েকে সাহায্য করার পর তাঁদের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু আর তাঁদের আশীর্বাদ, ব্যস, সেখান থেকেই আমার সমাজসেবার যাত্রা শুরু। আপনি এক পা এগিয়ে গেলেই পথ আপনা থেকেই খুঁজে পাবেন।”
 
উপার্জনের ৫০ শতাংশই ব্যয় করেন সমাজসেবায়
 
মুস্তাকিমের ব্যবসা বংশপরম্পরায় চলে আসছে। ১৯৭২ সালে তাঁর দাদুর হাতে শুরু হওয়া ‘ভারত গাড়ি কারখানা’ (গদি তৈরির কারখানা) বর্তমানে পরিচালনা করছেন মুস্তাকিম। বাবার আমল থেকে চলে আসা তুলোর গদি তৈরির এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক রূপ দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে গদির পাশাপাশি সোফা, নকশাদার পর্দা এবং আধুনিক ধরনের গদিও তৈরি করেন তিনি।
 
তবে তাঁর ব্যবসার সবচেয়ে বিশেষ দিকটি হল, ব্যবসা থেকে অর্জিত মোট লাভের ৫০ শতাংশই তিনি ব্যয় করেন অসহায় ও অভাবী মানুষের সেবায়। এ প্রসঙ্গে মুস্তাকিম বলেন, “আমাদের গদি ও সোফা তৈরির ব্যবসা বংশপরম্পরায় চলে আসছে। সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা না চাইতেই আমাদের অনেক কিছু দিয়েছেন। তাই প্রতিদিন আমার ব্যবসার উপার্জনের ৫০ শতাংশ সমাজসেবার জন্য আলাদা করে রাখি।”
 
এক দিনের কন্যাসন্তানকে দত্তক নিয়ে শুরু করলেন লালন-পালন
 
মুস্তাকিমের ব্যক্তিগত জীবনেও এক বড় পরিবর্তন আসে। স্ত্রীর সঙ্গে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পরও তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং নিজের দুই সন্তানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। মুস্তাকিমের আগে থেকেই একটি পুত্রসন্তান ছিল। কিন্তু তাঁর বোন পরপর চতুর্থবারের মতো কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার পর এক আবেগঘন সিদ্ধান্ত নেন মুস্তাকিম। শিশুকন্যাটির বয়স যখন মাত্র এক দিন, তখনই তাকে দত্তক নিয়ে নিজের মেয়ের মতো করে লালন-পালন শুরু করেন তিনি।
 
এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মুস্তাকিম বলেন, “এক মুহূর্তের জন্যও না ভেবে আমি মেয়েটিকে দত্তক নিয়েছিলাম। ওর অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছি। মাত্র এক দিন বয়স থেকেই সে আমার কাছে রয়েছে, আর এখন আমিই তাকে বড় করে তুলছি।”
 
মুস্তাকিম ফারুক নাদাফ
 
দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতেই তৈরি করেন সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট
 
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা অর্জন কিংবা বেশি ভিউ পাওয়ার আশায় নানা ধরনের রিলস তৈরি করেন বহু যুবক। মুস্তাকিমও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার করেছেন, তবে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মুস্তাকিমের ছোট ছেলে এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সাহায্য করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই ঘটনাই মুস্তাকিমের মনে এক নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। তিনি ভাবেন, একা সাহায্য করার পরিবর্তে সেই সাহায্যের ভিডিও যদি বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে ভিডিও থেকে অর্জিত অর্থের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অনুদানও সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। আর সেই অর্থ দিয়ে হাজার হাজার দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো যাবে।
 
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর এই যাত্রা সম্পর্কে মুস্তাকিম বলেন, “ভিডিও বানিয়ে শুধু দরিদ্র মানুষের দুরবস্থা দেখিয়ে কী লাভ? তার পরিবর্তে সেই সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জন করা এবং সেই অর্থ দিয়ে অসহায় মানুষগুলোর মুখে আবার হাসি ফোটানো, এটাই ছিল আমার আসল পরিকল্পনা।”
 
প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে পৌঁছে যায় রেশন!
 
মুস্তাকিমের সমাজসেবা কেবল কোনও উৎসব কিংবা বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের গ্রাম এবং আশপাশের এলাকার অসহায়, প্রতিবন্ধী ও অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারগুলির একটি তালিকা তৈরি করেছেন তিনি। প্রতি মাসের নির্দিষ্ট একটি তারিখে নিজেই তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দেন এক মাসের রেশন, গ্যাস সিলিন্ডার এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।
 
কারও হুইলচেয়ার প্রয়োজন, কারও দরকার ট্রাইসাইকেল, আবার কারও বাড়ি মেরামত করা জরুরি, প্রয়োজন বুঝে পাশে দাঁড়ান মুস্তাকিম। তাঁর সাহায্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সময় তিনি কখনও কারও ধর্ম কিংবা জাতপাত বিচার করেন না। নিজের কাজের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে মুস্তাকিম বলেন, “প্রথমে আমি নিজে গিয়ে খোঁজখবর নিই, ওই ব্যক্তির সত্যিই সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে কি না। তারপর প্রতি মাসের জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে রাখা হয়। সেই তারিখে আমি নিজেই গিয়ে রেশন, গ্যাস কিংবা যা যা প্রয়োজন, পৌঁছে দিই।”
 
“দারিদ্র্য কিংবা অসুস্থতার কোনও ধর্ম নেই…”
 
বর্তমান সমাজে ধর্ম ও জাতপাতকে কেন্দ্র করে যে রাজনীতি চলছে, তা দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হন মুস্তাকিম। তাঁর মতে, জন্মের পর থেকেই মানুষের সঙ্গে ধর্মের পরিচয় জুড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃতির দরবারে প্রত্যেক মানুষই সমান।
 
মুস্তাকিম ফারুক নাদাফ
 
মানবতার এই একমাত্র ধর্মে অবিচল আস্থা রেখে কাজ করে চলা মুস্তাকিম অত্যন্ত সহজ ভাষায় বলেন, “দারিদ্র্য কিংবা অসুস্থতা কাউকে আঘাত করার আগে দেখে না যে সে হিন্দু না মুসলিম। আমি মুসলিম পরিবারে জন্মেছি, তাই মুসলিম হয়েছি; আপনি হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন, তাই হিন্দু হয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধর্ম হল মানবতা। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজেদের গলির অন্তত একজন দরিদ্র মানুষের দায়িত্ব নিই, তাহলে রাস্তায় কাউকে ভিক্ষা করতে দেখতে হবে না।”
 
নিজের কাজের মধ্য দিয়েই মুস্তাকিম প্রমাণ করেছেন, পৃথিবীকে বদলে দিতে বিপুল অর্থ কিংবা উচ্চপদে আসীন হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, মানবিকতা এবং অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা।


শেহতীয়া খবৰ