মা উমার বিদায়যাত্রায় আলোর মিছিল মুসলিমদের! চাঁচল রাজবাড়ির দুর্গা বিসর্জনে মুসলিমদের লণ্ঠনের আলোয় জ্বলে ওঠে সম্প্রীতির শিখা
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
চাঁচল রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর বয়স আনুমানিক ৩৭৫ বছর। ৩ শতক পেরিয়েও বদলায়নি এই পুজোর সম্প্রীতির ছবি। রাজবাড়ির দুর্গা বিসর্জনে পথ দেখান মুসলিমরা। গোধুলি লগ্নে এলাকার সংখ্যালঘু নারী-পুরুষের লণ্ঠনের আলোয় জেগে ওঠে বাংলার ঐতিহ্য। বছরের পর বছর ধরে বিসর্জনের দিনে পুকুরের দুপাড়ে সারি সারি লণ্ঠনের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে বিসর্জনের পথ। আর সেই আলো দেখেই কৈলাশে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হন মা উমা। ঢাকের বাদ্যিতে ওঠে বিষাদের সুর।
দেবীর বিদায়পর্বে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন আপামর বাঙালি। তবে চাঁচল রাজবাড়ির পুজোর ঐতিহ্যে ধর্মের পরিচয়ের থেকেও বড় হয়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন। মালদার চাঁচল রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় এই ছবিটাই যেন প্রতিবছর সম্প্রীতির বার্তা ছড়ায় গোটা সমাজে। বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসবের আসল আনন্দ মানুষে মানুষে বিভাজনে নয়, একে অপরের আত্মিক বন্ধনে।
চাঁচলের ৩১ নং জাতীয় সড়কের ডানদিকে রয়েছে পাহাড়পুর চণ্ডী মণ্ডপ। দেবীর নিরঞ্জন সম্পন্ন হয় সড়কের বাঁ দিকে মন্দির থেকে প্রায় পাঁচ'শো মিটার অদূরে মহানন্দার সতীঘাটে। সেই সতীঘাটের ওইপারে মুসলিম অধ্যুষিত সাহুরগাছি গ্রাম। তারাই বিগত দিন গুলিতে নিরঞ্জনের সময় মাকে আলো দেখান। আগে লণ্ঠনের আলো দেখানো হত। তবে আধুনিক জমানায় লণ্ঠনের চল নেই। গত দুই বছর ধরে মোবাইলের আলো দেখানো হয়েছে। কেউ ব্যবহার করেন চার্জার লাইট।
শতবর্ষ প্রাচীন পুজোয় বিসর্জনের আগেই এক বিশেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকেন গ্রামের সকলে। মুসলিম সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষের হাতে আলো জ্বললেই সেই আলোতে পথ দেখেই শুরু হয় দেবীর বিদায়যাত্রা। রাজবাড়ির সদস্যদের কথায় জানা যায়, সংখ্যালঘুদের হাতে আলো জ্বালিয়ে মাকে পথ দেখানোর এই প্রথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে নিয়ে চলেছেন এলাকার সর্ব ধর্মের মানুষ। আজও প্রথা মেনে দশমীর সন্ধ্যায় সেই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমান বহু মানুষ।
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
মালদা জেলার চাঁচল রাজবাড়ির এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক কাহীনি। কথিত আছে, চাঁচলের রাজা শরৎচন্দ্র রায় বাহাদুর স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে দেখেন, মহানন্দা নদীর সতীঘাটে অপেক্ষা করছেন স্বয়ং দেবী মা উমা। স্বপ্ন দেখার পর সেখানে গিয়ে তিনি কোষ্ঠীপাথরের দেবীমূর্তি আবিষ্কার করতেই শোরগোল পড়ে যায় রাজবাড়িতে। পরে সেই মূর্তি রাজবাড়ির ঠাকুরবাড়িতে প্রতিষ্ঠা করা হলেও, জনশ্রুতি অনুযায়ী দেবীর ইচ্ছা ছিল পাহাড়পুরের সেই স্থানেই তাঁর পুজো হবে যেখান থেকে পাওয়া গিয়েছিল দেবীর মুর্তি। সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই প্রথা মেনে আজও পুজো করে আসছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তবে এই পুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন পর্বটি জড়িয়ে রয়েছে বিসর্জনের সময় মুসলিমদের হাতে লণ্ঠন দেখানোর প্রথার সঙ্গে।
স্থানীয় জনশ্রুতিতে শোনা যায়, একসময় ভয়াবহ মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল পাহাড়পুর এলাকায়। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছিলেন সেই অজানা রোগের প্রকোপে। আতঙ্ক ছড়ায় গ্রামজুড়ে। সেই সময় দেবী স্বপ্নাদেশে নির্দেশ দেন, দশমীর দিন গোধূলিলগ্নে তাঁর ফেরার পথে যেন ওই সম্প্রদায়ের মানুষ আলো ধরেন। তখন বিদ্যুতের আলো বলে কিছুই ছিল না। আলো জ্বালতে একমাত্র ভরসা ছিল লণ্ঠন। দেবীর নির্দেশ মেনে বিসর্জনের দিন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা লণ্ঠন হাতে ধরে সেই আলোয় মায়ের পথ দেখাতে শুরু করেন।
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
শোনা যায়, সংখ্যালঘু হাতে লণ্ঠনের আলো দেখানোর সেই প্রথা চালু হওয়ার পর মহামারীর প্রকোপও কমে যায় গ্রামে। তবে এই জনশ্রুতির মধ্য দিয়ে সমাজে যে সম্প্রীতির ছবিটা ফুটে ওঠে তার গুরুত্ব আজও অমলিন। সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা, এসেছে বিদ্যুতের আলো। লন্ঠনের বদলে জায়গা নিয়েছে টর্চ কিম্বা চার্জার লাইট। তবে লণ্ঠন হাতে মাকে পথ দেখানোর ঐতিহ্য আজও একইভাবে বয়ে চলেছে।
দেবী দুর্গার বিদায়ের মুহূর্তে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মানুষের এই উৎসবে অংশগ্রহণ বার্তা দেয়, উৎসব কারও একার নয়। ঐতিহ্য ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে উৎসবের সার্থকতা। চাঁচল রাজবাড়ির বিসর্জনে লণ্ঠন হাতে দাঁড়ানো মানুষগুলো যেন প্রতি বছর নতুন করে মনে করিয়ে দেন উৎসব আসে নিয়ম করে কিন্তু সম্প্রীতির আলো সারাবছর।