হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে মাতেন দুর্গাপুজোয়! ইছামতির তীরে শতবর্ষের দুর্গোৎসব, বুড়িমার দান করা জমিতে আজও অটুট সম্প্রীতির বন্ধন
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
পুরোনো টালির চাল আর মাটির দেওয়ালের ছোট্ট ঠাকুরদালান থেকে শতবর্ষের এই পুজোর পথচলা। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাদুড়িয়ার তারাগুনিয়ায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে দুর্গোৎসবের দিনগুলোতে আনন্দে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন এলাকার মানুষজন। মা উমার আরাধনাকে কেন্দ্র করে এলাকার মানুষ যেন ধর্মের বিভেদ ভুলে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান। সম্প্রীতির অনন্য নজির দেখা যায় বসিরহাটের এই গ্রামে।
<
উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হন গ্রামের সব বয়সীরা। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় আয়োজন, বদলে যায় উদযাপনের ধরন। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতির বন্ধন যেন আরও দৃঢ় হয়। উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ার ইছামতি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষের দুর্গোৎসব যেন সম্প্রীতির সেই ছবিটাই তুলে ধরে। এখানে দুর্গাপুজো আসলে বহু প্রজন্মের স্মৃতিকে তুলে ধরে। এই পুজো আসলে প্রাচীন ঐতিহ্য আর সামাজিক ঐক্যের এক জীবন্ত দলিল।
বাদুড়িয়া পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তারাগুনিয়ার পশ্চিমপাড়া সার্বজনীন দুর্গাপুজো এবার শতবর্ষে পা দিয়েছে। শোনা যায়, একসময় টালির চাল আর মাটির দেওয়ালের ছোট্ট ঠাকুরদালানে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। সময়ের হাত ধরেই সেই পুজোই আজ পরিণত হয়েছে এলাকার মানুষের বারোয়ারী দুর্গোৎসবে। জাঁকজমকের খুব বেশি আয়োজন নেই কিন্তু এখানে সবচেয়ে চোখে পড়ে মানুষের আন্তরিকতা। বলা ভালো, এই পুজোয় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়েও প্রাধান্য পায় পারস্পরিক সৌহার্দ্য।

শতবর্ষের দুর্গোৎসব
এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হেমলানি মুখার্জির নাম। যাঁকে এলাকার মানুষ ভালোবেসে ডাকতেন ‘বুড়িমা’। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুড়িমার উদ্যোগেই গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দাকে সঙ্গী করে সূচনা হয়েছিল এই দুর্গোৎসবের। পুজোর জন্য তিনি দান করেছিলেন নিজের প্রায় দেড় বিঘা জমি। আজ বুড়িমা নেই, এমনকি তাঁর বংশধরেরাও নেই। কিন্তু তাঁর দান করে যাওয়া জমিতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্বলজ্বল করছে ঐতিহ্যের আলো। গ্রামের নানা বয়সী নানা ধর্মের মানুষের সহযোগীতায় আজও একইভাবে চলছে পুজোর আয়োজন।
সময় বদলেছে, পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে ইচ্ছে। আর তাই একসময়ের মাটির দেওয়াল আর টালির চালের ঠাকুরদালান আজ হয়েছে পাকা। এলাকার বাসিন্দারাই নিজেরদের ইচ্ছেতেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে স্মৃতিবিজড়িত এই পুজোকে নতুন করে সাজিয়ে তুলেছেন। তবে কাঠামো বদলালেও বদলায়নি পুজোর মূল প্রথা, রীতিনীতি। পুরনো দিনের আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্ম যেন এগিয়ে নিয়ে চলেছে শতবর্ষের এই ঐতিহ্যকে।
পুজো উদ্যোক্তা মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ, সুমন ভট্টাচার্য ও সম্প্রীতি সরকারদের কথায়, শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পুজোর উৎসব। তারপর কয়েকটা দিন ঠাকুরদালান ঘিরে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই দুর্গাপুজোয় আনন্দে মেতে ওঠেন। পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থাকে নিরামিষ ভোজ, নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটকের আয়োজন। মুক্তমঞ্চে এলাকার নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার জন্য কয়েক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে দেন। এখানে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্য কোনও ধর্মীয় পরিচয় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। পুজোর কটাদিন একসঙ্গে আনন্দে কাটানোর মধ্য দিয়েই আরও দৃঢ় হয় প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর সম্পর্ক। ঠাকুরদালানের আঙিনাই হয়ে ওঠে সামাজিক মিলন আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার মঞ্চ।
দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের সময় ইছামতি নদীতে শতবর্ষী ঐতিহ্য ভারত ও বাংলাদেশকে এক করে
বুড়িমার শুরু করা এই দুর্গোৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এলাকায় বয়ে চলা ইছামতি নদী। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা পুজোর শেষ পর্বে প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে বিশেষ আকর্ষণ। সব মিলিয়ে এই পুজো যেন এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছে। শুধু তারাগুনিয়ার পশ্চিমপাড়া নয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আটুরিয়ার প্রায় শতবর্ষের সার্বজনীন দুর্গাপুজোও বহন করে চলেছে সম্প্রীতির বার্তা।
পুজো উদ্যোক্তা শিবানী চ্যাটার্জি, সুজিত কুমার রায়, পরিতোষ মণ্ডল ও মনোতোষ রায়দের বক্তব্য, এই পুজোকে কেন্দ্র করে এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হন। উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি আরও দৃঢ় হয় পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক। বুড়িমার দান করা জমিতে শুরু হওয়া গ্রাম্য পুজো আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও তুলে ধরেছে সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে এলে দেখা যাবে তাঁর রেখে যাওয়া ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এলাকার মানুষ।