মানচিত্রে দুই দেশ, হৃদয়ে এক বাংলা! টাকির ইছামতীতে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে আজও বেঁচে আছে আত্মীয়তার টান, সম্প্রীতির অনন্য ছবি

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 h ago
মানচিত্রে দুই দেশ, হৃদয়ে এক বাংলা! টাকির ইছামতীতে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে আজও বেঁচে আছে আত্মীয়তার টান, সম্প্রীতির অনন্য ছবি
মানচিত্রে দুই দেশ, হৃদয়ে এক বাংলা! টাকির ইছামতীতে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে আজও বেঁচে আছে আত্মীয়তার টান, সম্প্রীতির অনন্য ছবি
 
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ

দুদেশের মানচিত্র ভাগ হয়েছে ঠিকই কিন্তু মানুষের মধ্যে ভাগ হয়নি বাঙালির সংস্কৃতি আর উৎসবের টান। বিজয়া দশমীতে ইছামতীর বুকে দুই বাংলার প্রতিমা নিরঞ্জন ঘিরে আজও আবেগে ভাসে উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত শহর বসিরহাটের টাকি। প্রতিমা বিসর্জনের দিনে ধর্ম-বর্ণের ব্যবধান ভুলে নদীর দুই পাড়ে মানুষের জমায়েত যেন মনে করিয়ে দেয় উৎসবের ভাষা আসলে একটাই তা হল আমাদের সম্প্রীতি।
 
দুর্গাপুজোর বিদায়লগ্নে টাকির ইছামতী নদীর বুকে তৈরি হয় অন্য এক পরিবেশ। ঢাকের বাদ্যিতে বিষাদের সুর, সিঁদুর খেলা, প্রতিমা নিয়ে নদীর দিকে এগিয়ে চলা নৌকা আর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের চোখ যেন দশমীর দিনে তুলে ধরে মানুষের ঐক্য। তুলে ধরে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার এক অনন্য ছবি।
 
দেশভাগের সময় ঠিকানা বদল করতে কাঁটাতার টানা হয়েছিল। আলাদা হয়েছিল ভূখণ্ড, বদলে গিয়েছিল পরিচিত মানুষগুলোর ঠিকানা। কিন্তু ভাষা, লোকাচার, উৎসব আর শিকড়ের টানকে কি এত সহজে ভাগ করা যায়? টাকির ইছামতী যেন প্রতি বছর বিজয়া দশমীর দিন সেই প্রশ্নগুলোই ফিরিয়ে দেয়। নদীর এপারে ভারত ওপারে বাংলাদেশ, মাঝখানে ইছামতী য়েন আন্তর্জাতিক সীমান্ত। অথচ দুর্গাপুজোয় উৎসবের মুহুর্তে আবেগে দুই পাড়ের মানুষের অনুভূতিতে আজও অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
 
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
 
ইতিহাস বলছে, টাকির বিসর্জন-ঐতিহ্যের শিকড় জড়িয়ে রয়েছে এই অঞ্চলের প্রাচীন জমিদারবাড়ির পুজোর অস্তিত্বের সঙ্গে। বসিরহাটের বিভিন্ন বনেদি বাড়ির প্রতিমা নিরঞ্জন দেখতে নদীর দুই পাড়ে ভিড় জমাতেন দুই দেশের মানুষ। সীমানা আলাদা হলেও অতীতে বহু বছর ধরে দশমীর এই দিনে চলত মাঝনদীতে নৌকার সমাগম, পরিচিতজনের খোঁজ নেওয়া আর  শুভেচ্ছা বিনিময়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়েছে এই ঐতিহ্য। কিন্তু এই দিনেই এসব স্মৃতি আজও স্থানীয়দের কথায় ফিরে আসে। সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিরাপত্তা বিধি কঠোর হয়েছে। মাঝনদীতে অবাধ যাতায়াত ও নৌকাবিহারে এসেছে নিয়ন্ত্রণ। তবু সেই পুরনো ঐতিহ্যের আবেগ মুছে যায়নি দুপারের মানুষের মন থেকে। সীমান্তের নিয়ম মেনেই মানুষ আজও ইছামতীতে দশমীর দিনে এই দৃশ্যের সাক্ষী হতে ভিড় করেন। তৈরি হয় নানা ধর্ম বর্নের মানুষের মিলনক্ষেত্রে। 
 
দশমীর দিনে নদীর ঘাটে দাঁড়ালে দেখা যায় নানা বয়সের দর্শনার্থী। কেউ পরিবার নিয়ে এসেছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ আবার বহু বছর পর ফিরে এসেছেন শৈশবের স্মৃতি খুঁজতে। ধর্মীয় পরিচয় সরিয়ে  মা উমার বিদায়বেলায় সকলেই জড়িয়ে পড়েন একই আবেগে। আসলে এই দিনে মিশে থাকে বিষাদ, আর সেই অনুভূতিই যেন মানুষকে আরও কাছাকাছি আনে। দর্শনার্থীদের কথাতেও ধরা পড়ে এই বিশেষ অনুভূতি। এক দর্শনার্থীর কথায়, “টাকির বিসর্জন শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়, মন দিয়ে অনুভব করার মতো। নদীর দুই পাড়ে মানুষকে একই উৎসবের টানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে মনে হয়, সীমান্ত থাকলেও মনের দূরত্ব তৈরি হয়নি।”
 
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি

পরিবারের সঙ্গে আসা আর এক দর্শনার্থীর উপলব্ধি, “সন্তানদের এই বিশেষ দৃশ্য দেখাতে নিয়ে এসেছি।  যাতে ওরা বুঝতে পারে, সংস্কৃতি আর সম্প্রীতির কোনও কাঁটাতার হয় না।” তবে এই ঐতিহ্যের সাক্ষী থেকেও সীমান্তের নিরাপত্তা বিধি মেনে চলাও জরুরি। নিরাপত্তা বজায় রেখেই এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন বড় দায়িত্ব। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব শেষে এটা পরিষ্কার যে, দেশের সীমানা ভাগ হতে পারে কিন্তু সংস্কৃতি, মানবিকতা আর সম্প্রীতির বন্ধনকে কখনও আটকে রাখা যায় না।


শেহতীয়া খবৰ