এক ফোনেই ছুটে যান হাসপাতালে! ৪০০-র বেশি মুমূর্ষু রোগীর ভরসা মালদার ‘ব্লাডম্যান’ মিসবাহুল আলম জেমস, গড়েছেন একটি ‘মানবিক’ টিম
Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 1 h ago
এক ফোনেই ছুটে যান হাসপাতালে! ৪০০-র বেশি মুমূর্ষু রোগীর ভরসা মালদার ‘ব্লাডম্যান’ মিসবাহুল আলম জেমস, গড়েছেন একটি ‘মানবিক’ টিম
তরুণ নন্দী / কলকাতা
ভোর হোক বা গভীর রাত, ফোন আসতেই থাকে। এবারে ওপার থেকে উদ্বেগভরা কণ্ঠে জানানো হল থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ১১ বছরের এক শিশুর রক্ত চাই। অনেকদিন ধরে রক্তের অপেক্ষায় দিন গুনছে সে। আর রোগীর রক্তের প্রয়োজন, এটা শোনার পর আর দেরি করেননি মিসবাহুল আলম জেমস। এবারও ফোনটা আসার পর সব ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে সোজা তিনি পৌঁছে যান চাঁচল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। তারপর নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে বাঁচার লড়াইয়ে থাকা শিশুটির পাশে দাঁড়ালেন।
মিসবাহুল আলমের কাছে মনে হয় এটাই বোধহয় মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয়। কারও বিপদের খবর কানে এলেই যেন স্থির থাকতে পারেন না তিনি। রক্তের প্রয়োজন মেটাতে তাঁকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। বিপদের দিন বন্ধু বলতে এক কথায় এই যুবককে ভালো করেই চেনেন মালদাবাসী।
মালদা জেলার রতুয়া-১ ব্লকের ভাদো গ্রামের বাসিন্দা সমাজসেবী মিসবাহুল আলম জেমস। চাঁচল মহকুমার বহু মানুষের কাছে তিনি বিপদের দিনে হয়ে থাকেন শেষ ভরসা। কারও পরিবারের সদস্যের রক্তের প্রয়োজন, কেউ রক্তের অভাবে দিকে দিকে ঘুরছে, এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রথমে ফোন করেন মিসবাহুল আলম জেমসকে। আর্ত মানুষের সেই ডাক কখনোই উপেক্ষা করেন না তিনি। নিজের ব্যক্তিগত ব্যস্ততাকে সরিয়ে সব কিছুর আগে গুরুত্ব দেন মানুষের জীবন বাঁচাতে। রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে সদ্য আঠারো পেরিয়েছেন মিসবাহুল। সমাজসেবা করতে উৎসাহ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সামসি ইউনাইটেড ইয়াংস ক্লাবের একটি রক্তদান শিবিরে গিয়েছিলেন। জীবনে প্রথমবার রক্ত দিয়েছিলেন সেই শিবিরে। সেদিনই ছিল তাঁর প্রথম রক্তদান। আর সেদিনই নিজের রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি এ পজিটিভ। রক্তদান করে তিনি আপ্লুত হয়েছিলেন। তারপর থেকে শুরু হয় এক অন্য লড়াই। নিজের রক্ত দিয়ে রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অন্যদের মধ্যেও রক্তদানে উৎসাহিত করতে শুরু করতে থাকেন। পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ, বন্ধুদের নেটওয়ার্ক, ফেসবুকের মাধ্যমে রক্তদাতার খোঁজ, এইসব কিছুই হয়ে ওঠে তাঁর মানবিক অভিযানের হাতিয়ার।
আজ পর্যন্ত কত মানুষের বিপদের দিনে পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি? তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চারশোরও বেশি রোগীকে রক্ত দিয়ে বা রক্তদাতার ব্যবস্থা করে সাহায্য করেছেন মিসবাহুল। নিজেও ছুটে গিয়ে রক্তদান করেছেন একাধিকবার। তবে তিনি এতজন মানুষকে রক্ত দিয়ে ও জোগাড় করে তাঁদের মুখে ফিরে আসা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পেরে খুশি। আসলে রক্তের প্রয়োজন হলে জেমসকে একটা ফোন করলেই নিশ্চিত হয়ে যান রোগীর পরিজনেরা।
বর্তমানে তাঁর বহুল পরিচিতির কারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় রক্তের আবেদন ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগে না। কিন্তু আবেদন পৌঁছনোর পর সঠিক রক্তদাতাকে খুঁজে বের করা, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং প্রয়োজনের সময়ে তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। যে কাজটাই কয়েক বছর ধরে নীরবে করে চলেছেন মিসবাহুল। অতীতে যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, তাঁদের নাম, যোগাযোগের নম্বর ও রক্তের গ্রুপ নিজের কাছে নথিভুক্ত করে রাখেন তিনি। ফলে কোথাও কোনও রোগীর রক্তের প্রয়োজন দেখা দিলে দ্রুত সম্ভাব্য রক্তদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
তিনি বোঝেন জরুরী সময়ে রক্তের জন্য রোগীর পরিবার কতটা উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করে। রোগীর পরিবারের কাছে সেসময় প্রতিটি মিনিট তখন গুরুত্বপূর্ণ। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর মতো একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ পাশে থাকা মানে অনেক বড় সাহস পাওয়া। মিসবাহুলের এই নিরলস সামাজিক দায়বদ্ধতাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন সামসি কলেজের অধ্যাপক আমিনুল হক। স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য তিনিই মিসবাহুলকে ‘ব্লাডম্যান’ নামে ভূষিত করেন। নামটি আজ যেন এই যুবকের পরিচয়ের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। চাঁচল মহকুমার নানা প্রান্তে রক্তের প্রয়োজন দেখা দিলে সেই নামই ঘুরে ফিরে আসে মানুষের মুখে।
তবে মিসবাহুলের এই সামাজিক কর্মকান্ডের বাইরেও পড়াশোনার পাশাপাশি নাট্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত।গাজোল মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ড. মনোজ ভোজের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে নাটকের দলে অভিনয় করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। বলা ভালো, নাট্যমঞ্চে কোন চরিত্রে অভিনয় করে তিনি মানুষের মন ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ঠিকই আর বাস্তব জীবনে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
মিসবাহুল আলম জেমস
নিজে দায়িত্ব নিয়ে অনেক রক্তদাতাকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছেন। তাই তো তাঁর কাজের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে বহু পরিবারের জীবনে। আর এভাবেই রক্তের বন্ধনেই মিসবাহুল আলম জেমস হয়ে উঠেছেন মানুষের আপনজন। মালদার এই ‘ব্লাডম্যান’ শিখিয়েছেনস মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।