পদ্মা কেড়ে নিচ্ছে ভিটেমাটি, বিপন্ন শতবর্ষের মসজিদ! ভাঙনবিধ্বস্ত তারানগরে অসহায় মানুষের পাশে ‘মানবতা’ নিয়ে জুলফিকার আলী পিয়াদা
তরুণ নন্দী / কলকাতা
পদ্মার গ্রাসে তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদীপাড়ের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি। ভাঙনের কবলে চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় মানুষের আজন্মের স্মৃতি। নদী ভাঙনের জেরে মাথার ওপর ছাদ হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে অসংখ্য পরিবার। মুর্শিদাবাদের লালগোলা ব্লকের তারানগরে এই বিপর্যয়ের ছবি যেন ক্রমশ আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। দুর্দশায় পড়ে দিন কাটাতে হচ্ছে বহু পরিবারকে। এমন কঠিন সময়ে এইসব অসহায় মানুষগুলোর পাশে এসে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিল সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা ‘মানবতা’।
সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার আলী পিয়াদার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে অসহায় পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়েছে। জুলফিকার আলী পিয়াদার সঙ্গে মানবতার প্রতিনিধিদলে ছিলেন আব্দুস সালাম ও বুরহান উদ্দিন। তাঁরাও ভাঙনবিধ্বস্ত এলাকা ঘুরে দেখে বুঝলেন এই মানুষগুলো বর্তমানে কতটা অসহায়। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির কাছ থেকে তাঁদের দুর্দশার কথা শোনেন। পাশে থাকার বার্তা দিয়ে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়া হয় সংস্থার পক্ষ থেকে। জীবনের স্বাভাবিক ছন্দটুকুও হারিয়ে ফেলা মানুষগুলো যেন ‘মানবতা’-কে আঁকড়ে কিছুটা স্বস্তি পেলেন।
নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে জুলফিকার আলী পিয়াদা
তারানগরের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এই এলাকার শতবর্ষের পুরনো জামে মসজিদকে ঘিরে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, পদ্মা আর মাত্র কয়েক ফুট এগিয়ে এলেই মসজিদটির অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। একইভাবে নদীভাঙনের কবলে তলিয়ে যেতে পারে এই এলাকার পূর্বপুরুষদের কবরস্থান। এলাকার ভূমিপুত্র, সাহিত্যিক ও শিক্ষক জহির-উল-ইসলাম মানবতার প্রতিনিধিদলকে ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন ঘুরিয়ে দেখিয়ে বোঝালেন নদী ভাঙনে জেরে এই মানুষগুলোর বাস্তব অবস্থাটা। নদী ভাঙনে নিজেদের ভিটেবাড়ি হারিয়ে গত বছর থেকে একটি বাগানে পলিথিন দিয়ে ঘিরে অস্থায়ী তাঁবু তৈরি করে দিন কাটাচ্ছে ১৫টি পরিবার।
অন্যদিকে, প্রায় ৪০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে নিকটবর্তী রামনগর গ্রামের একটি মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রে। এদের কারও মাথার ওপর নেই ছাদ। শুধু রয়েছে একরাশ অনিশ্চিতা। এই পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলে তাঁদের প্রয়োজন আর দৈনন্দিন সমস্যার খোঁজ নিলেন মানবতার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। জুলফিকার আলী পিয়াদার বলেন, তারানগরের মানুষের অসহায়তা সত্যিই দুঃখজনক। ঘরবাড়ি হারানো মানুষগুলির কাছে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা নিরাপদ আশ্রয়। তাঁদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু সাময়িক ত্রাণ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।
এই এলাকা ঘুরে দেখার সময় শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে চলাফেরায় সমস্যায় থাকা আসাদুল হকের দুরবস্থাও নজরে আসে প্রতিনিধিদলের। কথা বলে তাঁরা জানতে পারেন, আসাদুল হকের একটি পুরনো ট্রাইসাইকেল থাকলেও সেটা খারাপ হয়ে পড়ায় আর সচল নেই। বিষয়টি জানার পর মানবতার পক্ষ থেকে ট্রাইসাইকেলটি মেরামত করে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়া হয়। অনান্য মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নদীভাঙনে ঘরবাড়ির সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে সন্তানদের পড়াশোনার বইখাতাও।
নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে জুলফিকার আলী পিয়াদা
রামনগরের আশ্রয়কেন্দ্রে মানবতার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা হয় একাদশ শ্রেণির ছাত্রী পারভিন খাতুনের। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদী গ্রাসে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর পাশাপাশি তার শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পারভিনের মুখে তার বাস্তব পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে প্রয়োজনীয় বইপত্র ও শিক্ষাসামগ্রী দেওয়ার উদ্যোগ নেয় মানবতা। সাহিত্যিক ও শিক্ষক জহির-উল-ইসলামের তত্ত্বাবধানে পরবর্তীতে তার হাতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। বিপর্যয়ের মধ্যেও যাতে পড়াশোনার পথ বন্ধ না হয়ে যায়, সেই লক্ষ্য রয়েছে মানবতার।
গত বছর এবং এবছর মিলিয়ে তারানগরে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা এতটাই বেশি যে, প্রত্যেকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আগামীতে মানবতার পক্ষ থেকে সাধ্য মতো ত্রাণ তহবিল জহির-উল-ইসলামের হাতে তুলে দেওয়া হবে। যা দিয়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে অন্তত অধিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে যায় তার ব্যবস্থা করা হবে বলে সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজ্য সরকারের কাছে তাঁদের আবেদন, বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এই পরিবারগুলোর জন্য।