আপেল বাগানের ফাঁকে কাশ্মীরি জাফরান চাষ! নতুন কৃষি পরীক্ষায় আশার আলো দেখছেন কৃষক মহম্মদ সুলতান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
আপেল বাগানের ফাঁকে কাশ্মীরি জাফরান চাষ! নতুন কৃষি পরীক্ষায় আশার আলো দেখছেন কৃষক মহম্মদ সুলতান
আপেল বাগানের ফাঁকে কাশ্মীরি জাফরান চাষ! নতুন কৃষি পরীক্ষায় আশার আলো দেখছেন কৃষক মহম্মদ সুলতান
 
বাসিত জারগার / পাম্পোর (কাশ্মীর)

বিশ্বের সবচেয়ে দামি মশলা জাফরান বা কেশরের বার্ষিক ফসল তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কাশ্মীরের কৃষকরা। এমন সময় এক কাশ্মীরি কৃষক আপেল চাষের পাশাপাশি জাফরান ফলানোর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য, বছরের একটা বড় সময় যাতে বিস্তীর্ণ জমি অনাবাদি পড়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করা।
 
পাম্পোরের কাছে আশনুম্বাল গ্রামের কৃষক মহম্মদ সুলতান রাথার উচ্চ-ঘনত্বের আপেল গাছের সারির মাঝখানে জাফরান চাষ করেছেন। আপেলের চারাগাছ বড় হয়ে ওঠার সময় যে জমি অন্যথায় ফাঁকা পড়ে থাকত, সেই জমিই তিনি কাজে লাগিয়েছেন। প্রথম বছরেই তাঁর জমিতে জাফরান ফুল ফুটেছে। রাথারের দাবি, আশপাশের ক্ষেতের তুলনায় তাঁর জমিতে পাঁচ থেকে ১৫ দিন আগে ফুল ফুটেছে।
 
জাফরান ক্ষেতে একটি শিশু
 
২০২৫ সালে তিনি আপেল গাছ লাগিয়েছিলেন এবং চলতি বছরে জাফরানের কন্দ রোপণ করেছেন। কাশ্মীরের কারেওয়া অঞ্চলের কৃষি-পরিবেশের সঙ্গে জড়িত এই দুই ফসল একই জমিতে একসঙ্গে চাষ করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখাই তাঁর উদ্দেশ্য। পাশাপাশি, সময়মতো সেচ এবং উন্নত মাটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে ওঠা বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতিতে জাফরান চাষকে কীভাবে মানিয়ে নেওয়া যায়, তা-ও পরীক্ষা করে দেখছেন তিনি।
 
আপেল গাছের সারির মাঝখানে ফাঁকা জমি দেখেই এই ভাবনা আসে রাথারের মাথায়। উচ্চ-ঘনত্বের আপেল বাগানে সাধারণত এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব থাকে ছয় থেকে ১০ ফুট। আপেল গাছ যখন তুলনামূলকভাবে ছোট থাকে, তখন সারির মাঝখানের জমি কাজে লাগানোর সুযোগ দেখতে পান তিনি।
 
২০২৫ সালের আগস্টে জাফরানের কন্দ রোপণ করেন রাথার। ২০২৬ সালের অক্টোবরের মধ্যে সেই গাছগুলিতে প্রথম ফুল ফুটেছে। কীভাবে এই পরীক্ষার সূচনা হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাথার বলেন, “আমি ভাবলাম, এই ফাঁকা জায়গায় জাফরানের কন্দ লাগাব না কেন?”
 
এরপরই আপেল বাগানে আগে থেকে থাকা পরিকাঠামো ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী জাফরান চাষের পরীক্ষা শুরু করেন তিনি। তাঁর উচ্চ-ঘনত্বের আপেল বাগানে ড্রিপ সেচের ব্যবস্থা ছিল। এর সাহায্যে জাফরান গাছের বৃদ্ধির নির্দিষ্ট পর্যায়ে প্রয়োজনমতো জল দিতে পেরেছেন রাথার।
 
 
তিনি জানান, ২০২৬ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ওই জমিতে দুই থেকে তিনবার সেচ দিয়েছেন। পাশাপাশি, জুন মাস থেকে শুরু করে জাফরানের কন্দ রোপণের সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মাটি কর্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, এই পদ্ধতির ফলে কন্দগুলি মাটিতে শিকড় বিস্তার করতে পেরেছে এবং পর্যাপ্ত আর্দ্রতাও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
 
 নিজের ক্ষেতে রাথারের পরিবারের সদস্যরা
 
তরুণ আপেল গাছগুলিও কিছুটা সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করছেন রাথার। তাঁর বিশ্বাস, গাছের আংশিক ছায়ায় সরাসরি সূর্যালোকের কারণে মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ার পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে জাফরান ফুল ফোটার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আগেভাগে ফুল ফোটায় উৎসাহিত হয়েছেন তিনি। তবে ফুল ফোটার সময়ের এই পার্থক্যের কারণ কী এবং এই পদ্ধতিতে উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়ে, তা জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন।
 
রাথারের এই পরীক্ষা জাফরান চাষিদের একটি সাধারণ উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত। চাষের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলিতে বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে। তাঁর স্মৃতিচারণ, প্রায় দুই দশক আগে সময়মতো বৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বৃষ্টিপাতের ধরন ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
 
জাফরান চাষে প্রচুর সেচের প্রয়োজন হয় না। তবে ফুল ফোটার পর্যায়ে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা বজায় রাখা জরুরি। রাথারের বিশ্বাস, সঠিক সময়ে পরিকল্পিতভাবে জল দিলে সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ার ঘাটতি কিছুটা পূরণ করা সম্ভব। আপেল গাছের জন্য তৈরি সেচব্যবস্থা ব্যবহার করেই তিনি এই সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে পেরেছেন। জাফরানের জন্য আলাদা সেচব্যবস্থা তৈরি করার প্রয়োজন হয়নি।
 
জাফান ফুল ফোটার পাশাপাশি ফুলের গঠনও তাঁকে উৎসাহিত করেছে। রাথার জানান, জাফরানের যে গর্ভমুণ্ড বা স্টিগমা, লাল সুতোসদৃশ অংশ সংগ্রহ করে জাফরান তৈরি করা হয়, সেগুলি তাঁর প্রত্যাশার তুলনায় বড় ও মোটা বলে মনে হয়েছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, সাধারণত এক কিলোগ্রাম তাজা জাফরান ফুল থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ গ্রাম শুকনো জাফরান পাওয়া যায়। তবে তাঁর ধারণা, নিজের জমির ফসল থেকে এর চেয়ে বেশি জাফরান পাওয়া যেতে পারে।
 
যদিও প্রকৃত উৎপাদনের পরিমাণ ও গুণমান বোঝা যাবে ফসল তোলার পর তা ওজন করা এবং শুকনো জাফরানের গুণমান যাচাই করার মাধ্যমেই। প্রথমবার ফুল ফোটা থেকেই যে এই পদ্ধতিতে উন্নত মানের জাফরান উৎপাদিত হচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
 
সদ্য তোলা জাফরান ফুল হাতে এক শিশু
 
রাথার জানান, শুরুতে এই পরীক্ষা বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত কৃষি-পরীক্ষা হিসেবেই করা হয়েছিল। কারেওয়া অঞ্চলের জমিতে উচ্চ-ঘনত্বের আপেল গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে কি না এবং একই জমিতে পাশাপাশি জাফরান চাষ করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
 
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালে লাগানো আপেল গাছগুলিও বেশ দ্রুত ও স্বাস্থ্যকরভাবে বেড়ে উঠেছে। তাঁর মতে, চাষের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির দিকে নজর দেওয়া এবং জমির যথাযথ ব্যবস্থাপনার কারণেই এই বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। তবে বাগান পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বৃদ্ধির ধারা বজায় থাকে কি না এবং দুটি ফসলের সহাবস্থান কতটা কার্যকর হয়, তা এখনও দেখার বিষয়।
 
আপেল চাষে সাধারণত বেশি পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়টিও রাথারকে বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। তিনি জানান, প্রয়োজন হলে কীটনাশক স্প্রে আপেল গাছের পাতায় দেওয়া হয়েছে। জাফরান গাছ বা তার মাটিতে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জাফরান গাছের সুপ্তাবস্থায় কন্দগুলি মাটির নিচেই থাকে।
 
তবে বাতাসে কীটনাশক ছড়িয়ে পড়া, জল গড়িয়ে যাওয়া কিংবা মাটির স্থানান্তরের মাধ্যমে জাফরান ফসলে কীটনাশকের সংস্পর্শ ঘটতে পারে। ফসলের নিরাপত্তা সম্পর্কে কোনও বৃহত্তর সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে এই সম্ভাবনাগুলি স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
 
রাথারের কাছে সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম হল অন্য কৃষকদের আগ্রহ। তিনি জানান, তাঁর এক প্রতিবেশী এই পদ্ধতিতে দুই থেকে পাঁচ কানাল জমিতে চাষ শুরু করতে কত খরচ হতে পারে, তা জানতে যোগাযোগ করেছেন।
 
এই আগ্রহ রাথারের আশাকে আরও জোরদার করেছে। তিনি মনে করছেন, তাঁর এই পরীক্ষা অন্য কৃষকদেরও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসন্ধানে উৎসাহিত করতে পারে। সহকৃষকদের উপকার করার এই সম্ভাবনাকে তিনি ‘সদকা-এ-জারিয়া’, অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ, হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
 
নিজের জাফরান ক্ষেতে রাথার
 
তবে এই পরীক্ষা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আপেল গাছ বড় হওয়ার পরও জাফরানের উৎপাদন সন্তোষজনক থাকে কি না, দুটি ফসলের মধ্যে জল ও পুষ্টি নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয় কি না এবং উভয় ফসলের পরিচর্যার অতিরিক্ত খরচের তুলনায় আয় যথেষ্ট হয় কি না, এই বিষয়গুলির উপরই দীর্ঘমেয়াদে পদ্ধতিটির সাফল্য নির্ভর করবে।
 
তা সত্ত্বেও, কাশ্মীরের জাফরান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলির সামনে এই পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে: আপেল বাগানের তরুণ গাছগুলি বড় হয়ে ওঠার সময় তাদের মাঝের জমিতে কি আরও একটি মূল্যবান ফসল ফলানো সম্ভব?
 
আশনুম্বালে রাথার তত্ত্বের পরিবর্তে বাস্তব চাষের মাধ্যমে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন। প্রথমবার ফুল ফোটায় তিনি উৎসাহ পেয়েছেন। তবে পরবর্তী কয়েক মরসুমের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, এই পদ্ধতি বৃহত্তর পরিসরে অনুসরণ করা সম্ভব কি না।


অধিক পঢ়ক