২০০ বছরের পুজো, তবু ফিকে হয়নি সম্প্রীতির জৌলুস! ধান্যকুড়িয়ার জমিদার গাইন-বল্লভ বাড়ির দুর্গোৎসবে আজও মুছে যায় বিভেদের দেওয়াল

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 16 h ago
২০০ বছরের পুজো, তবু ফিকে হয়নি সম্প্রীতির জৌলুস! ধান্যকুড়িয়ার জমিদার গাইন-বল্লভ বাড়ির দুর্গোৎসবে আজও মুছে যায় বিভেদের দেওয়াল
২০০ বছরের পুজো, তবু ফিকে হয়নি সম্প্রীতির জৌলুস! ধান্যকুড়িয়ার জমিদার গাইন-বল্লভ বাড়ির দুর্গোৎসবে আজও মুছে যায় বিভেদের দেওয়াল

তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ

বসিরহাটের ধান্যকুড়িয়ার  সাহু জমিদারবাড়ির পুজো বন্ধ থাকলেও বনেদিয়ানার ঐতিহ্যের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে জমিদার গাইন-বল্লভ পরিবারের প্রজন্ম। প্রাচীন স্থাপত্য, লোককথা, বনেদি আচার আর সম্প্রীতির মেলবন্ধনে দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে ইতিহাসের টানে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বহু মানুষ। সব ধর্মের মানুষ যেন এখানে এসে পুজোর আনন্দে মেতে উঠে ভুলে যান মানুষে মানুষে ভেদাভেদের কথা।
 
কালের নিয়মে কত কিছুই বদলে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্মে আসে পার্থক্য। অবহেলায় ভেঙে পড়ে জমিদারবাড়ির জৌলুস, হারিয়ে যায় পরিবারের পুরনো রীতি। একসময়ের উৎসবমুখর অন্দরমহলও যেন চুপ করে যায়। কিছু কিছু ঐতিহ্য কিন্তু সময়ের কাছে হার মানে না। বরং তা প্রজন্মের হাত ধরে হয়ে ওঠে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার হেরিটেজ গ্রাম ধান্যকুড়িয়ার গাইন-বল্লভ বাড়ির দুর্গোৎসব তেমনই এক উত্তরাধিকার। এখানে এলে বোঝা যাবে, দেবী আরাধনার পাশাপাশি আজও বেঁচে রয়েছে বাংলার বনেদিয়ানা। দেখা যাবে  সম্প্রীতির চিরন্তন ছবিটা। প্রায় দুই শতাব্দীর পেরিয়ে এলেও আজও এই পুজো সমানভাবে জনপ্রিয়।
 
দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে গাইন-বল্লভ বাড়ির প্রাচীন ঠাকুরদালান যেন খুলে দেয় অতীতের দরজাগুলো। পুরনো অট্টালিকার গায়ে জমে থাকা ইতিহাস, কারুকার্যময় স্থাপত্য আর প্রাচীন ভাস্কর্যের সঙ্গে দেবীর আরাধনায় যেন তৈরি হয় এক অন্য রকম আবহ। এখানে পুজো দেখতে আসা মানে বাংলার হারিয়ে যেতে বসা জমিদার পরিবারের এক সংস্কৃতির মুখোমুখি হওয়া।

কথায় বলে, দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ। আর ধান্যকুড়িয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী এলাকায় এলে এই  আবেগের তাৎপর্য যেন আরও বেড়ে যায়। এখানে উৎসবের আনন্দ কোনও একটি পরিবারের চার দেওয়ালে আটকে থাকে না। দুর্গাপুজোর চারদিন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আর দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে গোটা পরিবেশ। সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে একসঙ্গে উৎসব উপভোগ করার মধ্যেই ধরা পড়ে প্রাচীন বাংলার সামাজিক সম্প্রীতির পরিচিত ছবিটা। আর বনেদি বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব এখানেই।
 
এই পুজো মনে করিয়ে দেয় উৎসবের প্রাণ আসলে মানুষের অন্তর আত্মার মধ্যে। পুজোর দিনগুলোতে এই জমিদার বাড়িতে এসে প্রাচীন ঠাকুরদালানে দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে কেউ খুঁজে পান পারিবারিক শিকড়, কেউ ফিরে পান শৈশবের স্মৃতি, আবার কেউ আবিষ্কার করেন বাংলার ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়। আর এই স্মৃতিগুলোই এই পুজোকে একইভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে।
 
শোনা যায়, একসময় বসিরহাটের বর্ধিষ্ণু এলাকা ধান্যকুড়িয়ার একাধিক জমিদারবাড়িতে ঘটা করে দুর্গাপুজোর আয়োজন হতো। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানা কারণে বদল হয়েছে উৎসবের পরিবেশ। বর্তমানে সাহু জমিদারবাড়ির পুজো বন্ধ। সেই প্রেক্ষাপটে ধরে চললে দেখা যাবে সমসাময়িক জমিদার গাইন-বল্লভ বাড়ির দুর্গোৎসবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। স্বর্গীয় মহেন্দ্রনাথ গাইনের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পুজো আজও ধরে রেখেছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক পরম্পরা।
 
নতুন প্রজন্মের মনোজিৎ গাইন এবং সমাজকর্মী ছন্দক বাইন এই ঐতিহ্যবাহী বাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত নানা স্মৃতির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িটির সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রেরও সম্পর্ক রয়েছে। ‘মায়াকুমারী’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’ এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের শেষ ছবি ‘সত্যান্বেষী’-সহ একাধিক ছবির শুটিং হয়েছে এই বাড়িতে। ফলে দুর্গোৎসবের বাইরেও ইতিহাস ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে বাড়িটির আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।
শুধু এতেই আটকে নেই গাইন-বল্লভ বাড়ির ইতিহাস। জড়িয়ে রয়েছে নানা প্রাচীন রীতি ও লোককথা।
 
সন্ধিপুজোর সময় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। প্রাচীনকালে নাকি কামান দাগার প্রচলনের কথাও শোনা যায়। কেন ছুটে আসেন দূরদূরান্তের মানুষ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে চাইলে যেতে হবে এই বনেদি বাড়িগুলোতে। ধান্যকুড়িয়ার প্রাচীন জমিদারবাড়িগুলো অলংকরণে সমৃদ্ধ অট্টালিকা। এই বাড়িগুলোর প্রাচীন ভাস্কর্য ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্র। গাইন গার্ডেন-সহ এখানকার বিভিন্ন স্থাপত্য বাংলার জমিদারি আমলের স্মৃতি বহন করে। দুর্গাপুজোর সময় সেই ঐতিহাসিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয় উৎসবের আবেগ। ফলে পুজোর সময় সবমিলিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হতে এখানে ভিড় জমান দর্শনার্থীরা।
 
অনেকের পেতে চান বাংলার অতীতকে ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা। শহরের আধুনিক পুজোর ভিড় থেকে বেরিয়ে কেউ খোঁজেন পুরনো দিনের গন্ধ, কেউ দেখতে চান জমিদারি আমলের স্থাপত্য, আবার কেউ চান পরিবারের সঙ্গে এক অন্য রকম ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখতে। প্রায় ২০০ বছরের পুজো নানা মানুষের সেই সব আকাঙ্ক্ষাকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। ধান্যকুড়িয়ার গাইন-বল্লভ বাড়ির দুর্গোৎসব সেই পুরোনো দিনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। দুই শতাব্দীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে গাইন-বল্লভ বাড়ির দুর্গোৎসব সম্প্রীতিরও এক মূল্যবান উত্তরাধিকার বলাই যায়। আসল কথা হল, উৎসবের আলো সবচেয়ে উজ্জ্বল হয় তখনই যখন তার আলোয় একসঙ্গে দাঁড়ায় সব ধর্ম বর্নের মানুষ।


শেহতীয়া খবৰ