আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস! প্রথম মুসলিম হিসেবে সেনেটে নির্বাচিত আব্দুল এল-সায়েদ
Story by Munni Begum | Posted by Aparna Das • 10 h ago
আব্দুল এল-সায়েদ
মুন্নি বেগম
আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস রচনা করলেন মিশরীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট নেতা আব্দুল এল-সায়েদ। মিশিগানের গুরুত্বপূর্ণ সেনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে তিনি আমেরিকার সেনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হিসেবে ইতিহাস গড়লেন। তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও তাঁর এই জয় শুধু এল-সায়েদের জন্যই নয়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল শিবিরের কাছেও এক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনে জয়লাভের পর ডেট্রয়েটে নিজের নির্বাচনী সদর দফতরে সমর্থকদের উদ্দেশে এল-সায়েদ বলেন, “মিশিগান, আমরা করে দেখিয়েছি! মিশিগানের মতো একটি মহান রাজ্যের নবনির্বাচিত সেনেটর হিসেবে আজ আপনাদের সামনে দাঁড়াতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করছি।”
তবে শুধু নির্বাচনী জয়ের জন্যই তাঁকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। বিজয়ী ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে উদ্দেশ্য করে তাঁর তীক্ষ্ণ অথচ রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় নিজের নাম, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যে আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন, তার জবাব দিয়েছেন একেবারে ভিন্ন ভঙ্গিতে।
আমেরিকার মিশিগানে অনুষ্ঠিত সেনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতা আব্দুল এল-সায়েদ। এই জয়ের ফলে ৪২ বছর বয়সি এল-সায়েদ আমেরিকার সেনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হিসেবে পরিচিত হয়েছেন।
নির্বাচনে জয়লাভের পর দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে তীব্র কটাক্ষ করেন এল-সায়েদ। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁকে নিয়ে করা মন্তব্যগুলিকেই নিজের বক্তব্যে রসিকতার বিষয় করে তোলেন ডেমোক্র্যাট নেতাটি।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “জেডি, হাবিবি! এখানে একটা মজার বিড়ম্বনা রয়েছে। জানুয়ারিতে সংবিধান অনুযায়ী আপনাকেই আমাকে শপথবাক্য পাঠ করাতে হবে।” উল্লেখ্য, ‘হাবিবি’ আরবি ভাষার একটি স্নেহপূর্ণ সম্বোধন, যার অর্থ ‘প্রিয়’ বা ‘প্রিয় বন্ধু’।
এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে আরও একটি কটাক্ষ করেন এল-সায়েদ। নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প একাধিকবার তাঁর নাম উচ্চারণ করতে অসুবিধা হওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনেই এল-সায়েদ বলেন, “আমি জানি, আমার নাম উচ্চারণ করতে আপনার অসুবিধা হয়। তাই জেডি আমাকে শপথবাক্য পাঠ করানোর পর আপনি আমাকে শুধু ‘সেনেটর’ বলেই ডাকতে পারেন।”
তাঁর এই মন্তব্য বিজয়ী ভাষণে এক বিশেষ মুহূর্তের সৃষ্টি করে। বুধবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মিশিগানের সেনেট নির্বাচনে এল-সায়েদের জয় নিশ্চিত করা হয়। তিনি যে মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন, তিনি একজন প্রাক্তন এফবিআই আধিকারিক এবং সাতবার আমেরিকার কংগ্রেসে নির্বাচিত রাজনীতিবিদ।
এই জয়ের ফলে মিশিগানের সেনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হাতেই থাকল। ডেমোক্র্যাট সেনেটর গ্যারি পিটার্স অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর থেকেই আসনটি ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছিল।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ব্যাপক সাফল্যের মধ্যেই এল-সায়েদ এই ঐতিহাসিক জয় অর্জন করেছেন। এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে সক্ষম হয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। তবে এল-সায়েদের কাছে নির্বাচনী লড়াই মোটেও সহজ ছিল না। প্রচারের শুরু থেকেই তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, বিদেশনীতি সম্পর্কে মতামত এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে সরব হয়েছিলেন রিপাবলিকান নেতারা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এল-সায়েদকে নিশানা করে একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। তিনি এল-সায়েদকে ‘জিহাদি’ বলে অভিহিত করার পাশাপাশি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রসঙ্গ তুলে মিশিগানের ভোটারদের তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান সেনেটর টেড ক্রুজ এল-সায়েদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুড সংগঠনের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এল-সায়েদ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি কখনও ওই সংগঠনের সদস্য ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও হবেন না।
মিশর থেকে আমেরিকায় অভিবাসী হওয়া একটি পরিবারের সন্তান এল-সায়েদ আগে জনস্বাস্থ্য বিভাগে কাজ করেছেন। তিনি ওয়েন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবিক পরিষেবা এবং প্রাক্তন সেনাকর্মী পরিষেবা বিভাগের ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে মিশিগানের রাজনীতিতে একজন উল্লেখযোগ্য প্রগতিশীল নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।
তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলির মধ্যে ছিল সকলের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করা, নির্বাচনে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার আর্থিক প্রভাব কমানো এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। পাশাপাশি বিদেশের যুদ্ধে আমেরিকার অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহারের পক্ষেও মত প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
ইজরায়েলের সামরিক অভিযানে আমেরিকার সমর্থনেরও সমালোচনা করেছিলেন এল-সায়েদ। বিদেশের যুদ্ধের জন্য আমেরিকার আর্থিক সাহায্য বন্ধ করার দাবিও ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয়। উল্লেখ্য, আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন এল-সায়েদ।
সেই প্রাথমিক নির্বাচন ছিল যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। দলের একাংশের প্রভাবশালী নেতাদের বিরোধিতার মুখেও নিজের অবস্থান মজবুত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এল-সায়েদ। তবে সাধারণ নির্বাচনের কয়েক দিন আগে হ্যালি স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানানোয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ মতবিরোধও প্রকাশ্যে চলে আসে।
বিশেষ করে ইজরায়েল সম্পর্কে এল-সায়েদের অবস্থান এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার হাসান পাইকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে দলের অন্দরেই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স এল-সায়েদকে মিশিগানের জন্য অত্যধিক বামপন্থী নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্ত রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত জয়ের হাসি হাসতে সক্ষম হন এল-সায়েদ।
তাঁর এই জয়কে আমেরিকার রাজনীতিতে মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের সময় নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রমণের জবাব বিজয়ী ভাষণে রসিকতার মাধ্যমে দেওয়ায় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছেন এল-সায়েদ।
এদিকে, আব্দুল এল-সায়েদের বিজয়ী ভাষণে করা কটাক্ষের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনও সরাসরি প্রতিক্রিয়া এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তবে নির্বাচনের আগে এল-সায়েদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সরব ছিলেন ট্রাম্প। ৩ নভেম্বর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি অভিযোগ করেছিলেন, এল-সায়েদ ইহুদি, কৃষ্ণাঙ্গ এবং শ্বেতাঙ্গদের ঘৃণা করেন। এমনকী এল-সায়েদকে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদেরও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এর আগে মিশিগানের একটি নির্বাচনী সভায় এল-সায়েদকে ‘জিহাদি’ বলে অভিহিত করার পাশাপাশি তাঁর দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন ট্রাম্প। অবশ্য এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন এল-সায়েদ। এত আক্রমণের মধ্যেও নির্বাচনে জয়লাভ করে ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এখন থেকে তাঁকে শুধু ‘সেনেটর’ বলেই সম্বোধন করতে পারবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।