অনিকা মহেশ্বরী / নয়াদিল্লি
সাহিত্য ও সমাজে যখনই মাতৃত্বের প্রসঙ্গ উঠে আসে, তখনই প্রায়শই এর একটি আদর্শ ও নিখুঁত ছবি তুলে ধরা হয়। কিন্তু লেখিকা, কবি তথা স্বাধীন সাংবাদিক জেহরা নাকভি এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নির্ভীকভাবে নিজের মত প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন, সমাজ মহিলাদের সবকিছুর ঊর্ধ্বে একজন ‘মা’ হিসেবে পরিচিত হতে বাধ্য করে। অথচ তাঁদের প্রথম ও প্রকৃত পরিচয় একজন স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লিঙ্গবৈষম্য, সাহিত্য এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখে আসছেন জেহরা নাকভি। তাঁর লেখনীতে মহিলাদের কেবল কন্যা, স্ত্রী কিংবা মায়ের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁদের সামগ্রিক মানবিক পরিচয়ের নিরিখে বোঝার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
জেহরা নাকভির সৃজনশীল ও শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ জড়িয়ে রয়েছে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU)-এর সঙ্গে। সেখানে সাংবাদিকতায় অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য তিনি চারটি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। তবে আলিগড় তাঁর কাছে কেবল ডিগ্রি অর্জনের কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি ছিল তাঁর চিন্তাভাবনাকে প্রসারিত করার এবং সৃজনশীলতাকে মুক্ত আকাশ দেওয়ার একটি মঞ্চ।
স্কুলজীবন থেকেই কবিতা লিখতেন জেহরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন নাটক, সংগীত ও সৃজনশীল লেখালেখির প্রতিও গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তিনি। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে পাঠ করা তাঁর কবিতা ‘ও আবদুল্লাহ’ আজও তাঁর প্রাথমিক সৃজনশীলতার নিদর্শন হিসেবে স্মরণ করা হয়। উইমেন্স কলেজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি শিক্ষক ও ছাত্রীদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা নয়, বরং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবীকে বোঝার ক্ষমতা গড়ে তোলা।
জেহরা নাকভির লেখার ধরন ও অভ্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, তিনি মাঝরাত থেকে ভোরের প্রথম আলো ফোটা পর্যন্ত লিখতে পছন্দ করেন। একজন মা হিসেবে দিনের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার পর রাতের এই শান্ত সময়টুকুই তাঁকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। সারাদিন মনে আসা ভাবনাগুলি তিনি মোবাইলের নোটপ্যাডে লিখে রাখেন। এরপর যখন লিখতে বসেন, তখন বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে সম্পূর্ণভাবে লেখার মধ্যে ডুবে যান।
তাঁর লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য সত্যের অনুসন্ধান করা এবং কোনও দ্বিধা ছাড়াই তা প্রকাশ করা। তাঁর প্রবন্ধ ও নিবন্ধ ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’, ‘দ্য হিন্দু’, ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’, ‘দ্য ওয়্যার’, ‘আউটলুক’, ‘দ্য কুইন্ট’, ‘ফিনান্সিয়াল ক্রনিকল’, ‘চাইল্ড ম্যাগাজিন’ এবং ‘উইমেনস ওয়েব’-এর মতো স্বনামধন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে।
‘হে হাউস’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বই তথা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘The Reluctant Mother: A Story No One Wants to Tell’ মাতৃত্বের এমন এক দিক তুলে ধরেছে, যা থেকে সমাজ প্রায়শই চোখ ফিরিয়ে রাখতে চায়। বইটি তাঁর জীবনের তিন বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা। সন্তানকে গর্ভে ধারণ করা থেকে শুরু করে মাতৃত্বের প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রার অভিজ্ঞতা এতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এটি এমন এক তরুণীর আত্মকথন, যিনি নিজের নতুন দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত স্বপ্নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যান।
সমাজ একজন মায়ের কাছে সবকিছু ত্যাগ করার প্রত্যাশা করে। কিন্তু জেহরা তুলে ধরেছেন, মাতৃত্বের অনুভূতির সঙ্গে ভালোবাসার পাশাপাশি ক্লান্তি, বিরক্তি, মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা এবং নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার ভয়ও জড়িয়ে থাকে। এই আবেগগুলি অনুভব করার অর্থ কোনও মহিলা খারাপ মা হয়ে গিয়েছেন, এমনটা নয়। কারণ একজন মা-ও শেষ পর্যন্ত একজন মানুষ, যাঁর নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা ও ইচ্ছা রয়েছে।
জেহরা নাকভির স্পষ্ট বক্তব্য, সন্তান জন্মের পর কোনও মহিলার নিজস্ব পৃথিবী শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। বিবাহ, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং মহিলাদের কর্মজীবন নিয়েও তিনি খোলাখুলিভাবে লেখেন। তাঁর মতে, কেরিয়ার কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি আত্মসম্মান ও নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একইভাবে, শিক্ষাকে তিনি কেবল ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। তাঁর কাছে শিক্ষা হল নিজের জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার স্বাধীনতা। সমাজের উন্নয়ন কেবল জিডিপি বা প্রযুক্তির নিরিখে মূল্যায়ন না করে লিঙ্গসমতা ও সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে তা বিচার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জেহরা নাকভি
তাঁর এই সামাজিক দায়বদ্ধতা ও উৎকৃষ্ট লেখনীর জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছেন জেহরা নাকভি। ২০২০ ও ২০২১ সালের জন্য তাঁকে ‘I.N.S.P.I.R.E Writer of the Year’ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। এ ছাড়াও, উত্তরপ্রদেশের ১০০ জন সর্বাধিক অনুপ্রেরণাদায়ী মুসলিম মহিলার RBTC তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। রাজ্যের সফল মহিলাদের নিয়ে রাজ্যসভা টিভির তৈরি একটি তথ্যচিত্রেও তিনি স্থান পেয়েছিলেন।
জেহরা নাকভির জীবন ও লেখনী সমাজের বিবেকের সামনে একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে, আমরা কি সত্যিই মহিলাদের তাঁদের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে বাঁচতে দিতে প্রস্তুত? সেই পরিচয়, যা তাঁরা নিজেদের শব্দ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেরাই গড়ে তোলেন।