মালদা হাবিবপুর ব্লকের বুলবুল চন্ডী অঞ্চলের কেন্দ্রীয় গ্রামের কালী পুজো করেন এক মুসলিম মহিলা!

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 7 h ago
মালদা হাবিবপুর ব্লকের বুলবুল চন্ডী অঞ্চলের কেন্দ্রীয় গ্রামের কালী পুজো করেন এক মুসলিম মহিলা!
মালদা হাবিবপুর ব্লকের বুলবুল চন্ডী অঞ্চলের কেন্দ্রীয় গ্রামের কালী পুজো করেন এক মুসলিম মহিলা!
 
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী

মালদার হবিবপুর ব্লকের বুলবুলচণ্ডী অঞ্চলের কেন্দুয়া গ্রামে এক মুসলিম মহিলার হাত ধরে শুরু হওয়া চার দশকের প্রাচীন এক কালীপুজো আজ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে। এই পুজোটি এলাকাবাসীর কাছে ‘শেফালী কালী’ নামে পরিচিত এবং জনপ্রিয়।
 
আজ থেকে প্রায় ৪ দশকের বেশি সময় আগে এই পুজোর সূচনা করেন শেফালী বেওয়া (শেফালী দেবী) নামে এক মুসলিম মহিলা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চার দশক আগে ৪৫ বছর বয়সে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং দীর্ঘ চিকিৎসার পরেও কিছুতেই তিনি সুস্থ হচ্ছিলেন না। সেই সময় তিনি স্বপ্নে মা কালীর দেখা পান এবং দেবী তাঁকে তাঁর আরাধনা করার নির্দেশ দেন। এই কথা তিনি গ্রামবাসীকে জানান। প্রথমে গ্রামবাসীরাও হাসি ঠাট্টার ছলে উড়িয়ে দেন। একজন মুসলিম সম্প্রদায়ের মহিলা, কালী পুজো করবে তা কি হয়! এই কথা ছড়িয়ে পড়তেই সমালোচনা শুরু হয় সারা গ্রামজুড়ে। এ নিয়ে নানা বিদ্রুপ করা হয় তাকে। 
 
৪২ ফুট উঁচু  কালীপুজোর প্রতিমা
 
কিন্তু শেফালী দেবী অবিচল। সব সমালোচনাকে পেছনে ফেলে মায়ের নির্দেশ মেনে তিনি নিজের বাড়িতেই পুজোর আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এবং হলোও তাই। নিজের বাড়িতে নানা আড়ম্বরের মধ্যে দিয়ে মা কালির মূর্তি পুজো করার সব ব্যবস্থা করলেন। 
 
এখানকার প্রতিমা দক্ষিণা কালী। উচ্চতা প্রায় ৪২ ফুট, যা সমগ্র মালদা জেলা তথা উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ প্রতিমা হিসেবে পরিচিত। প্রতিবার কালীপুজো মন্দিরের ভেতরেই হয়। প্রতিবছর এই পর্বত প্রমাণ মূর্তিটি তৈরি করা হয়। 
 
তবে মুশকিলটা হল মুসলিম পরিবারের মানুষ হওয়ার কারণে সনাতন ধর্মের পুজো-অর্চনার নিয়ম-নীতি প্রথম দিকে তাঁর জানা ছিল না। তবে ভক্তি ও নিষ্ঠার জোরে ধীরে ধীরে তিনি সমস্ত নিয়ম আয়ত্ত করে নেন। মায়ের আরাধনা করার পর থেকে শেফালী দেবী  ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। শেফালী দেবী সুস্থ হওয়ার খবরটা শুনে গ্রামের চারিদিকে হইচই পড়ে যায়। তখন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকেই শেফালী দেবীর সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য ছুটে আসেন।
 
যারা অসুস্থ তারা শেফালী দেবীর কাছে জানতে চান কি করলে তারা সুস্থ হয়ে উঠবেন। এইসব ব্যাপার-স্যাপার দেখে শেফালী দেবী ও অবাক হয়ে যান। অসুস্থদের কি বলবেন তা তিনি নিজেই ভেবে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি বলতেন আমার মা কালীকে মনের প্রানে ডাকো। সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি অসুস্থ রোগীদের মায়ের ফুল ও চন্দমিত্ত দিতেন। 
 
তবে বর্তমানে বয়সের কারণে এবং বিধবা হয়ে যাওয়ার জন্য পূজোর আয়োজকের সব কাজ ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। এখন তিনি ধর্মীয় আচার মেনে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ না করলেও পুজোর প্রধান উদ্যোক্তা ও নির্দেশক হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছেন। হিন্দু পুরোহিতের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে মহা আড়ম্ভরে পুজো করেন দীপাবলীর দিনে।
 
মালদহে বিখ্যাত বুলবুল চন্ডি মায়ের মন্দির
 
কিন্তু বুলবুল চন্ডী কালীপুজোর প্রতিমা বিসর্জন একদিন পরে হয় না। কারণ এখানে মায়ের প্রতিমা দু' সপ্তাহ ধরে মন্দিরে রেখে দেয়া হয়। কারণ এই দীর্ঘ সময় মন্দির চত্বরে মেলা বসে। দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে মিলিত হন।  মুসলিম মহিলা এখানে পুজো করেন বলে এই পুজোর আকর্ষণ বেশি। হিন্দু মুসলিম দুই ধর্মের মানুষই এখানে মিলিত হয়ে থাকেন পুজো ক'টা দিন। ১৫ দিন পরেই শেফালী কালীর প্রতিমা পাশের পুকুরে নিরঞ্জন করা হয়।
 
বর্তমান যুগে যখন ধর্মের নামে নানা রেষারেষি চলছে তখন মালদার এই প্রত্যন্ত গ্রামের পুজাটি এক অন্য বার্তা দেয়। পুজোর দিনটা এলেই দুই ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শেফালী দেবীর পুজোতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন দুই ধর্মের মানুষের মিলন এক অন্যরূপ নেয় মালদার বুলবুল চন্ডী অঞ্চল। 
 
বাসিন্দাদের কথায়-আমাদের কাছে শেফালী দেবী কেবল একজন মানুষ নন, তিনি দুটি ধর্মের মধ্যকার মেলবন্ধনের সেতু। এখানে মা কালী সবার।


শেহতীয়া খবৰ