কেন মুসলিম সমাজের উচিত নিজেদের অগ্রাধিকার ও অর্থব্যয়ের ধরন নতুন করে ভাবা?

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 8 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
  মোহাম্মদ ফাহাদ

“মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তারাই, যারা অন্যের সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে।”, বহুল প্রচলিত একটি নববী বাণী।ইসলামি জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ হল দান-খয়রাত। জাকাত, সদকা, ওয়াকফ এবং ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য মানুষের সাহায্যের মধ্য দিয়ে এই দানের সংস্কৃতি বহমান। অথচ দানের এই গভীর ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও ভারতের মুসলিম সমাজ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, উদ্যোগপতি তৈরি, মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং উচ্চশিক্ষায় প্রতিনিধিত্ব, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই পিছিয়ে পড়ার ছবি স্পষ্ট।
 
প্রতি রমজানে গোটা ভারতজুড়ে হাজার হাজার কোটি টাকা দান-খয়রাতের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। মসজিদে সহজেই অনুদান সংগ্রহ হয়, ধর্মীয় উদ্দেশ্যে আবেদন জানালে দ্রুত সাড়া মেলে এবং কোনও বিপর্যয় ঘটলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ প্রায়শই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন সবার আগে। এই বৈপরীত্য নিয়ে সৎভাবে আত্মসমীক্ষা করা জরুরি।
 
প্রতীকী ছবি
 
সমস্যা এই নয় যে মুসলিমরা কম দান করেন। বরং সমস্যাটি হল, দাতব্য খাতে ব্যয় হওয়া অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সমাজ গঠনের পরিবর্তে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় হচ্ছে। ক্রমশ দেখা যাচ্ছে, বারবার স্বেচ্ছামূলক তীর্থযাত্রা, যেখানে পর্যাপ্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই রয়েছে সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, জাঁকজমকপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ব্যয়ে বিপুল অর্থ খরচ করা হচ্ছে। অথচ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বৃত্তি, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন উদ্যোগের জন্য বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
 
এটি ইসলাম বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে কোনও যুক্তি নয়। একইভাবে, আন্তরিকতার সঙ্গে যাঁরা ওমরাহ পালন করেন কিংবা মসজিদ-মাদ্রাসায় অনুদান দেন, তাঁদেরও সমালোচনা করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং এটি ইসলামের সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং জনকল্যাণকে ধর্মীয় উপাসনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হত।
 
দানে সমৃদ্ধ, কিন্তু প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে
 
২০০৬ সালে প্রকাশিত সাচার কমিটির রিপোর্টে ভারতের মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছিল। রিপোর্টে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা, সরকারি চাকরি, ব্যাঙ্কিং পরিষেবার সুযোগ এবং সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মসংস্থানে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
 
পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে এবং পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্যেও কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে। তবে জাতীয় গড়ের তুলনায় শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান এখনও রয়ে গিয়েছে।
 
উত্তর ভারতের বহু মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ঘুরে দেখলে প্রায়ই চোখে পড়ে, অল্প দূরত্বের মধ্যেই একাধিক মসজিদ, একই এলাকার মানুষের জন্য একাধিক মাদ্রাসা এবং আরও ধর্মীয় পরিকাঠামো তৈরির জন্য নিয়মিত অনুদান সংগ্রহের অভিযান চলছে। অথচ সেই একই এলাকায় হয়তো একটি মানসম্পন্ন ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, গণগ্রন্থাগার, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিং সেন্টার, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান কিংবা ভালো পরিকাঠামোযুক্ত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব রয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতা উপেক্ষা করা কঠিন। তাই প্রশ্ন উঠছে, নিজেদের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলি কি আমরা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পেরেছি?
 
বারবার ওমরাহ পালনের প্রবণতা
 
গত দুই দশকে আয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াত সহজ হওয়ার ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত মুসলিমদের কাছে ওমরাহ পালন ক্রমশ সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। যিনি কখনও পবিত্র শহরগুলিতে যাননি, তাঁর ওমরাহ পালনের ইচ্ছা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও বোধগম্য। এটি নিঃসন্দেহে গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক অভিজ্ঞতা।
 
তবে এর পাশাপাশি নীরবে আরেকটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল বহু মুসলিম এখন বারবার ওমরাহ পালন করছেন, প্রতি রমজানে, কয়েক বছর অন্তর কিংবা একই বছরে একাধিকবার। সামাজিক মাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মক্কা ও মদিনা থেকে তোলা ছবি অনেক সময় ধর্মীয় মর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার প্রতীক হয়ে উঠছে।
 
প্রতীকী ছবি
 
বর্তমানে ভারত থেকে একটি সাধারণ ওমরাহ প্যাকেজের খরচ জনপ্রতি কয়েক লক্ষ টাকা হতে পারে। চার সদস্যের একটি পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যয় সহজেই প্রায় ১০ লক্ষ টাকায় পৌঁছে যেতে পারে।
 
এই যাত্রাগুলির আন্তরিকতা নিয়ে কারও প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কিন্তু অন্য একটি প্রশ্ন অবশ্যই করা যায়, কেউ যদি নিজের চতুর্থ বা পঞ্চমবারের স্বেচ্ছামূলক ওমরাহ যাত্রা স্থগিত রেখে সেই অর্থে পাঁচজন মেধাবী ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছাত্রছাত্রীর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন, তাহলে কি আল্লাহ তাঁর প্রতি কম সন্তুষ্ট হবেন? একজন দাতার জীবদ্দশার বাইরেও কি সেই সিদ্ধান্তের নৈতিক প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছাবে না?
 
ইসলাম বাধ্যতামূলক ও স্বেচ্ছামূলক ইবাদতের মধ্যে পার্থক্য করে। বাধ্যতামূলক কর্তব্যগুলি পূরণ করার পর সমাজের জন্য কোন কাজটি সবচেয়ে বেশি উপকারী, তা বিবেচনা করতে বারবার উৎসাহিত করা হয়েছে। সমসাময়িক বহু ইসলামি পণ্ডিতের মতে, যেখানে জরুরি সামাজিক প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা কিংবা অসহায় মানুষের দুর্দশা লাঘবে সাহায্য করা বারবার স্বেচ্ছামূলক তীর্থযাত্রা করার তুলনায় বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।
 
আরও মাদ্রাসা, নাকি উন্নত মানের স্কুল?
 
ভুল অগ্রাধিকারের বিষয়টি সম্ভবত শিক্ষাক্ষেত্রের চেয়ে আর কোথাও এত স্পষ্ট নয়। ঐতিহাসিকভাবে মাদ্রাসাগুলি ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেছে এবং এখনও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের হাজার হাজার শিশুকে তারা শিক্ষার সুযোগ করে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক মাদ্রাসা তাদের পাঠ্যক্রমও সম্প্রসারিত করেছে।
 
উদ্বেগের বিষয় মাদ্রাসার অস্তিত্ব নয়। বরং সমস্যাটি হল, আরও একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করাকেই সব সময় শিক্ষাক্ষেত্রের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন বলে ধরে নেওয়া। বহু জেলায় নতুন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির জন্য অনুদান সংগ্রহ সফলভাবে সম্পন্ন হয়। অথচ তার কাছাকাছি সরকারি স্কুলগুলিতে দুর্বল পরিকাঠামো, শিক্ষকের অভাব এবং বিজ্ঞান শিক্ষার সীমিত সুযোগের সমস্যা রয়ে যায়।
 
একবার ভাবুন, এই অনুদানের সামান্য অংশও যদি বিজ্ঞান গবেষণাগার, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার কোচিং, নার্সিং কলেজ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোডিং কেন্দ্র, গবেষণা ফেলোশিপের মতো উদ্যোগে ব্যয় করা হয়, তাহলে এক প্রজন্মের মধ্যেই মুসলিম সমাজের শিক্ষার চিত্র বদলে যেতে পারে।
 
পবিত্র কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ বাণী ছিল ‘ইকরা’, যার অর্থ পড়ো বা পাঠ করো। এটি কেবল সাক্ষরতার আহ্বান ছিল না, বরং পৃথিবীকে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বোঝারও এক আহ্বান ছিল।

একসময় মুসলিম সভ্যতা গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, দার্শনিক, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজ্ঞ, ভাষাবিদ এবং ইতিহাসবিদ তৈরি করেছিল। এই সাফল্য সম্ভব হয়েছিল জ্ঞানচর্চায় দাতব্য অর্থ বিনিয়োগের কারণে, শুধু ধর্মীয় শিক্ষায় নয়, মানবজ্ঞান ও অনুসন্ধানের প্রতিটি শাখায়।
 
ওয়াকফের হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা
 
বিশ্বের বৃহত্তম ওয়াকফ সম্পত্তির ভান্ডারগুলির মধ্যে অন্যতম রয়েছে ভারতে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন ওয়াকফ বোর্ড সম্মিলিতভাবে কয়েক লক্ষ সম্পত্তি পরিচালনা করে। কাগজে-কলমে এই সম্পত্তিগুলির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিপুল। কিন্তু বাস্তবে বহু সম্পত্তি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না কিংবা দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতায় আটকে রয়েছে।
 
একবার ভাবুন, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানগুলি যদি নিয়মিত আয় করতে পারত এবং সেই অর্থ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, স্বল্পমূল্যের আবাসন, অনাথ শিশুদের পরিচর্যা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিষেবা ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করা যেত, তাহলে কত বড় পরিবর্তন সম্ভব হত! এই রূপান্তরের জন্য ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সভ্যতাগত অবদান, জনকল্যাণে নিবেদিত দাতব্য সম্পত্তি বা ওয়াকফ ব্যবস্থাকে নতুন করে কার্যকর করে তোলা প্রয়োজন।
 
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানগুলির অর্থে হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, সরাইখানা, অনাথ আশ্রম, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং জনসাধারণের জন্য খাবারের কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। প্রশ্ন এই নয় যে এই ব্যবস্থা কার্যকর কি না। ইতিহাস ইতিমধ্যেই তার উত্তর দিয়ে দিয়েছে।
 
প্রতীকী ছবি
 
স্যার সৈয়দ আহমদ খানের শিক্ষা
 
সম্ভবত ভারতের মুসলিম সমাজে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের চেয়ে এই বিষয়টি ভালোভাবে আর কেউ উপলব্ধি করতে পারেননি। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর যখন মুসলিম অভিজাত সমাজের একটি বড় অংশ আধুনিক শিক্ষার প্রতি সন্দিহান ছিল, তখন স্যার সৈয়দ যুক্তি দিয়েছিলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান, ইংরেজি শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ছাড়া মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিকই থেকে যাবে।
 
তাঁর প্রচেষ্টার ফলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুহাম্মদান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ, যা পরবর্তীকালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে (AMU) পরিণত হয়। তাঁর সেই সময়ের বিরোধিতার ছবির সঙ্গে বর্তমান সময়ের পরিস্থিতির আশ্চর্য মিল রয়েছে। তখন অনেকেই মনে করতেন, পাশ্চাত্য শিক্ষা বিপজ্জনক। অন্যদের ধারণা ছিল, শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই যথেষ্ট। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলেছে।
 
আলিগড় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে অসংখ্য প্রশাসক, আইনজীবী, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, লেখক, কূটনীতিক এবং বুদ্ধিজীবী তৈরি হয়েছেন, যাঁরা আধুনিক ভারত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
 
বিয়ে ও ধর্মীয় আড়ম্বরের প্রতিযোগিতা
 
এই আলোচনা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক দাতব্য কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বহু মুসলিম সমাজে বিয়ে এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ব্যাঙ্কোয়েট হল, ডিজাইনার পোশাক, চোখধাঁধানো সাজসজ্জা, বিলাসবহুল খাবার, ফটোগ্রাফি, গয়না এবং সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের জন্য পরিবারগুলি কয়েক দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ করছে। অথচ ইসলামি শিক্ষা বারবার বিবাহে সরলতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
 
বিয়ের প্রত্যাশা ও খরচ এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে বহু যুবক আর্থিক কারণে বিয়ে পিছিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, বাবা-মায়েরা এক সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের জন্য তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ করে ফেলছেন।
 
একবার ভাবুন, এই বিপুল বিয়ের খরচের মাত্র ২০ শতাংশও যদি নবদম্পতির উচ্চশিক্ষা কিংবা নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে তা বিবাহের প্রকৃত চেতনা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ, উভয়কেই সম্মান জানাবে। ইসলামের প্রাথমিক যুগের সভ্যতা মহান হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বেশি ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের কারণে নয়, বরং এমন সব জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কারণে, যেগুলি গোটা বিশ্বকে আলোকিত করেছিল।
 
গুরুতর চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিপুল সম্ভাবনা
 
ভারতের মুসলিম সমাজের সামনে গুরুতর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে এই সমাজের মধ্যে দাতব্য কাজের বিপুল সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রতি বছর জাকাত, সদকা, ওয়াকফের আয় এবং ব্যক্তিগত অনুদানের মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ প্রবাহিত হয়, তা এই সমাজের অন্যতম বড় অথচ এখনও পুরোপুরি কাজে না লাগানো সম্পদ।
 
এই সম্পদের সামান্য অংশও যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির কাজে ব্যয় করা যায়, তাহলে এক প্রজন্মের মধ্যেই মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া সম্ভব।
 
হয়তো পরবর্তীবার কোনও অনুদানের চেক লেখার আগে প্রত্যেক দাতার নিজেকে শুধু এই প্রশ্নটি করা উচিত নয় যে, ‘এর মাধ্যমে কি আমি সওয়াব অর্জন করব?’ বরং আরও একটি প্রশ্ন করা জরুরি, ‘এর মাধ্যমে কি কারও জীবন বদলে যাবে?’
 
উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে সেই দান শুধু আধ্যাত্মিক পুণ্যই অর্জন করবে না, বরং একটি সমাজকে বদলে দেওয়ার শক্তিও বহন করবে। সেটিও ইবাদত।
 
(লেখক জয়পুরের একজন প্রবীণ সাংবাদিক।)


শেহতীয়া খবৰ