এক বন্ধুর হাসিতে আলোকিত দীপাবলি! ধর্মের সীমানা পেরিয়ে জামিয়া মিলিয়ায় দুই বন্ধুর এক অনন্য উৎসব উদযাপন

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 11 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
আশহার আলম 

কিছু উৎসব বিশেষ হয়ে ওঠে সেই মানুষগুলির জন্য, যাঁরা আমাদের আপনজনের মতো অনুভব করান। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ছাত্রজীবনে এমনই এক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছিলাম আমি। বন্ধু বালমুকুন্দ ঠাকুরের সঙ্গে দীপাবলি উদযাপনের সেই মুহূর্ত আজও আমার জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি হয়ে রয়েছে।
 
স্নাতক স্তরে পড়াশোনার সময় আমার অনেক সহপাঠী ছিল। কিন্তু বালমুকুন্দের সঙ্গে, যাকে আমি স্নেহ করে মুকুন্দ বলে ডাকতাম, আমার বন্ধুত্ব ছিল একটু অন্যরকম। আমাদের মধ্যে ছিল এক বিশেষ বন্ধন। ক্লাসের পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসঙ্গে সময় কাটত। দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয় থেকে শুরু করে সমাজ, সংস্কৃতি এবং জীবন নিয়ে কত আলোচনা যে করতাম! কিছু বিষয়ে আমাদের মতপার্থক্যও ছিল। কিন্তু সেই মতের অমিল কখনও আমাদের বন্ধুত্বে দূরত্ব তৈরি করেনি। বরং এই বন্ধুত্ব আমাকে শিখিয়েছিল, মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেই যে দূরত্ব তৈরি হবে, এমনটা নয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
২০১৯ সালে দীপাবলি আসন্ন। সেই সময় এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল মুকুন্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি ছিল অল্প দিনের। ফলে বাড়ি ফিরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। দিল্লিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। অন্যদিকে, অধিকাংশ পড়ুয়া যখন পরিবারের সঙ্গে উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন মুকুন্দের সামনে ছিল প্রিয়জনদের ছেড়ে দূরে একা দীপাবলি কাটানোর বাস্তবতা।
 
এক সন্ধ্যায় ওর ঘরে দেখা করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, কোনও একটা বিষয় ওকে ভাবিয়ে তুলেছে। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর ওর মন খারাপের কারণ জানতে চাইলাম। আমার দিকে তাকিয়ে মুকুন্দ বলল, “বন্ধু, এবার আমাকে একাই দীপাবলি উদযাপন করতে হবে।”
 
কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর এক মুহূর্ত দেরি না করে বললাম, “একা কেন? আমি তো আছি। তোমার সঙ্গে আমিও দীপাবলি উদযাপন করব।”
 
আমার কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে ওর মুখে হাসি ফুটে উঠল। এক মিনিট আগেও যে বিষণ্ণতা ওর মুখে ছাপ ফেলেছিল, তা যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে ও বলল, “বন্ধু, তোমার এই কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলাম। জানি, আমার পাশে আমার বন্ধু রয়েছে।”
 
ওর কথাগুলো আমাকে উপলব্ধি করিয়েছিল, কখনও কখনও কাউকে দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহারটি হল নিজের উপস্থিতি। আমি শুধু একটি ছোট্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কিন্তু মুকুন্দের কাছে তার অর্থ ছিল অনেক বড়, এবার তাকে আর একা উৎসব কাটাতে হবে না।
 
আমরা একসঙ্গে দীপাবলি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিলাম এবং কাছের বাজারে চলে গেলাম। সেখান থেকে কিনলাম প্রদীপ, সাজসজ্জার সামগ্রী, মিষ্টি এবং পুজোর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সাধারণ একটি সন্ধ্যা ক্রমশ এমন এক উৎসবের প্রস্তুতিতে পরিণত হল, যা দুই বন্ধুর সম্পর্ককে আরও গভীর করে তুলেছিল।
 
প্রতীকী ছবি
 
পরদিন সন্ধ্যায় তৈরি হয়ে মুকুন্দের ঘরে গেলাম। আমরা দুজনে মিলে প্রদীপ জ্বালালাম এবং একসঙ্গে পুজোয় অংশ নিলাম। প্রদীপের মৃদু আলো, উৎসবের পরিবেশ আর একসঙ্গে থাকার নিখাদ আনন্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘরটিই যেন আমাদের আপন ঘর হয়ে উঠেছিল।
 
প্রার্থনা শেষ হওয়ার পর আমরা মিষ্টি ভাগ করে খেলাম এবং একে অপরকে উৎসবের শুভেচ্ছা জানালাম। সেখানে কোনও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ছিল না, ছিল না বিশাল কোনও উদযাপন। কিন্তু সেই সন্ধ্যার আনন্দ ছিল অর্থ দিয়ে কেনা যায় এমন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। উদযাপন শেষ হওয়ার আগে আমরা প্রার্থনা করেছিলাম, আমাদের বন্ধুত্বের প্রদীপ যেন এভাবেই জ্বলতে থাকে এবং প্রতি বছর আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
 
আজ পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই সন্ধ্যা নিছক একটি উৎসব উদযাপনের চেয়েও অনেক বড় কিছুর প্রতীক ছিল। দীপাবলি হিন্দুধর্মের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি উৎসব। অন্ধকারের উপর আলোর জয় এবং অশুভের উপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক এই উৎসব। তবে এর মধ্যে নিহিত আশা, উষ্ণতা, সহমর্মিতা এবং একাত্মতার বার্তা বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষের হৃদয়কেও স্পর্শ করতে পারে।
 
মুকুন্দের সঙ্গে আমার দীপাবলি উদযাপনের উদ্দেশ্য কখনও একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ হওয়া ছিল না। বরং তার বিশ্বাসকে সম্মান জানানো, তার আনন্দের অংশীদার হওয়া এবং যে দিনটি তার কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই দিনে তাকে একাকিত্ব অনুভব করতে না দেওয়াই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। আমাদের বন্ধুত্ব ধর্মীয় কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পার্থক্য দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। বরং তা গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক ভালোবাসা, স্নেহ এবং বোঝাপড়ার উপর ভিত্তি করে।
 
ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয় দেশের বিভিন্ন উৎসব, ভাষা, খাবার এবং ঐতিহ্যের মধ্যে। কিন্তু এই বৈচিত্র্যের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হয়তো দেখা যায় সেই সাধারণ মুহূর্তগুলিতে, যখন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এমন ছোট ছোট উদ্যোগ হয়তো সংবাদ শিরোনামে জায়গা পায় না, কিন্তু নিঃশব্দে সমাজের বন্ধনকে আরও মজবুত করে তোলে।
 
প্রতীকী ছবি
 
সেই দীপাবলির পর বহু বছর কেটে গিয়েছে। কিন্তু সেই স্মৃতি আজও ছোট ছোট মাটির প্রদীপের আলোর মতোই উজ্জ্বল। সেদিনের প্রতিটি কথোপকথন হয়তো আমার মনে নেই, কিন্তু মুকুন্দের মুখে ফুটে ওঠা সেই আনন্দের হাসি কোনও দিন ভুলব না। যখন সে বুঝতে পেরেছিল, এবার তাকে আর একা দীপাবলি কাটাতে হবে না, সেই মুহূর্তের আনন্দ আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।
 
সেদিন আমরা কয়েকটি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেই প্রদীপের উষ্ণতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘরের চার দেওয়ালের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, উৎসব তখনই সত্যিকারের সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। আর বন্ধুত্বও একটি প্রদীপের মতো, যা জীবনের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ কোণেও আলোর সন্ধান দিতে পারে। কিছু প্রদীপ আলোকিত করে ঘর, আর কিছু বন্ধুত্ব আলো ছড়ায় হৃদয়ে।


শেহতীয়া খবৰ