অরিগামির কাগজের নৌকায় বিশ্বরেকর্ড! শ্রীনগরের রুতবা শওকতের সাফল্যে গর্বিত কাশ্মীর

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 13 h ago
রুতবা শওকত
রুতবা শওকত
 
ওনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি 

কাশ্মীরের মেয়েরা আজ পরিশ্রম, প্রতিভা এবং অদম্য আত্মবিশ্বাসের জোরে একের পর এক সাফল্যের ইতিহাস লিখছেন। খেলাধুলা, শিল্প, শিক্ষা কিংবা ব্যবসা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন। সেই তালিকায় নতুন করে উজ্জ্বল হয়েছে শ্রীনগরের রুতবা শওকতের নাম। অরিগামি বা কাগজ ভাঁজ করে শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে এক ঘণ্টায় ২৫০টি কাগজের নৌকা তৈরি করে তিনি গড়েছেন অনন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড, যা শুধু তাঁর পরিবার নয়, সমগ্র কাশ্মীরের জন্য গর্বের মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।

রুতবা মাত্র এক ঘণ্টায় ২৫০টি অরিগামি কাগজের নৌকা তৈরি করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। এই অসাধারণ কৃতিত্বের মাধ্যমে তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
 
শ্রীনগরের বাসিন্দা রুতবা শওকত ইতিমধ্যেই জাতীয় স্তরের একজন মার্শাল আর্টস খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত। খেলাধুলায় তাঁর সাফল্যও অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। প্রায় এক দশক ধরে তিনি মার্শাল আর্টসে সক্রিয় এবং একাধিক রাজ্য ও জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি প্রায় ৬০টি পদক জিতেছেন, যার মধ্যে রয়েছে একটি স্বর্ণপদক। তাঁর ঘরের দেওয়াল ও তাক আজও ট্রফি ও পদকে ভরে রয়েছে, যা তাঁর নিষ্ঠা ও সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে। তবে রুতবার প্রতিভা শুধু খেলাধুলায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ক্যালিগ্রাফি ও চিত্রকলাতেও সমান দক্ষ, আর এই সৃজনশীলতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিশ্বরেকর্ডের পথে এগিয়ে দেয়।
 
রুতবা শওকত
 
তাঁর শিল্পযাত্রার সূচনা হয়েছিল আসলে কোভিড-১৯ মহামারির সময়। তখন দেশের অন্যান্য প্রান্তের মতো কাশ্মীরেও ক্রীড়া একাডেমিগুলি বন্ধ ছিল এবং অনুশীলনের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। সময় নষ্ট না করে রুতবা নিজের জীবনকে নতুন দিকে পরিচালিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি চিত্রকলার দিকে মনোনিবেশ করেন এবং ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং আঁকা শুরু করেন। ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতাকে আরও শাণিত করেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ তাঁর নাম 'ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস'-এ নথিভুক্ত হয়। সেটাই তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে।
 
রুতবার কথায়, সেই সময় থেকেই তিনি আরও বড় কিছু করার কথা ভাবতে শুরু করেন। তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন এবং মানুষ কীভাবে বিশ্বরেকর্ড গড়ে তা জানার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে তিনি বিস্তর গবেষণাও করেন। এই অনুসন্ধানের সময়ই তাঁর পরিচয় হয় অরিগামি শিল্পের সঙ্গে। অরিগামি হল জাপানের একটি শিল্প, যেখানে কাগজ ভাঁজ করে বিভিন্ন আকৃতি তৈরি করা হয়। রুতবার আগে থেকেই এই শিল্প সম্পর্কে কিছুটা ধারণা ছিল এবং এর প্রতি তাঁর আগ্রহও ছিল।
 
যখন তিনি জানতে পারেন যে কেউ এক ঘণ্টায় ১৫০টি কাগজের নৌকা তৈরি করে একটি রেকর্ড গড়েছেন, তখন তিনিও সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বিশ্বরেকর্ড গড়ার যাত্রা। তিনি নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন এবং হাতের গতি ও কৌশল উন্নত করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। রুতবা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের জন্য আবেদন করেন এবং চ্যালেঞ্জে অংশ নেন। কিন্তু প্রথম দুইবার তিনি সফল হতে পারেননি।
 
ব্যর্থতা যে কাউকেই নিরুৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু রুতবা হাল ছাড়েননি। তিনি নিজের ভুলত্রুটিগুলি বিশ্লেষণ করেন, আরও কঠোর পরিশ্রম করেন এবং তৃতীয়বার আবার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের প্রস্তুতির বিষয়টি তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গোপন রেখেছিলেন, কারণ সাফল্য অর্জনের পর পরিবারের সদস্যদের চমকে দিতে চেয়েছিলেন। টানা তিন বছরের অনুশীলন ও নিষ্ঠার পর অবশেষে সেই দিন আসে, যখন তাঁর স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়।
 
রুতবা শওকত
 
তৃতীয় প্রচেষ্টায় রুতবা এক ঘণ্টায় ২৫০টি কাগজের নৌকা তৈরি করে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন। অর্থাৎ, তিনি গড়ে প্রতি ১৫ সেকেন্ডে একটি করে নৌকা তৈরি করেছেন, যা প্রতি মিনিটে প্রায় চারটি নৌকার সমান। পুরো এক ঘণ্টা ধরে এই গতি ও নিখুঁততা বজায় রাখা ছিল অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু তিনি সফলভাবে সেই চ্যালেঞ্জ পূরণ করেন।
 
এই কৃতিত্বের পর তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের আনুষ্ঠানিক শংসাপত্রও লাভ করেন। সেই শংসাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রুতবা শওকত গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের প্রচেষ্টায় অংশ নিয়ে এক ঘণ্টায় সর্বাধিক অরিগামি কাগজের নৌকা তৈরির বিশ্বরেকর্ড স্থাপন করেছেন। এই রেকর্ডটি জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে অর্জিত হয়েছে।
 
নিজের আনন্দ প্রকাশ করে রুতবা জানান, গত তিন বছর ধরে তিনি এই রেকর্ডের জন্য আবেদন করে আসছিলেন এবং প্রথম দুইবার ব্যর্থ হলেও কখনও আশা হারাননি। তাঁর বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম কখনও বিফলে যায় না। তিনি তাঁর বাবা-মাকেও কৃতিত্ব দিয়েছেন, যাঁরা সবসময় খেলাধুলা ও শিল্প, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁকে সমর্থন ও উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শুধু তাঁর নয়, তাঁর সমগ্র পরিবারের জন্যও গর্বের মুহূর্ত।
 
তবে এই যাত্রাপথে তাঁকে সমালোচনারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেকেই তাঁকে বলেছিলেন, তিনি সময় নষ্ট করছেন এবং এসব করে কোনও লাভ হবে না। কিন্তু রুতবা এসব মন্তব্যে বিচলিত হননি। তিনি নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে গিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত আত্মবিশ্বাস ও নিষ্ঠার জোরে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম নথিভুক্ত করেছেন।
 
রুতবার বিশ্বাস, মেয়েদের নিজেদের স্বপ্ন পূরণের জন্য অবশ্যই এগিয়ে আসা উচিত। সমাজ বা পরিবারের নানা চাপের কারণে অনেক সময় মেয়েরা সামনে এগোতে দ্বিধাবোধ করে। কিন্তু তাঁর মতে, আত্মনির্ভর হয়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, শুরুটা ছোট হতে পারে, কিন্তু দৃঢ় সংকল্প থাকলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
 
রুতবা শওকত
 
একজন ক্রীড়াবিদ ও শিল্পী হিসেবে রুতবা জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখার উপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, খেলাধুলা শরীরকে শক্তিশালী করে, আর শিল্প মনকে শান্তি ও সতেজতা দেয়। এই ভারসাম্যই তাঁকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা জোগায়।
 
আজ রুতবা শওকতের গল্প কাশ্মীরের অসংখ্য মেয়ের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে, যারা নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও নিষ্ঠা থাকলে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিই একজন মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারে না। কোভিডের কঠিন সময়কে তিনি সুযোগে পরিণত করেছিলেন, আর সেই সময়ে অর্জিত দক্ষতাই তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্বরেকর্ড।
 
রুতবার এই সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং কাশ্মীরের যুবসমাজ, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা, স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্ন পূরণ করার অধিকার সবারই রয়েছে। তাঁর জীবনগাথা সত্যিই প্রমাণ করে, "যেখানে ইচ্ছাশক্তি, সেখানেই সাফল্যের পথ।"


শেহতীয়া খবৰ