বিদুষী গৌর / নয়াদিল্লি
শিল্প যখন কেবল সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, বরং স্মৃতি, অনুভূতি ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে, তখন একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের ভাবনার জগৎকে নতুন করে নাড়া দেন। সেই বিরল শিল্পীদেরই একজন বারান ইজলাল, যাঁর প্রতিটি ক্যানভাস যেন নীরব আবেগের এক গভীর অনুবাদ।
যে শহরে রঙিন স্বপ্নের বদলে মানুষ অভ্যস্ত ছিল ধূসর বাস্তবতায়, সেখানেই এক শীতের শান্ত সকালে জন্ম নিয়েছিলেন বারান ইজলাল। শহরের বাড়িগুলো ছিল বিবর্ণ ধূসর রঙে ঢাকা, ধুলোমাখা রাস্তাগুলো নিস্তব্ধ, আর আকাশেও যেন স্থায়ীভাবে লেগে ছিল দ্বিধার ছায়া। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করত শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রামে, কল্পনার শক্তিতে নয়। কিন্তু তখনও কেউ জানত না, এই শিশুটি নিজের অন্তরে বহন করে এনেছে রঙের এক অদম্য ঝড়, যা একদিন শিল্পের ভাষাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
শৈশবে সে খুব কম কথা বলত। বাড়ির উঠোনের দেয়ালের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আঙুল দিয়ে অদৃশ্য সব আকৃতি আঁকতে দেখে তার মা প্রায়ই চিন্তায় পড়ে যেতেন। পাঁচ বছর বয়সে একদিন চুলার পাশে পড়ে থাকা ভাঙা কাঠকয়লার একটি টুকরো খুঁজে পায় সে। সেদিন থেকেই সেই দেয়ালের রূপ বদলাতে শুরু করে।
শুরুর দিকে আঁকাগুলো ছিল অনিশ্চিত, বাঁকা রেখা, অসমান বৃত্ত। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেয়াল যেন প্রাণ ফিরে পেল। অস্বাভাবিক বড় ডানাওয়ালা পাখি, ফিসফিসের মতো বাঁক নেওয়া নদী, আর এমন সব মুখ, যেগুলো যেন শ্বাস নিচ্ছে। এক সন্ধ্যায় তার মা দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে সব দেখছিলেন। বিস্ময়ের কারণ শুধু ছবিগুলো নয়, বরং সেগুলোর ভেতরে জড়িয়ে থাকা আবেগ, আনন্দ, বিষাদ, আকাঙ্ক্ষা, সবকিছু যেন একসূত্রে গাঁথা।
“এসব তুমি কোথায় দেখেছ?” ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি। বারান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল, “ওগুলো তো আগেই ছিল। আমি শুধু ওগুলোকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছি।”
স্কুলজীবন ছিল তার জন্য কঠিন। শিক্ষকরা অভিযোগ করতেন, পড়াশোনায় মন না দিয়ে সে খাতার প্রান্তে সারাক্ষণ ছবি আঁকত। সংখ্যা তাকে বিরক্ত করত, শব্দ তার কাছে ভারী মনে হতো, কিন্তু ছবি যেন অনায়াসে তার হাত দিয়ে বেরিয়ে আসত। সহপাঠীরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে বলত, “ও অন্য এক জগতে বাস করে।” আর সত্যিই তাই ছিল।
বারো বছর বয়সে সে প্রথম একটি স্থানীয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। বিষয় ছিল ‘বাড়ি’। অধিকাংশ শিশু সুন্দর ছাদওয়ালা বাড়ি আর হাসিখুশি পরিবারের ছবি এঁকেছিল। কিন্তু বারান এঁকেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য, একটি ভেঙে পড়া বাড়ি, যার দেয়াল আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী মানুষ, যার হাতে ধরা একটি লণ্ঠন সূর্যের থেকেও উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। বিচারকেরা ছবিটি বুঝতে পারেননি। কেউ কেউ সেটিকে অস্বস্তিকর বলেও মনে করেছিলেন।
বারান ইজলালের একটি শিল্পকর্ম
তবে দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত এক প্রবীণ ব্যক্তি ছবিটির গভীরতা বুঝেছিলেন। ফলাফল ঘোষণার পর, অবশ্যই বারান কোনো পুরস্কার পায়নি, সেই বৃদ্ধ তার কাছে এসে অনেকক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বললেন, “তুমি যা দেখো, তা আঁকো না। তুমি আঁকো সেই অনুভূতিগুলোকে, যেগুলো মুক্তি পেতে চায়।” এই একটি বাক্য বহু বছর ধরে বারানের মনে গেঁথে ছিল।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পৃথিবীও বিস্তৃত হতে থাকে, তবে মানুষ যেমনটা ভেবেছিল, তেমনভাবে নয়। সে কখনও প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা বা দামী আর্ট গ্যালারির পেছনে ছোটেনি। বরং পরিত্যক্ত বাড়ি, জনাকীর্ণ বাজার, নির্জন নদীতীর ঘুরে বেড়িয়েছে, জীবনের ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য টুকরোকে নিজের ভেতরে ধারণ করেছে। প্রতিটি মুখ, দেয়ালের প্রতিটি ফাটল, আলোয়ের প্রতিটি ঝলক তার অন্তর্লোকের ক্যানভাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
ধীরে ধীরে সে নতুন নতুন উপকরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে, মরচে, ছাই, ভাঙা কাচ, এমনকি ফেলে দেওয়া কাপড়ও। তার কাছে শিল্প কখনও শুধু তুলি আর রঙের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিল্প ছিল পুনর্জন্মের এক প্রক্রিয়া, যা ভুলে যাওয়া হয়েছে, তাকে নতুন অর্থ দিয়ে আবার জীবন্ত করে তোলা।
বিশের কোঠায় পৌঁছতেই তাকে নিয়ে চারদিকে আলোচনা শুরু হয়। মানুষ বলতে থাকে, এমন এক তরুণ শিল্পী, যার কাজের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, কেউ যেন আপনাকে সত্যিই দেখছে, যদিও আপনি নিজেই তা না চাইতে পারেন। তার শিল্পকর্ম শুধু দেয়াল সাজাত না, বরং সেই দেয়ালকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিত।
তার সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলোর একটি ছিল ‘Echoes of Silence’ (ইকোজ অব সাইলেন্স) নামে একটি সিরিজ। সেখানে ছিল স্তরের পর স্তর রঙে আঁকা মুখহীন মানুষ, যেন তারা ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দর্শকেরা প্রায়ই ছবিগুলোর সামনে অস্বস্তি অনুভব করতেন, কিন্তু চোখ সরিয়ে নিতে পারতেন না।
একটি ছোট প্রদর্শনীতে এক দর্শক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনার ছবিতে কোনো মুখ নেই কেন?” বারানের উত্তর ছিল, “কারণ আমরা নিজেদের একটি মুখ আছে, এই ভান করতেই খুব বেশি সময় নষ্ট করি।”
এত পরিচিতি পাওয়ার পরও খ্যাতির ধারণা থেকে সে নিজেকে দূরেই রেখেছিল। গ্যালারি, সংগ্রাহক, এমনকি আন্তর্জাতিক কিউরেটরদের কাছ থেকেও আমন্ত্রণ এসেছিল, কিন্তু সে খুব অল্প কয়েকটিই গ্রহণ করেছিল। তার বিশ্বাস ছিল, অতিরিক্ত নিয়ম-কাঠামো তার সহজাত শিল্পসত্তাকে দমিয়ে দেবে।
বারানের কাছে শিল্প কখনও পেশা ছিল না। এটি ছিল বেঁচে থাকার উপায়। তবে একটি মুহূর্ত এসেছিল, যা তার শিল্পকে নয়, বরং বিশ্ব কীভাবে তাকে দেখবে, সেটিকেই বদলে দিয়েছিল। শহরের এক অবহেলিত এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু বাড়িঘর পুড়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বারান একটি অর্ধেক পুড়ে যাওয়া দরজা খুঁজে পান। ফেটে যাওয়া, কালচে সেই দরজাটি তিনি নিজের কর্মশালায় নিয়ে আসেন এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে সেটির ওপর কাজ করেন।
যখন তিনি সেই শিল্পকর্মটি উন্মোচন করেন, উপস্থিত সবাই স্তম্ভিত হয়ে যান। পোড়া কাঠটি রূপ নেয় এক হৃদয়স্পর্শী শিল্পরচনায়, দগ্ধ চিহ্নের মধ্যে খোদাই করা এক শিশুর অবয়ব, যার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে উজ্জ্বল, প্রায় বিস্ফোরক রঙের টুকরো। সেই শিল্পকর্মে একই সঙ্গে ধ্বংস আর আশা, হারিয়ে যাওয়া আর প্রতিরোধ, সবই যেন একসঙ্গে ধরা দিয়েছিল।
মানুষ শুধু সেটি দেখেনি, তারা সেটি অনুভব করেছিল। এরপর সেই শিল্পকর্ম শহর থেকে শহরে, দেশ থেকে দেশে ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গে বহন করে নিয়ে যায় এমন এক শহরের গল্প, যে শহর একসময় রঙহীন ছিল। আর সেই শিল্পকর্মের সঙ্গেই বারান ইজলালের নামও ছড়িয়ে পড়তে থাকে তার নীরব শহরের অনেক দূর পর্যন্ত।
বারান ইজলালের একটি শিল্পকর্ম
তবুও যদি কেউ আজ তার কাছে যায়, তবে সেই একই মানুষকেই দেখতে পাবে, মেঝেতে পা গুটিয়ে বসে আছেন, চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে নানা উপকরণ, আর তিনি সম্পূর্ণ ডুবে আছেন সৃষ্টির আনন্দে। তিনি এখনও খুব কম কথা বলেন, কিন্তু তার চোখে আজও সেই একই অস্থির সৃজনশীলতার দীপ্তি।
একবার এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি কি মনে করেন, আপনার শিল্প পৃথিবীকে বদলে দেয়?” বারান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বলেছিলেন, “না। তবে হয়তো মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, তারা পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।”
শেষ পর্যন্ত বারান ইজলাল শুধু একজন শিল্পী নন। তিনি এমন এক অনুবাদক, যিনি শব্দে প্রকাশ করা যায় না এমন আবেগ, আর উচ্চারণ করতে ভয় লাগে এমন গল্পকে রঙের ভাষায় প্রকাশ করেন। তিনি কখনও কাউকে মুগ্ধ করতে বা কিছু ব্যাখ্যা করতে ছবি আঁকেননি। তিনি আঁকেন, কারণ তার ভেতরের কিছু কখনও নীরব থাকতে চায় না।
আর এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে মানুষ প্রায়ই সত্যের চেয়ে স্বস্তিকেই বেশি বেছে নেয়, সেখানে বারান ইজলালের শিল্প নিঃশব্দ এক প্রতিবাদ হয়ে রয়ে গেছে, প্রতিটি তুলির আঁচড়ে।