ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: বাংলার শিক্ষাবিদ থেকে জাতীয় রাজনীতির আদর্শপুরুষ, আজও কেন প্রাসঙ্গিক তাঁর দর্শন?

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 12 h ago
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
 
কলকাতা

ভারতীয় রাজনীতিতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের প্রভাব তাঁদের মৃত্যুর বহু দশক পর আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। একজন শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ, প্রশাসক, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয় থাকলেও, আজকের ভারতীয় রাজনীতিতে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয় ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। বর্তমান শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নিজেদের আদর্শিক ভিত্তির অন্যতম নির্মাতা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একাধিকবার তাঁকে "জাতীয় ঐক্যের অন্যতম স্থপতি" বলে উল্লেখ করেছেন।
 
১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর পিতা ছিলেন কিংবদন্তি শিক্ষাবিদ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, যিনি "বাংলার বাঘ" নামে পরিচিত। প্রেসিডেন্সি কলেজে কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা শেষে তিনি আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন লন্ডনের লিংকনস ইন-এ।
 
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
 
মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তাঁর আমলেই বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি, ভারতীয় ভাষায় গবেষণা এবং বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অনেক গবেষকের মতে, স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার আধুনিকীকরণে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 
রাজনীতির পাশাপাশি তাঁর মানবিক দিকও ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। ১৯৪২ সালে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম দুরারোগ্য অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে এবং আর্থিক সংকটে পড়লে বাংলার তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর চিকিৎসা ও পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেন।
 
শুধু সরকারি সহায়তাই নয়, নিজের উদ্যোগে নজরুলকে মধুপুরে বিশ্রামের ব্যবস্থাও করে দেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। নজরুলের লেখা একাধিক চিঠিতে শ্যামাপ্রসাদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার প্রকাশ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য সত্ত্বেও এই মানবিক সম্পর্ক আজও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
 
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
 
স্বাধীনতার পরে জওহরলাল নেহরুর প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন শ্যামাপ্রসাদ। কিন্তু ১৯৫০ সালে নেহরু-লিয়াকত চুক্তি নিয়ে মতভেদের জেরে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপরই তিনি বিকল্প জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি গড়ার উদ্যোগ নেন।
 
১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জনসংঘ। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, শক্তিশালী কেন্দ্র, একক নাগরিক পরিচয় এবং জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ একীকরণের পক্ষে তিনি ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালান। তাঁর উচ্চারিত স্লোগান, "এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধানমন্ত্রী, দুই নিশান চলবে না", পরবর্তী কয়েক দশক ধরে জনসংঘ এবং পরে বিজেপির অন্যতম রাজনৈতিক মূলমন্ত্রে পরিণত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে বিজেপি শ্যামাপ্রসাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন হিসেবেই ব্যাখ্যা করে। ১৯৫৩ সালে পারমিট ব্যবস্থা অমান্য করে জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। শ্রীনগরে আটক অবস্থায় অসুস্থ হয়ে ২৩ জুন ১৯৫৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
 
তাঁর মৃত্যুর পরপরই মা যোগমায়া দেবী নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তোলেন। তবে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার কোনও বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়নি। সরকারি ব্যাখ্যা ছিল, অসুস্থতার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে জনসংঘ এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গবেষক ও রাজনৈতিক মহল তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারি তদন্তের অভাবে বিষয়টি আজও ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
ভারতীয় জনসংঘ থেকেই পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থান। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দর্শন নতুন করে আলোচনায় আসে। এক দেশ, এক সংবিধান, জাতীয় নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র, এই বিষয়গুলিতে তাঁর ভাবনার সঙ্গে বর্তমান শাসক দলের নীতির মিল খুঁজে পান বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
 
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একাধিকবার বলেছেন, "ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতের ঐক্য ও অখণ্ডতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।" বিজেপি প্রতি বছর তাঁর জন্মজয়ন্তী ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে এবং তাঁর আদর্শকে দলের নীতিগত ভিত্তির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরে।
ঐতিহাসিকদের মতে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানকে সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, দক্ষ প্রশাসক, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা এবং জাতীয় রাজনীতির প্রভাবশালী সংগঠক। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিহাসে বিতর্কও রয়েছে।
 
তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ধারার বিকাশে এবং বর্তমান জাতীয় রাজনীতির আদর্শিক কাঠামো গঠনে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রভাব আজও গভীরভাবে অনুভূত হয়।