ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্ক আরও মজবুত করতে ৬ জুলাই জাকার্তা সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদি, এরপর অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
আওয়াজ দ্য ভয়েস / বাংলা
ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে আরও শক্তিশালী করতে তিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি প্রাবোও সুবিয়ান্তো-র আমন্ত্রণে ৬ থেকে ৮ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত তিনি ইন্দোনেশিয়া সফর করবেন।বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দুই বৃহৎ গণতন্ত্রের পারস্পরিক সহযোগিতা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার, পারস্পরিক সম্মান, বহুত্ববাদ এবং উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্য, এই চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর পথে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন সফর সেই যাত্রায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এরপর ৮ থেকে ১০ জুলাই অস্ট্রেলিয়া এবং ১০ থেকে ১১ জুলাই নিউজিল্যান্ড সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী।
এটি হবে প্রধানমন্ত্রী মোদির চতুর্থ ইন্দোনেশিয়া সফর এবং ২০১৮ সালে ভারত-ইন্দোনেশিয়া Comprehensive Strategic Partnership প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর। ভারত ও ইন্দোনেশিয়া উভয়ই ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ মালাক্কা প্রণালী ইন্দোনেশিয়ার পাশ দিয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এই কারণে দুই দেশ সমুদ্র নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, জলদস্যুতা প্রতিরোধ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং নৌ-সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যৌথ মহড়া, সামুদ্রিক নজরদারি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এবারের সফরেও প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সহযোগিতা অন্যতম আলোচ্য বিষয় হতে পারে।এই সফরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জাকার্তায় রাষ্ট্রপতি প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন। পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা, অবাধ নৌ-চলাচল, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে।
সফরের অন্যতম আকর্ষণ হবে ইন্দোনেশিয়ার ইয়োগ্যাকার্তায় অবস্থিত ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট প্রামবানান মন্দির পরিদর্শন। নবম শতকে নির্মিত এই হিন্দু মন্দির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপত্য, যেখানে রামায়ণ ও ভারতীয় সভ্যতার অসাধারণ নিদর্শন আজও সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর শুধু কূটনৈতিক নয়, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাস প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যের যুগ থেকে। ভারতীয় ব্যবসায়ী, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও হিন্দু পণ্ডিতদের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছায়।আজও তার প্রভাব দেখা যায়, বালির হিন্দু সংস্কৃতিতে রামায়ণ ও মহাভারতের নৃত্যনাট্যে, ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক ‘গরুড়’-এGaruda Indonesia বিমান সংস্থার নামে সংস্কৃত উৎসের বহু ইন্দোনেশীয় শব্দে জাতীয় মূলমন্ত্র "Bhinneka Tunggal Ika"-তে।
ভারত বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে পাম অয়েল, কয়লা, খনিজ, ওষুধ, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক দ্রব্য, আইটি পরিষেবা এবং কৃষিপণ্যের বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain), গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সবুজ জ্বালানি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে আগামী দিনে সহযোগিতা আরও বাড়বে।
ভারত ও ইন্দোনেশিয়া ভারত মহাসাগর ও মালাক্কা প্রণালীর নিরাপত্তায় ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। নিয়মিত নৌ-মহড়া, সামুদ্রিক নজরদারি, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জাকার্তায় সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতীয় প্রবাসীদের এক বৃহৎ সমাবেশে ভাষণ দেবেন। ইন্দোনেশিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়কে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা হয়।
ইন্দোনেশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী মোদি মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ-এর সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া India-Australia CEOs Forum-এ অংশ নিয়ে দুই দেশের শীর্ষ শিল্পপতিদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন এবং ভারতীয় প্রবাসীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করবেন।
এরপর তিনি নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড সফরে যাবেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রায় ৪০ বছর পর কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এটি প্রথম সরকারি নিউজিল্যান্ড সফর। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা এবং বিনিয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফর ভারতের Act East Policy, Indo-Pacific Vision এবং Global South-এর সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে। একই সঙ্গে ASEAN অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত উপস্থিতি, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ নতুন মাত্রা পাবে।
দুই হাজার বছরের সভ্যতার বন্ধনের উপর দাঁড়িয়ে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া আজ আধুনিক বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সফর সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করার পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে কূটনৈতিক মহলের আশা।