ওনিকা মহেশ্বরী / নয়া দিল্লি
শিল্প যখন শুধু বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে সমাজ পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হয়, তখন জন্ম নেয় রানি খানমের মতো শিল্পীর। ব্যক্তিগত সংগ্রাম, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে একসূত্রে গেঁথে তিনি কথককে দিয়েছেন এক নতুন অর্থ ও নতুন পরিচয়। রক্ষণশীল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা রানি খানমের কাছে নাচ-গান ছিল সমাজের চোখে অগ্রহণযোগ্য এক স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিয়ে তিনি আজ বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত কথক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বিহারের গোপালগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া তাঁর পথচলা ছিল সামাজিক বাধা, আত্মসংগ্রাম এবং অদম্য আত্মবিশ্বাসে ভরা। কথকের ওপর অসাধারণ দক্ষতার পাশাপাশি তিনি এই শাস্ত্রীয় নৃত্যকলার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের ক্ষমতায়নের কাজ করে চলেছেন। তাঁর নৃত্য পরিবেশনায় বারবার উঠে এসেছে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা। এছাড়া ইসলামী আয়াত ও সুফি সাধকদের কবিতার ভিত্তিতে কথক নৃত্যরচনা করা একমাত্র ভারতীয় মুসলিম শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী হিসেবেও তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
রানি খানমের বিদেশে নৃত্য পরিবেশনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত
নিজের নৃত্যদল নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং আলজেরিয়াসহ একাধিক দেশে পরিবেশনা করেছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আমাদ পারফর্মিং আর্টস সেন্টার, যা বর্তমানে ভারতের অন্যতম শীর্ষ পারফর্মিং আর্টস প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে আমাদ নারী অধিকার, লিঙ্গসমতা, এইচআইভি/এইডস সচেতনতা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয় নিয়ে অসংখ্য প্রযোজনা উপস্থাপন করেছে।
এই কেন্দ্রটি ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং সঙ্গীত নাটক আকাদেমি দ্বারা স্বীকৃত। পাশাপাশি এটি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (ICCR)-এর তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজলভ্য শিল্পশিক্ষার প্রসারে এই কেন্দ্রটি ভারতের জাতীয় কথক প্রতিষ্ঠান কথক কেন্দ্র-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে।
রানি খানমের যাত্রা শুরু হয় বিহারের গোপালগঞ্জে। ছোটবেলাতেই তিনি কথকের প্রেমে পড়েন। বহু বছর ধরে পরিবারের অজান্তে নিজের ঘুঙুর, হারমোনিয়াম ও তবলা লুকিয়ে রেখে গোপনে অনুশীলন চালিয়ে গেছেন। যখন পরিবার তাঁর বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করে, তখন তিনি প্রথার পথে না হেঁটে নিজের স্বপ্নকে বেছে নেন। যদিও পরিবার তাঁকে সরাসরি বাধা দেয়নি, কিন্তু সামাজিক প্রত্যাশা এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
নতুন দিল্লিতে ভারত মণ্ডপমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিজের দলের সঙ্গে রানি খানম
মুজফ্ফরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি তৃতীয় শ্রেণিতে দিল্লিতে চলে আসেন, যেখানে অল্প বয়সেই তাঁর সঙ্গীত ও নৃত্য প্রতিভা প্রকাশ পেতে শুরু করে। ১৯৭৮ সালে তিনি ওয়াতান খান সাহেবের কাছে কথকের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন। পরে তিনি রেবা বিদ্যার্থী এবং কিংবদন্তি পণ্ডিত বিরজু মহারাজের কাছে শিক্ষালাভ করেন। গুরু-শিষ্য পরম্পরার প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা আজও তাঁর শিল্পসাধনার অন্যতম ভিত্তি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রানি খানম একজন কোরিওগ্রাফার এবং নৃত্যশিল্পী হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তা গড়ে তুলেছেন এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। আমাদের মাধ্যমে তাঁর কাজ ইতিমধ্যেই পরিবেশনা, কর্মশালা, উৎসব এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছে।
আমাদ সব ধরনের সক্ষমতার যুবকদের পেশাদার নৃত্য ও সঙ্গীত শিক্ষা প্রদান করে। এদের মধ্যে অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের সন্তান, যারা বৃত্তির মাধ্যমে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পান। এই কেন্দ্রটি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিল্পী, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে সুফি ভাবনার নৃত্যব্যাখ্যা, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিল্পীদের পরিবেশনা এবং মুসলিম নারীদের অধিকারের পক্ষে নির্মিত নৃত্যপ্রযোজনা। এইসব প্রযোজনা বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে প্রদর্শিত হয়েছে।
তাঁর সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয় মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশটির রাজা, রানি এবং প্রধানমন্ত্রী। লন্ডনে তিনি সালাম ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক আর্টস ফেস্টিভ্যাল-এ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সুফি শিল্পী ও সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি নমস্তে ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়ার এশিয়া ট্র্যাডিশনাল সং অ্যান্ড ডান্স ফেস্টিভ্যাল, নেদারল্যান্ডসের ট্রপিক্যাল ডান্স ফেস্টিভ্যাল এবং নিউ ইয়র্কের ইরেজিং বর্ডার্স-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে অংশ নিয়েছেন। তাঁর নৃত্যদল কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছে।
ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও অন্যান্য কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে রানি খানম
রানি খানম তুরস্ক, কায়রো, বসনিয়া এবং মরক্কোর সুফি সংগীতশিল্পীদের সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করেছেন। সুফিবাদ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি অত্যন্ত ব্যক্তিগত। তাঁর মতে, এটি সনাতন ধর্মের মতোই এক পবিত্র অন্তর্মুখী জীবনপথ। যদিও তিনি কথকের মধ্যে ইসলামী দর্শনকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তবুও তিনি "সুফি কথক" শব্দবন্ধটি মেনে নেন না। তাঁর বিশ্বাস, সুফিবাদ কোনো নৃত্যশৈলী নয়, বরং আত্মার প্রকাশ। এই ভাবনাগুলিকে কথকের সঙ্গে একত্রিত করে তিনি এমন এক নতুন অভিব্যক্তির ভাষা গড়ে তুলেছেন, যা ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে তার সীমানাকেও প্রসারিত করেছে।
তাঁর পরিবার চিশতি সুফি তরিকার অনুসারী। সুফি আসর, কাওয়ালি এবং সামা মহফিলের অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর কোরিওগ্রাফি ধ্যানমগ্ন, যেখানে নৃত্য ও ছন্দের মাধ্যমে আত্মার যাত্রা এবং পরম সত্তার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরা হয়। বছরের পর বছর ধরে তাঁর কাজ সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যপালদেরও প্রশংসা অর্জন করেছে।
তিনি ঐতিহ্যবাহী, সমকালীন এবং সামাজিক বিষয়ভিত্তিক ২০০-রও বেশি নৃত্যরচনা করেছেন। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সমালোচকদের মতে, তিনি তাঁর প্রজন্মের অন্যতম উদ্ভাবনী কথক শিল্পী। তাঁকে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (ICCR)-এর আউটস্ট্যান্ডিং ক্যাটাগরি-তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং দিল্লি দূরদর্শন তাঁকে টপ গ্রেড শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
রানি খানম
রানি খানম বহু মর্যাদাপূর্ণ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে উইমেন অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২২, ন্যাশনাল ইউনিটি অ্যাওয়ার্ড ২০১৭, ল'অরিয়াল ফেমিনা উইমেন অ্যাওয়ার্ড ২০১৪ এবং ন্যাশনাল উইমেন এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১২। ২০২৬ সালে নাই দুনিয়া ফাউন্ডেশন আয়োজিত মিডিয়া ফর ইউনিটি অ্যাওয়ার্ডস-এও তিনি সম্মানিত হন, যা তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন।
সমাজে ঐক্য ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁর সামাজিক কাজ এবং অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান প্রদান করা হয়। ২০০৬ সালে তিনি নিউ ইয়র্কের এশিয়ান কালচারাল কাউন্সিল থেকে ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যান্ড ইসলাম ফেলোশিপ লাভ করেন। এছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রকের সিনিয়র ফেলোশিপ এবং ১৯৯১ সালে ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন আউটস্ট্যান্ডিং কথক ড্যান্সার অ্যাওয়ার্ড-এও তিনি সম্মানিত হন।
রানি খানমের কাছে কথক শুধু একটি পরিবেশনামূলক শিল্প নয়, এটি এক আধ্যাত্মিক সাধনা। তাঁর শিল্প অন্তরের ভক্তিকে প্রকাশ করে এবং আত্মা ও পরম সত্তার চিরন্তন নৃত্যের রূপকে ফুটিয়ে তোলে। তাঁর নৃত্যের মাধ্যমে তিনি শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা, আধ্যাত্মিক গভীরতা ও শিল্পগত নবতর উদ্ভাবন, এবং ভারতের বহুমাত্রিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন। তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার শুধু তাঁর মনোমুগ্ধকর নৃত্যভঙ্গিতে নয়, বরং এই বিশ্বাসে যে শিল্প সব বাধা অতিক্রম করতে পারে, প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এবং অন্তর্ভুক্তি, সচেতনতা ও জাতীয় ঐক্যের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।