বিশ্বমঞ্চে ভারতের সোনালি শিল্পদূত: নবাব জাহান বেগম

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
নবাব জাহান বেগম
নবাব জাহান বেগম
 
আশহার আলম

সমকালীন শিল্পের জগৎ যখন প্রতিনিয়ত নতুনত্বের সন্ধানে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ঐতিহ্য, আভিজাত্য এবং অভিনব শিল্পকৌশলের অনন্য সমন্বয়ে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছেন নবাব জাহান বেগম। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই শিল্পী, যাঁর শিকড় রাজপরিবারে, ভারতীয় এবং বৈশ্বিক শিল্পজগতে এক স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করেছেন। তাঁর শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, চিত্রকর্মে আসল ২৪ ক্যারেট সোনার ব্যবহার, যা প্রচলিত শিল্পভাষাকে এক অনন্য রাজকীয় ও ঐতিহাসিক মাত্রা দিয়েছে।

তাঁর যাত্রা কেবল শিল্পে নতুনত্ব আনার গল্প নয়; এটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আত্মপরিচয় এবং বিশ্বদরবারে ভারতকে তুলে ধরার এক অদম্য সংকল্পের কাহিনি। তিনি বহুবার বলেছেন, "আমি বিশ্বের প্রতিটি দেশে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।" এই বক্তব্যই প্রমাণ করে, তাঁর কাছে শিল্প কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়, বরং সংস্কৃতিকে সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে দেওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
 
নবাব জাহান বেগম
 
ভোপালের রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করা নবাব জাহান বেগমের মাতৃসূত্রের শিকড় মহারাষ্ট্রের নাসিকের এক জাগীরদার পরিবারে। ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক প্রভাবের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটে। ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীলতার প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল এবং ছবি আঁকাকেই তিনি আত্মপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহই পেশাদার শিল্পচর্চায় রূপ নেয়, যা তাঁকে প্রচলিত শিল্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে দেয়।
 
তাঁর স্বাক্ষরধর্মী শিল্পশৈলী সহজেই আলাদা করে চেনা যায়। তিনি মূলত বিমূর্ত (অ্যাবস্ট্রাক্ট) এবং আধুনিক শিল্পধারায় কাজ করেন এবং প্রচলিত তুলি (ব্রাশ)-এর পরিবর্তে প্রায়ই প্যালেট নাইফ ব্যবহার করেন। তবে তাঁর শিল্পকে সবচেয়ে অনন্য করে তুলেছে চিত্রকর্মে আসল সোনার ব্যবহার, যা প্রতিটি শিল্পকর্মে রাজকীয় সৌন্দর্যের ছাপ এনে দেয়। এই অভিনব প্রয়াস তাঁকে শুধু ভারতে নয়, আন্তর্জাতিক শিল্পমঞ্চেও বিশেষ স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। মূল্যবান ধাতুকে ফাইন আর্টে সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করা সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
 
একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে নবাব জাহান বেগম
 
তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল, তিনি প্রথম শিল্পী হিসেবে মধ্যপ্রদেশের ঐতিহ্যবাহী গন্ড (Gond) শিল্পে আসল ২৪ ক্যারেট সোনার ব্যবহার করেন। আদিবাসী ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতির সঙ্গে বিলাসবহুল উপাদানের এই অভিনব মেলবন্ধন তাঁকে ব্যাপক প্রশংসা এনে দেয় এবং সাংস্কৃতিক শিকড়কে সম্মান জানিয়েও শিল্পের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবার সাহসী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
 
তাঁর শিল্পকর্ম বিশ্বের একাধিক মর্যাদাপূর্ণ প্রদর্শনী এবং স্থানে স্থান পেয়েছে। আবুধাবির ফেরারি ওয়ার্ল্ড তাঁকে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। এছাড়াও তাঁর চিত্রকর্ম ভোপাল বিমানবন্দর এবং মুম্বইয়ের সিমরোজা আর্ট গ্যালারি-তে প্রদর্শিত হয়েছে। ভোপালের তাজ লেকফ্রন্ট-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির জন্যও তিনি কমিশনভিত্তিক শিল্পকর্ম নির্মাণ করেছেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, তাঁর শিল্পকর্ম ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, মালদ্বীপ এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ একাধিক দেশে প্রদর্শিত হয়েছে এবং সংগ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে।
 
শুধু অভিনব কৌশল নয়, নবাব জাহান বেগমের শিল্পে রয়েছে গভীর ভাবনার প্রকাশ। তাঁর বহুল আলোচিত শিল্পকর্মগুলির মধ্যে রয়েছে ফেরারি-অনুপ্রাণিত একটি চিত্র, যা আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে। এছাড়া 'দ্য গোল্ড মাইন' (The Gold Mine) শীর্ষক একটি বিমূর্ত শিল্পকর্ম তাঁকে বিশ্বরেকর্ড এনে দেয়। এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন, জ্ঞানই প্রকৃত সম্পদ, আর সেই ভাবনাকেই তিনি সোনার প্রতীকের মাধ্যমে শিল্পে রূপ দিয়েছেন।
 
একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে নবাব জাহান বেগম
 
প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে তাঁর আঁকা তিরঙ্গা-ভিত্তিক একটি চিত্রকর্মও ব্যাপক সাড়া ফেলে। সেই শিল্পকর্মে ভারতের ১২টি ভাষায় লেখা ছিল "জয় হিন্দ", যা দেশের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের প্রতীক হিসেবে ধরা পড়ে। এই শিল্পকর্ম সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং জাতীয় চেতনার সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগকে আরও সুদৃঢ়ভাবে তুলে ধরে।
 
চিত্রকলার পাশাপাশি নবাব জাহান বেগম ক্যালিগ্রাফিতেও সমান দক্ষ। তিনি ২০টিরও বেশি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি করেন। আরবি ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি ভারতের ঐতিহ্যবাহী মন্দনা শিল্পেও তিনি সমান পারদর্শী। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি আধুনিক প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে উপস্থাপন করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
 
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি যোদ্ধা অ্যাওয়ার্ড, নারী শক্তি অ্যাওয়ার্ড, উইম্যান অব সাবস্ট্যান্স অ্যাওয়ার্ড এবং প্রাইড অব মধ্যপ্রদেশ-সহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এই পুরস্কারগুলি শুধু তাঁর শিল্পীসত্তার স্বীকৃতিই নয়, বরং একজন সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও প্রতিফলন।
 
একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে নবাব জাহান বেগম
 
এত সাফল্যের পরও নবাব জাহান বেগম তাঁর বৃহত্তর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি বহুবার জানিয়েছেন, প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করতে চান। তাঁর কাছে শিল্প শুধু পেশা নয়, বরং ইতিবাচক পরিবর্তন এবং অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
 
আজও নবাব জাহান বেগম সমকালীন ভারতীয় শিল্পের সীমানাকে ক্রমাগত প্রসারিত করে চলেছেন। রাজকীয় ঐতিহ্য, প্রথাগত শিল্পকৌশল এবং আধুনিক উদ্ভাবনের অসাধারণ মেলবন্ধনের মাধ্যমে তিনি এমন এক শিল্পভাষা নির্মাণ করেছেন, যা একই সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন এবং সাংস্কৃতিকভাবে গভীর অর্থবহ। তাঁর জীবনযাত্রা প্রমাণ করে, শিল্প সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু নিজের পরিচয়, ঐতিহ্য এবং উদ্দেশ্যের শিকড়কে অটুট রেখেই বিশ্বকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দেওয়া সম্ভব।