কাশ্মীরি সুফি কবিদের বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে নির্জা মাত্তু

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 17 h ago
নির্জা মাত্তু তাঁর শ্রীনগরের বাসভবনে  দানিশ আলি-এর সঙ্গে কথা বলছেন
নির্জা মাত্তু তাঁর শ্রীনগরের বাসভবনে দানিশ আলি-এর সঙ্গে কথা বলছেন
 
ড্যানিশ আলি / শ্রীনগর

কাশ্মীরের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নির্জা মাত্তু কাশ্মীরের মরমি কবি লাল দেদ ও হাব্বা খাতুনের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক রেকর্ড করা সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সংঘাতের বয়ানের বাইরে গিয়েও কাশ্মীরের আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।”

শ্রীনগরে কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ১৪শ শতকের কাশ্মীরে লাল দেদ তাঁর গভীর দার্শনিক পদ্য ও সরাসরি আধ্যাত্মিক সংলাপের মাধ্যমে সুফি কবিতার শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। অন্যদিকে, ১৬শ শতকে হাব্বা খাতুন রোমান্টিক কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেন।

তবে ১৯৯০-এর দশকের অস্থিরতার পর বিশ্ব কাশ্মীরকে কেবল সহিংসতার দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে শুরু করে বলে মাত্তু অনুভব করেন। তাঁর মতে, সমকালীন বাস্তবতার পাশাপাশি অঞ্চলের প্রাচীন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও তুলে ধরা জরুরি।এই বিশ্বাস থেকেই তিনি লাল দেদের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং পরে The Mystic and the Lyric শিরোনামে প্রকাশ করেন।
 
নির্জা মাত্তু
 
১৯৯৪ সালে তিনি আধুনিক কাশ্মীরি কথাসাহিত্যের একটি সংকলন The Stranger Beside Me প্রকাশ করেন, যার মাধ্যমে সমসাময়িক কাশ্মীরি ছোটগল্প ইংরেজি পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হয়।

নিজের কাজের মাধ্যমে তিনি চেয়েছেন, বিশ্বপাঠক যেন কাশ্মীরি সাহিত্যের গভীরতা ও ঐশ্বর্য উপলব্ধি করতে পারেন।

সাহিত্য অনুবাদের পাশাপাশি মাত্তু কাশ্মীরি রান্নাশৈলীকেও নথিবদ্ধ করেছেন। মুসলিম ও পণ্ডিত—উভয় সম্প্রদায়ের খাদ্য ঐতিহ্য একত্র করে তিনি একটি বই প্রকাশ করেন, যা ইতিমধ্যে একাধিক সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কাছে এটিও ছিল কাশ্মীরের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

নিজের জীবনপথের কথা স্মরণ করতে গিয়ে ৮৮ বছর বয়সী এই শিক্ষাবিদ জানান, তাঁর শৈশবে কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের মেয়েদের খুব কমই স্কুলে পাঠানো হতো। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা বাড়িতেই গ্রহণ করেন এবং ১৯৫১ সালে পরিবার জম্মুতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশ করেন। ইংরেজিতে দক্ষতার ভিত্তিতে তাঁকে সরাসরি নবম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়।

১৯৫৮ সালে তিনি শ্রীনগরের মৌলানা আজাদ রোডে অবস্থিত গভর্নমেন্ট কলেজ ফর উইমেনে ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি টানা ৩৮ বছর শিক্ষকতা করেন এবং ১৯৯৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

মাত্তু উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক তরুণ-তরুণী ধীরে ধীরে নিজেদের মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, যখন বাবা-মা বাড়িতে কাশ্মীরি ভাষায় কথা বলা বন্ধ করেন, তখন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ভাষাটি অপরিচিত হয়ে পড়ে। তবে আশাবাদী সুরে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, বেশ কিছু তরুণ লেখক ইংরেজি ও কাশ্মীরি—উভয় ভাষায়ই মানসম্মত সাহিত্য রচনা করছেন।

ইন্টারনেট ও তাত্ক্ষণিক তথ্যপ্রাপ্তির যুগে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর সতর্কবার্তা—উপরিতল জ্ঞান কখনোই গভীর অধ্যয়নের বিকল্প হতে পারে না।

তাঁর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে যে, একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্যক্তি কীভাবে কাশ্মীরের ভাষা, সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারেন।