মুন্নি বেগম / গুয়াহাটি
কাপড়ের প্রতি সাধারণ ভালোবাসাই যে একদিন জীবিকার পথ খুলে দিতে পারে, তারই এক অনন্য উদাহরণ নগাঁওয়ের আলামারা বরভুঁইয়া। ২০০৮ সালে মাত্র ৫ হাজার টাকার সামগ্রী কিনে মেখেলা-চাদরের একটি ছোট ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। আজ সেই ব্যবসার পরিধি এতটাই বেড়েছে যে, মাসে প্রায় এক লাখ টাকা উপার্জনের পাশাপাশি আটজন মহিলার কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। নিজের ব্র্যান্ড ‘AB Assamese Ethnic’-এর মাধ্যমে অসমের ঐতিহ্যবাহী পোশাক দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশের ক্রেতাদের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই মহিলা উদ্যোগপতি।
দুই কন্যাসন্তানের মা আলামারা ব্যবসা শুরু করার সময় বিশেষ কোনও পরিকল্পনা করেননি। কাপড় কেনার শখ এবং মেখেলা-চাদরের প্রতি আগ্রহ থেকেই এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। প্রথমে নিজের জন্য এবং পরবর্তীতে বন্ধুদের মধ্যে কাপড়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই ব্যবসার সূচনা হয়। তাঁর পছন্দ করে তৈরি করা পোশাক বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর কথা ভাবেন তিনি।
"আওয়াজ-দ্য ভয়েস"-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আলামারা বরভুঁইয়া বলেন, “প্রথম দিকে বন্ধু ও আত্মীয়দের নিয়ে একটি ছোট ক্রেতাগোষ্ঠী তৈরি করেছিলাম। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া টাকা আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করতাম। প্রথমবার প্রায় ৫ হাজার টাকার সামগ্রী কিনেছিলাম। তবে বাজার এবং সামগ্রীর দাম সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকায় শুরুতে অনেক জিনিসই বেশি দামে কিনতে হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার অভিজ্ঞতা হয়েছে। পাশাপাশি সামগ্রীর গুণগত মান এবং বাজার সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করেছি।”
পরবর্তীকালে অনলাইন ব্যবসার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন আলামারা। মিশো, ফ্লিপকার্ট এবং অ্যামাজনের মাধ্যমে সামগ্রী বিক্রি শুরু করেন তিনি। মিশোর মাধ্যমে প্রায় ২১ লক্ষ টাকা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে কয়েকটি খারাপ অভিজ্ঞতার পর মিশো ও ফ্লিপকার্টের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। বর্তমানে শুধুমাত্র অ্যামাজনের মাধ্যমেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি।
আলামারা বরভুঁইয়ার তৈরি তসের পোশাক
নিজের নামের আদ্যক্ষর ‘AB’ এবং অসমের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পরিচয়কে একত্রিত করে ‘AB Assamese Ethnic’ নামে একটি ব্র্যান্ড গড়ে তুলেছেন আলামারা। অ্যামাজনে ব্র্যান্ডটির জনপ্রিয়তা বাড়ার পর আন্তর্জাতিক শিপমেন্টের জন্যও তাঁর কাছে যোগাযোগ আসতে শুরু করে। তিনি বলেন, “যখন UAE এবং UK-র অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিজের নাম, ছবি এবং পোশাকের তালিকা দেখতে পাই, তখন অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, অন্যান্য দেশের অনলাইন মার্কেটপ্লেসেও আমার সামগ্রী তালিকাভুক্ত রয়েছে। এরপর ব্র্যান্ডের সুরক্ষার জন্য ট্রেডমার্কের আবেদন করার পাশাপাশি জিএসটি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করি। বর্তমানে আমার ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট লাইসেন্সও রয়েছে।”
বিদেশের পাশাপাশি বর্তমানে আলামারার মহারাষ্ট্র, বিশেষ করে মুম্বই, পশ্চিমবঙ্গ, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ক্রেতা রয়েছেন। অসমিয়া মেখেলা-চাদরের প্রতি বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের মানুষের আগ্রহ তাঁর ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী ক্রেতারাও বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে পরার জন্য তাঁর কাছ থেকে অসমিয়া পোশাক কিনে থাকেন। এমনকী, এক ক্রেতা তাঁর নামেই একটি কবিতা লিখে উপহার দিয়েছিলেন। এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে আলামারার।
আলামারা নিজে কাপড় বোনেন না। তবে পোশাকের ডিজাইন, রং, বিষয়বস্তু এবং অসমের ঐতিহ্যবাহী নকশাকে নতুনভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর নিজস্ব সাতটি তাঁত রয়েছে। পাট, মুগা, তস, নুনী, মাছরাইজ এবং কটন-সহ বিভিন্ন ধরনের কাপড় তাঁর সংগ্রহে রয়েছে। টসের পোশাকের দাম ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা, পাটের দাম ৭ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা, মাছরাইজের দাম ২ হাজার থেকে ২,৫০০ টাকা এবং কটনের দাম ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে।
ডিজাইন সম্পর্কে আলামারা জানান, গছবুটা এবং কিংখাপের নকশা তাঁর ক্রেতাদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়। তবে জোনবিরি তাঁর সবচেয়ে আলোচিত ডিজাইনগুলির অন্যতম। জোনবিরি ও স্ট্রাইপের সংমিশ্রণে সোনালি এবং রুপোলি রঙের একটি বিশেষ ডিজাইন তৈরি করেছিলেন তিনি। এই ডিজাইনের জন্য বিপুল পরিমাণে বুকিং পেয়েছিলেন। এমনকী, এক ক্রেতা নিজের মেয়ের বিয়ের জন্য সেই কাপড় দিয়ে লেহেঙ্গাও তৈরি করিয়েছিলেন।
আলামারা বরভুঁইয়ার বুটিক ‘AB Assamese Ethnic’ এবং তাঁর তৈরি পোশাক
বর্তমানে তসের কাপড় নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করার পাশাপাশি পাট এবং বেডশিটের ডিজাইন থেকেও অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন নতুন নকশা তৈরি করছেন আলামারা। পুজোর জন্য জোনবিরি এবং ছোট বুটির নকশার পোশাকও বাজারে এনেছিলেন তিনি। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে একই ডিজাইনের পোশাক তুলনামূলক কম দামেও সরবরাহ করেছেন তিনি।
সামগ্রীর গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনওরকম আপস করতে চান না আলামারা। তিনি বলেন, “প্রকৃত তসের কাপড় সরবরাহের ক্ষেত্রে ল্যাব-টেস্ট করা শংসাপত্র রয়েছে, এমন সামগ্রীই ক্রেতাদের দিয়ে থাকি। কোনও সামগ্রী নকল প্রমাণিত হলে ১০০ শতাংশ টাকা ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তাও ক্রেতাদের দিই। আমি গুয়াহাটি এবং শুয়ালকুচি থেকে অনলাইনের মাধ্যমে উন্নতমানের সামগ্রী কিনি। বর্তমানে এই ব্যবসা থেকে মাসে আনুমানিক এক লাখ টাকা উপার্জন করছি।”
আলামারা বরভুঁইয়ার তৈরি তস ও পাটের পোশাক
বর্তমানে আলামারার ব্যবসার সঙ্গে প্রায় আটজন মহিলা যুক্ত রয়েছেন। অ্যামাজনের অর্ডার প্যাকিং, পোশাকের কাজ, টেলারিং, দোকান পরিচালনা, ম্যানেজমেন্ট এবং মডেলিং-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁরা কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে একজন প্রায় সাত বছর ধরে আলামারার সঙ্গে কাজ করছেন। অধিকাংশ অর্ডারই অনলাইনের মাধ্যমে আসে। ক্রেতাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজড পোশাকও তৈরি করে দেন তাঁরা।
তবে ব্যবসায় এই সাফল্যের পথ আলামারার কাছে মোটেও সহজ ছিল না। মহিলা হিসেবে নিজের উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করায় তাঁকে বহু সময় সমাজের কটূক্তির মুখে পড়তে হয়েছে। ‘স্বামীর টাকা রয়েছে, তাহলে তোমার কাজ করার কী প্রয়োজন?’, এমন প্রশ্নও শুনতে হয়েছে তাঁকে। সামাজিক মাধ্যমেও মুসলিম মহিলা হয়ে অসমিয়া পোশাকের ব্যবসা করার জন্য বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
আলামারা বরভুঁইয়ার কাছ থেকে পোশাক কেনা ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া
এই প্রসঙ্গে আলামারা বলেন, “আমি অসমে জন্মগ্রহণ করেছি, অসমিয়া মাধ্যমেই পড়াশোনা করেছি। আমার জীবনযাপন, খাবার এবং সংস্কৃতি অসমিয়া। মুসলিম হওয়ার কারণে কি আমি অসমিয়া হতে পারব না? নিজের পরিচয় নিয়ে আমি গর্ব অনুভব করি।”
এই যাত্রায় স্বামীর সমর্থন তাঁর কাছে অন্যতম শক্তি হয়ে উঠেছে। পেশায় ব্যবসায়ী আলামারার স্বামী প্রতিটি কঠিন সময়ে তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক মন্তব্য কিংবা অন্যের কথায় মন খারাপ হলে স্বামী তাঁকে বলেন, “কে কী বলছে, তা শোনার প্রয়োজন নেই। আমি তো আছি, তুমি নিজের কাজ করে যাও।”
মেখেলা-চাদরের ব্যবসার পাশাপাশি রান্না এবং হস্তশিল্পের প্রতিও আগ্রহ রয়েছে আলামারার। পিৎজা, বিভিন্ন ধরনের ব্রেড, কেক এবং নতুন নতুন খাবার তৈরি করে বিক্রি করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। চকোলেট-ভ্যানিলা কেক, চিকেন ব্রেড, ভেজিটেবল ব্রেড এবং স্টাফড ব্রেড ছিল তাঁর বিশেষত্ব। তাঁর তৈরি পিৎজা দোকানে রাখার মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে, সেলাইয়ের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না নিয়েও ইউটিউব দেখে কাটিং ও সেলাই শিখেছেন তিনি। এমনকী, এমব্রয়ডারি না জানা সত্ত্বেও বেডশিটে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন আলামারা।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “হাতের কাজ জানা মানুষ কখনও গরিব থাকতে পারেন না। মহিলাদের নিজেদের প্রতিভা চিনে সেই প্রতিভাকে উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, বর্তমান ডিজিটাল যুগে হাতে থাকা একটি মোবাইল ফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই নিজের কাজ ও প্রতিভাকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।”
আলামারা বরভুঁইয়ার তৈরি পোশাক
আগামী দিনে নিজের ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে একটি ফ্যাশন শো আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে আলামারার। প্রথমে ভারতীয় স্তরে নিজের ব্র্যান্ডকে আরও পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি অসমের ঐতিহ্যবাহী পোশাককে বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। এতটা সাফল্যের পরেও নিজেকে এখনও একজন ‘নতুন শিক্ষার্থী’ বলেই মনে করেন আলামারা। তাঁর কথায়, “আমি এখনও নিজের কাজ নিয়ে আত্মসন্তুষ্ট নই। কারণ, আগামী দিনে আমার আরও অনেক কাজ করা বাকি রয়েছে।”
মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হওয়া যে ব্যবসা আজ মাসে এক লাখ টাকা আয়ের পাশাপাশি আটজন মহিলার কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণার কাহিনি। নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসের জোরে আলামারা বরভুঁইয়া অসমের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবসায় নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি, তাঁর এই উদ্যোগ অন্য মহিলাদের কাছেও আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।