ইজরায়েলের নতুন সরকার, ভারতের পুরনো সমীকরণ! কৌশলগত বন্ধুত্বে কতটা এগোবে নয়াদিল্লি?

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
ইজরায়েলের নতুন সরকার, ভারতের পুরনো সমীকরণ! কৌশলগত বন্ধুত্বে কতটা এগোবে নয়াদিল্লি?
ইজরায়েলের নতুন সরকার, ভারতের পুরনো সমীকরণ! কৌশলগত বন্ধুত্বে কতটা এগোবে নয়াদিল্লি?
 
  রাজীব নারায়ণ

একদিকে বর্ষার অনিয়মে বিপাকে পড়া কৃষক, অন্যদিকে জলসংকটে ভুগতে থাকা শহর। কোথাও সাইবার অপরাধীদের মোকাবিলায় ব্যস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা। আপাতদৃষ্টিতে এই চারটি ক্ষেত্রের মধ্যে কোনও মিল নেই। কিন্তু ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে প্রত্যেকেই, আর সেই সম্পর্ক হল ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা। ইজরায়েলে অনিশ্চিত নির্বাচনের ফল এবং পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে এই অংশীদারিত্ব নতুন করে তাৎপর্য পাচ্ছে।
 
কয়েক দশক ধরে ভারত-ইজরায়েল সম্পর্ক মূলত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচিত হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্র এখনও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তবে সম্পর্কের পরিধি এখন আর তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গত তিন দশকে কৃষি, জল ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং উন্নত প্রযুক্তির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
 
মোদি-নেতানিয়াহু বৈঠক
 
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েল সফর এই সম্পর্ককে নতুন গতি দেয়। দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এর পর্যায়ে উন্নীত করে। এর পিছনে উদ্দেশ্য স্পষ্ট, শুধু প্রযুক্তি কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যৌথভাবে প্রযুক্তি উদ্ভাবন, ভারতের প্রয়োজন অনুযায়ী তার অভিযোজন এবং এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজে বাস্তব সুফল বয়ে আনতে পারে।
 
তাই এই অংশীদারিত্বের মূল সুযোগ কেবল ইজরায়েলের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সেই দক্ষতাকে ভারতের নিজস্ব সক্ষমতায় রূপান্তরিত করাই আসল লক্ষ্য। এর ফলে কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি, সম্পদের আরও কার্যকর ব্যবহার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। ইজরায়েলে শেষ পর্যন্ত যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এই সহযোগিতা যাতে প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক স্তর পেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে, সেটাই হবে প্রকৃত সাফল্য।
 
বন্ধুত্বের অর্থনৈতিক দিক
 
সরকারি চুক্তি ও কূটনৈতিক ঘোষণার গণ্ডি পেরিয়ে ভারত-ইজরায়েল সম্পর্ক কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তার উত্তর মিলবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দুই দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩.৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। পাশাপাশি, দুই দেশ একটি প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। জুলাই মাসে এই চুক্তি সংক্রান্ত দ্বিতীয় দফার আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। বৃহত্তর বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এর সুফল নির্ভর করবে চুক্তির শর্তাবলি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি বাস্তবে কতটা সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে, তার উপর।
 
ভারতীয় সংস্থাগুলির কাছে ইজরায়েল প্রযুক্তি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষি উদ্ভাবন, জল ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন শিল্পের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অন্যদিকে, ইজরায়েলি সংস্থাগুলির কাছে ভারত একটি বৃহৎ ভোক্তা বাজার, দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতি, শিল্প পরিকাঠামো এবং দক্ষ বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারের বিশাল ভাণ্ডার। দুই দেশের এই পারস্পরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যের পরিধি আরও বিস্তৃত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। সীমিত কয়েকটি পণ্যের উপর নির্ভরশীল বাণিজ্য এমন দুই অর্থনীতির সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে পারে না, যাদের শক্তি ও দক্ষতা একে অপরের পরিপূরক।
 
ইজরায়েলের সংসদ ভবন
 
প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরই চূড়ান্ত সাফল্য নয়, বরং এটি একটি মাধ্যম মাত্র। ব্যবসা পরিচালনা কতটা সহজ হচ্ছে, বিনিয়োগ কতটা বাড়ছে এবং দুই দেশের সাধারণ মানুষ কতটা উপকৃত হচ্ছেন, তার উপরই এই চুক্তির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে।
 
পশ্চিম এশিয়ার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই
 
এই সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সামনে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হিসাব। ইজরায়েল ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও, দেশটি এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যা ভারতের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভারত পায় জ্বালানি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে তেলের দামে, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, কাতার-সহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক বিদেশনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও বিষয় নয়; বরং তা ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
 
এই কারণেই প্রস্তাবিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের মতো যোগাযোগ ও পরিকাঠামো উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার উপর। সংঘাতের পরিবেশে এ ধরনের কৌশলগত প্রকল্পের বিকাশ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন বিরোধও ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারত বরাবরই দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ, একটি সার্বভৌম, স্বাধীন ও কার্যকর প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র এবং ইজরায়েল, দুই দেশই যেন শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে।
 
এই অবস্থান বজায় রাখার অর্থ ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। একইভাবে, ইজরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখার জন্য মানবিক বিপর্যয় নিয়ে নীরব থাকা কিংবা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে ভারতের অবস্থান দুর্বল করারও প্রয়োজন নেই। ইজরায়েলিদের নিরাপত্তা এবং প্যালেস্তিনীয়দের অধিকার, দুটিই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। একটিকে সমর্থন করার জন্য অন্যটিকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
 
আরব দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক
 
বন্ধুত্বের আড়ালে রাজনৈতিক সমীকরণ
 
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই ইজরায়েলের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে কোনও পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এলেও, কোনও জোটই ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পায়নি। ফলে পরবর্তী সরকারের গঠন ও নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণে জোট গঠনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
 
এই নির্বাচনের ফল অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এর ফলে ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের দীর্ঘদিনের ভিত্তিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। দুই দেশের নিরাপত্তাগত স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার উপর এই সম্পর্ক দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইজরায়েলে সরকার পরিবর্তন বা নতুন জোট গঠনের কারণে এই সহযোগিতার ভিত্তি রাতারাতি বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
 
এই নির্বাচনে ইজরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলি রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে। ফলে সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের প্রতিনিধিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই নির্বাচনী সাফল্য শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, উন্নত জনপরিষেবা কিংবা বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনও দেখার বিষয়।
 
দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেই বন্ধুত্ব
 
ভারতের সামনে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হল, কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং পশ্চিম এশিয়ার প্রতি বৃহত্তর দায়িত্বের মধ্যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়া নয়, বরং দুটিকে একই সঙ্গে সামলানো। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও জোরদার করা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ, গবেষণার ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব এবং কৃষি ও জল নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যৌথ উদ্যোগ। একই সঙ্গে আরব দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, গোটা অঞ্চলে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান নেওয়াও জরুরি।
 
ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর
 
ইজরায়েলের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আগামী কয়েক মাসে দুই দেশের সহযোগিতার গতি ও দিককে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি কোনও একটি নির্বাচনী চক্র কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রকৃত পরীক্ষা হল, এই বন্ধুত্ব দুই দেশের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনতে পারে এবং একই সঙ্গে ভারতের অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিসর কতটা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা নিজস্ব স্বাধীন বিদেশনীতি বজায় রাখার অর্থ এই নয় যে ভারত তার অংশীদারদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে।
 
ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের শক্তি শুধু কূটনৈতিক বক্তব্যের উষ্ণতা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং এই সম্পর্ক বাস্তবে কী সুফল বয়ে আনছে এবং পশ্চিম এশিয়ার বৃহত্তর বাস্তবতাকে মাথায় রেখে ভারত কতটা স্বাধীনভাবে নিজের কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে পারছে, তার উপরই নির্ভর করবে এই বন্ধুত্বের প্রকৃত সাফল্য।
 
(লেখক: রাজীব নারায়ণ, প্রবীণ সাংবাদিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।)


শেহতীয়া খবৰ