পুরুষ-শাসিত পেশায় এক নারী: ‘পান্ডু’র দীপিকা পাল মাটির মূর্তি বানানোর পাশাপাশি নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে তুলেছেন
Story by Ariful Islam | Posted by Sudip sharma chowdhury • 16 h ago
দীপিকা পাল
সুদীপ শর্মা চৌধুরী ও আরিফুল ইসলাম/গুয়াহাটি
তিনি শুধু মাটি দিয়ে মূর্তিই বানান না, নিজের স্বপ্নও তৈরি করেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় মাটি, ফাইবার আর সিমেন্টের মতো প্রাণহীন উপাদানগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। কখনও দুর্গা, কখনও বাসন্তীদেবী, কখনও বিভিন্ন হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি—প্রতিটি প্রতিমা তাঁর শিল্পকর্ম, কঠোর পরিশ্রম আর জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প বলে। ইনি হলেন দীপিকা পাল, গুয়াহাটির পাণ্ডুর বাসিন্দা। প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি ভাস্কর্যকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এই পেশা তাঁর কাছে শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়। এই পেশা তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য, বাবার স্মৃতি এবং নিজের আত্মপরিচয় গড়ার এক দীর্ঘ সংগ্রাম।
দীপিকার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ভাস্কর্য শিল্পের সঙ্গে জড়িত। ছোটবেলায় পড়ার সময় দীপিকা খুব কাছ থেকে তাঁর বাবার ভাস্কর্যের কাজ দেখতেন। কীভাবে মাটি ধীরে ধীরে একটি কাঠামো তৈরি করে এবং সেই কাঠামোতে কীভাবে দেবীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে—এই সবকিছুই তিনি তাঁর চোখের সামনে দেখতেন। তবে তখন তিনি কল্পনাও করেননি যে একদিন এই শিল্পই তাঁর জীবনের পেশা হয়ে উঠবে। কিন্তু জীবন কখনও কখনও মানুষকে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা সে কখনও কল্পনাও করেনি।
তারা তিন বোন এবং দীপিকার কোনো বড় বা ছোট ভাই নেই। দীপিকার বাবা হঠাৎ মারা যান এবং পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। একদিকে পরিবারের সমস্ত বোঝা সামলানো এবং অন্যদিকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার এক কঠিন সময় ছিল। আর সেই কঠিন সময়েই দীপিকা তার বাবার রেখে যাওয়া কাজগুলো নিজের হাতে তুলে নেন।
দুর্গা মায়ের প্রতিমা তৈরি করতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। বাবার মৃত্যুর পর, পরিবারকে সাহায্য করার জন্য আমি আমার বাবা ও পরিবারের এই পেশাটি বেছে নিই। আমি মাঝে মাঝে বাবা ও দাদাকে কাজ করতে দেখতাম এবং কখনও কখনও তাঁদের সাহায্যও করতাম।
দীপিকা মূর্তি তৈরি করছেন
সাধারণত পুরুষরাই মূর্তি তৈরি করে। আমি ভাবলাম, পুরুষরা যদি পারে, তাহলে নারীরা কেন পারবে না? এই ভাবনা থেকেই আমি কাজ শুরু করি। ছোটবেলা থেকেই আমার মূর্তি তৈরির স্বপ্ন ছিল। যদি আমি এই পারিবারিক ঐতিহ্যটা না রাখতাম, তাহলে হয়তো বাবার মৃত্যুর সঙ্গেই এর সমাপ্তি ঘটত। আমি আমার বাবার নামটা রক্ষা করতে পেরেছি।
একজন নারী হিসেবে, ভাস্কর্যের পুরুষ-শাসিত জগতে নিজের স্থান নিশ্চিত করতে তাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। তাকে তার বাবার পুরোনো গ্রাহকদের কাছে পুনরায় যেতে হয়েছে এবং তাদের বিশ্বাস নতুন করে অর্জন করতে হয়েছে। নিজের দক্ষতার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ভাস্কর্য শিল্পে দক্ষতার ক্ষেত্রে কোনো লিঙ্গভেদ নেই। ধীরে ধীরে তার কাজ আরও সুপরিচিত হয়ে ওঠে। তার হাতে গড়া প্রতিমা কেনার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে গ্রাহকরা আসতে শুরু করেন। যদিও তিনি তার বাবার পুরোনো পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে শুরু করেছিলেন, দীপিকা এখন নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন।
পরিবারকে ভরণপোষণের সংগ্রামের পাশাপাশি তাঁর দাম্পত্য জীবনেও নানা প্রতিকূলতা এসেছে। তবুও তিনি থেমে যাননি। দেবী দুর্গার মতোই তিনি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং তাঁর পরিবারকে রক্ষা করেছেন। তিনি একদিকে পারিবারিক দায়িত্ব এবং অন্যদিকে শিল্পের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। তিনি বর্তমানে একটি স্থানীয় ক্লাব থেকে দুর্গাপূজার মণ্ডপ ভাড়া নিয়ে সেখানে একটি প্রতিমা তৈরির কর্মশালা স্থাপন করছেন। মাটি, খড়, বাঁশ, রঙ এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে ঘেরা সেই কর্মশালাটি এখন তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা।
দীপিকার মূর্তি তৈরির কারখানাতে
দীপিকার মূর্তিরও চাহিদা রয়েছে। তিনি বলেন, তিনি অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বাসভবনের জন্যও বাসন্তীদেবীর প্রতিমা তৈরি করেছিলেন এবং মুখ্যমন্ত্রী সেই প্রতিমায় পূজা করেছিলেন।
দুর্গাপূজার মরসুমে তাঁর ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। দেবীর মুখের গড়ন, তাঁর চোখের চাহনি, তাঁর অলঙ্কারের নকশা—সবকিছুতেই তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং বিশেষ যত্ন রয়েছে। তাঁর কাছে প্রতিটি প্রতিমা একটি নতুন স্বপ্নের মতো। দীপিকার কথায়, "আমার মায়ের প্রতিমা তৈরি করা আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়, এটি আমার স্বপ্ন পূরণের মতো।"
প্রতিমাগুলো বানাতে বাঁশ, কাঠ, খড় এবং মাটি লাগে। শহরাঞ্চল হওয়ায় সমস্ত উপকরণ কিনে আনতে হয়। আমাকে বাইরে থেকে কর্মীও নিয়োগ করতে হয়। বছরের শুরুতে আমি প্রথমে গণেশ প্রতিমা তৈরি করি। আমার কাজ পূজা পর্যন্ত চলে এবং আমি রাস পূর্ণিমার জন্যও প্রতিমা তৈরি করি।
আমার বাবার ওপর মানুষের অনেক আস্থা ছিল। আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন বাবার গ্রাহকরা আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘আপনি কি এটা করতে পারবেন?’ আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিতাম যে আমি পারব। ধীরে ধীরে মানুষ আমার কাজ পছন্দ করতে শুরু করে এবং এখন আমাদের অনেক স্থানীয় গ্রাহকের পাশাপাশি অনান্য রাজ্যের গ্রাহকরাও রয়েছে।
শুধু তাঁর শিল্পের প্রতিই নয়, পরিবেশের প্রতিও তাঁর বিশেষ দায়বদ্ধতা রয়েছে। ভাস্কর্য তৈরিতে তিনি প্রায়শই পরিবেশবান্ধব রং ও উপকরণ ব্যবহারের ওপর জোর দেন। শিল্পী নদী ও জলাধারে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে দূষণ কমানোর বিষয়েও সর্বদা সচেতন থাকেন।
দীপিকা স্নেহ ভরে মা দুর্গার প্রতিমা প্রস্তুত করছেন
"বিসর্জনের সময়টা আমার জন্য খুব কঠিন। আমার মনে হয়, মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। ঠিক যেমন একজন মা ছোটবেলা থেকে সন্তানকে গড়ে তোলেন, আমিও তেমনি পরম স্নেহ দিয়ে প্রতিটি প্রতিমা প্রস্তুত করি," তিনি বললেন।
তবে, দীপিকার জীবন সংগ্রামের সবচেয়ে বড় পুরস্কার সম্ভবত তার নিজের ছোট্ট মেয়ের একটি নিষ্পাপ কথা। একদিন মেয়েটি তাকে বলেছিল, "মা, আমি তোমার মতো একটি প্রতিমা বানাবো।" এই একটি বাক্যই যেন দীপিকার দীর্ঘ সংগ্রামকে এক নতুন ও গভীর অর্থ দিয়েছে। যে শিল্প একসময় তার বাবার কাছ থেকে এসেছিল, তা হয়তো একদিন তার মেয়ের কাছেও পৌঁছাবে। মাটি দিয়ে স্বপ্ন গড়ার এই অনন্য ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলতে থাকবে।
তাই, দীপিকার গল্প শুধু একজন নারী ভাস্করের গল্প নয়; এটি একজন নারীর দৃঢ়সংকল্প ও আত্মনির্ভরশীলতার গল্প। এটি এমন এক পুরুষের গল্প, যিনি বাবাকে হারানোর পর শোক না করে ধৈর্য ধরে পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এটি এমন এক পুরুষের গল্প, যিনি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজের যোগ্যতায় সমাজে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন। তিনি দেবীর প্রতিমা তৈরি করেন, আর তাঁর নিজের জীবনটাই যেন এক জীবন্ত দুর্গা-কাহিনী—সংগ্রাম, বাধা, অন্ধকারে ভরা; কিন্তু শেষে রয়েছে বিজয়ের উজ্জ্বল আলো। পাণ্ডুর দীপিকা পাল আসলে মাটি দিয়ে মূর্তি বানিয়েই নিজের ভাগ্য গড়েছেন।