জন্ম থেকেই একটা ছোট হাত নিয়েই ২০২৮ লস এঞ্জেলস প্যারা অলিম্পিকে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখছে হার্দিক দাস!
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
জন্ম থেকেই হার্দিক দাসের একটা হাত ছিল ছোট। গ্রামের লোক বলতো একে দিয়ে কিছু হবে না। স্কুল স্পোর্টস ডে-তে সবাই দৌড়াতো ও মাঠের এক কোণে বসে থাকতো। সাত বছর বয়সে একদিন ওর বাবা ওকে জোর করে বেহালার একটা পুকুরে নিয়ে গেল স্নান করাতে। কিন্তু পুকুরের ঘাটে পা পিছলে ও পড়ে গেল। সবাই ভাবল জলে ডুবে যাবে। কিন্তু ও ঢুবলো না, ও ভাসলো।
প্রথমবার ও টের পেল- ডাঙায় যেটা ওর দূর্বলতা, জলে সেটা ওর শক্তি। ডাঙায় ওকে পা টানতে হয়, জলে পা-টা কোন ব্যাপারই না। ওর হাত দুটোই হয়ে গেল ওর ডানা। তারপর থেকে রোজ ভোর পাঁচটায়, যখন কেউ ঘুম থেকে ওঠে না ও পুকুরে নামতো। কেউ শেখায় নি। নিজে নিজে-একহাতে, বুক দিয়ে ঠেলে, সাঁতার কাটতো। প্রথমে ১০ মিটার, তারপরে ৫০ মিটার, এরপর পুরো পুকুরে এপার ওপার।
হার্দিক দাস
একদিন এক স্থানীয় কোচ শিব প্রসাদ দে তাকে দেখে তার বাবা-মাকে বললেন, "দেখুন ওর শরীর জলের জন্যই বানানো।" তার প্রাথমিক প্রশিক্ষণটাও চললো শিব প্রসাদের হাত ধরে। কিন্তু দু'বছর লক ডাউন থাকার জন্য সাঁতারটা তার অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। তবে সে ২০২২-২৩ সালে ইন্ডিয়া লাইফ সেভিংস সোসাইটিতে ভর্তি হয় ট্রেনিংয়ের জন্য। সেখানে হার্দিককে কোচিং করাতেন বিজয় নাইয়া।
এখান থেকেই হার্দিক সুয়োগ পেয়ে যায় গুজরাটের স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ায়। সেখানে প্যারা অ্যাথলিটদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। আর এখান থেকেই হার্দিকের শুরু হয় সামনের দিকে এগিয়ে চলা। কিন্তু এক বছর পর সে সাই থেকে চলে আসে কলকাতায়। এখানে এসে হার্দিক বেহালা ইস্টার্ন রেলওয়ে একাডেমিতে ভর্তি হয়, যেখানে সে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোচ আকবর আলী মীরের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে। কোচ আকবর আলি মিরের হাত ধরেই সে দিনের অবহেলিত হ্যান্ডিক্যাপ ছেলেটা প্যারা অ্যাথলেটিক্সে আজ নজর কাড়ছে।
দেখুন হার্দিক দাসের সাফল্যটা-
** ২০২৩ সালে প্রথম রাজ্য প্যারা সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে ফ্রিস্টাইল ও ব্যাক স্ট্রোকে সোনা পায়।
** ২০২৩ সালেই প্রথম রাজ্য প্যারা সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েই ফ্রিস্টাইল ও ব্যাক স্ট্রোকে সোনা জয় করে।
** ২০২৩ সালেই গোয়ালিয়রে প্রথম ন্যাশনাল প্যারা সুইমিং প্রতিযোগিতায় বাটারফ্লাই ও ব্যাকস্ট্রোকে সোনা ও ফ্রি স্টাইলে ব্রোঞ্জ পায়।
** ২০২৪ সালে গোয়ায় ন্যাশনাল প্যারা সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাটারফ্লাই ও ব্যাকস্ট্রোকে সোনা ও ফ্রি স্টাইলে ব্রোঞ্জ পায়।
** ২০২৫ এ হায়দ্রাবাদের প্যারা সুইমিং এ দুটো সোনা ও একটি রুপো পায়।
** ২০২৬-এ বেঙ্গালুরুতে ন্যাশনাল প্যারা সুইমিং এ দুটো সোনা ও একটি রূপো পায়।
হার্দিক দাস আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোচ আকবর আলী মীরের সঙ্গে
এতসব সাফল্যের পর ২০২৬ এর ব্যাঙ্গালোরে ন্যাশনাল প্যারা সুইমিং এর আগে ২০২৫ এ এসেছিল এক বড় সুযোগ তার কাছে। যেটা ছিল ২০২৬-এ দুবাইয়ে প্যারা ইউথ এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার সুযোগ। ভারতের সিলেকশন স্কোয়াডে তার নাম ছিল সাত নম্বরে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ৫ জন খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ায় হার্দিকের কাছে দুবাই যাওয়ার সুযোগ হয়নি।
কিন্তু এখন যে সুযোগটা হার্দিক এর কাছে এসেছে তা তো বিরাট সুযোগ। প্যারা অলিম্পিক কমিটি হার্দিকের পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছে ২০১৮ সালের লস এঞ্জেলস প্যারা অলিম্পিকে জন্য তৈরি থাকতে। সেই দিকেই লক্ষ্য রেখে হার্দিক তার প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে কোচ আকবর আলী মীরের কাছে।
কোচ আকবর আলী মীর তার ছাত্র হার্দিকের ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস প্যারা অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী এবং ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি মনে করেন, হার্দিকের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের নাম উজ্জ্বল করার এবং লস অ্যাঞ্জেলেস প্যারা অলিম্পিকে মেডেল জেতার সব ধরনের ক্ষমতা রয়েছে।
হার্দিকের নিয়মিত অনুশীলন, খেলার প্রতি একনিষ্ঠতা এবং মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করে তিনি জানান, সঠিক প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে হার্দিক ২০২৮ সালে তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে।
২০২৮ সালের প্যারা অলিম্পিককে পাখির চোখ করে হার্দিক এখন থেকেই কোচের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছেন। আসলে ১৫ বছরের ওই হ্যান্ডিক্যাপ ছেলেটা আমাদের শেখায়- উঠে আসার জন্য পা লাগে না ,হাত লাগে না,স্রোতের উল্টোদিকে যাওয়ার জন্য সাহস লাগে।