দেশভাগের ক্ষত ভুলে সম্প্রীতির নজির পাঞ্জাবে, মুসলিমদের উপাসনালয় গড়তে জমি দান হিন্দু-শিখদের

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 6 h ago
দেশভাগের ক্ষত ভুলে সম্প্রীতির নজির পাঞ্জাবে, মুসলিমদের উপাসনালয় গড়তে জমি দান হিন্দু-শিখদের
দেশভাগের ক্ষত ভুলে সম্প্রীতির নজির পাঞ্জাবে, মুসলিমদের উপাসনালয় গড়তে জমি দান হিন্দু-শিখদের
 
আওয়াজ দ্য ভয়েস, বাংলা 

দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক হিংসার আগুনে পুড়েছিল অগণিত মানুষের জীবন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের পর বহু মুসলিম তাঁদের উপাসনালয় হারিয়েছিলেন। কোথাও মসজিদ পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল, কোথাও সেগুলি অপবিত্র করা হয়েছিল, আবার কোথাও গবাদি পশু রাখার ঘর কিংবা গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের সেই ক্ষতকে আঁকড়ে না ধরে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন ভারতের পাঞ্জাবের বিভিন্ন গ্রামের হিন্দু ও শিখ বাসিন্দারা। গত এক দশকে তাঁদের উদ্যোগে একের পর এক পুরনো মসজিদ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এমনকি যেসব গ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা নেই বললেই চলে, সেখানেও মসজিদে নমাজ পড়ার জন্য আশপাশের এলাকার মুসলিম কৃষিশ্রমিক ও ধর্মীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
 
পাঞ্জাবের ফতেহগড় সাহিব জেলার জাখিওয়াল গ্রামের ৮৭ বছর বয়সি গাজ্জু খান সেই সম্প্রীতিরই এক জীবন্ত সাক্ষী। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় একটি অসমাপ্ত ভবনে বসে তাঁর মুখে আশার হাসি। তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, মৃত্যুর আগে অন্তত একবার যেন নিজের গ্রামে মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি শুনতে পান। আট বছর বয়সে চণ্ডীগড়ের কাছে তিরা মালোয়া গ্রামে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকার সময় শেষবার মসজিদে আজান শুনেছিলেন তিনি।
 
জসপাল শর্মা ( বাঁদিকে)। হিন্দু পুরোহিতের পরিবার থেকে উঠে আসা জসপাল নিজের গ্রামের একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য তাঁর এক টুকরো জমি দান করেছেন
 
খানের কাছে এই স্বপ্নের গুরুত্ব শুধু একটি উপাসনালয়ের পুনর্নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসার মধ্যে শিখ প্রতিবেশীরা তাঁকে ও তাঁর ভাইদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। অথচ সেই অভিজ্ঞতার পরেও তিনি কখনও ভাবেননি, একদিন তাঁর গ্রামে অবশিষ্ট ১৮টি মুসলিম পরিবারের জন্য নতুন করে মসজিদ তৈরি হবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, জাখিওয়ালের শিখ ও হিন্দু বাসিন্দারাই প্রায় সম্পূর্ণ নির্মাণের ব্যয়ভার বহন করেছেন।
 
খান স্মৃতিচারণ করে বলেন, “এটি ছিল আমার মাতুলালয়। রক্তপাতের হাত থেকে বাঁচাতে বাবা-মা আমাকে ও আমার দুই ভাইকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের গ্রামের বাড়িতে তাঁরা নিহত হন। লাঠি ও জ্বলন্ত মশাল হাতে টহল দেওয়া লোকজনের হাত থেকে শিখরা আমাদের লুকিয়ে রেখেছিলেন।”
 
গ্রামের ৭৭ বছর বয়সি শিখ বাসিন্দা বিবি রাজিন্দর কৌরের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ খান। গ্রামের মুসলিমদের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যে নিজেদের কৃষিজমির একাংশ দান করতে তিনি তাঁর নাতিকে রাজি করিয়েছিলেন। রাজিন্দর কৌরের বক্তব্য, গ্রামের অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের উপাসনা ও সমবেত হওয়ার জায়গা থাকলেও মুসলিমদের তেমন কোনও স্থান ছিল না।
 
তিনি বলেন, “কাউকে উপাসনার জন্য একটি জায়গা করে দেওয়ার চেয়ে ভালো কাজ আর কিছু হতে পারে না। এই জমি যে রক্তপাতের সাক্ষী হয়েছে, তার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রায়শ্চিত্ত করার প্রয়োজনও অনুভব করেছিলাম। আমাদের গ্রামের মুসলিমদের শুধু নমাজ পড়ার জন্য চার কিলোমিটার দূরের অন্য একটি গ্রামে যেতে হত।”
 
"সাধনা কসাই", পঞ্জাবের বহু মসজিদের মধ্যে অন্যতম, দেশভাগের পর যা ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল
 
জাখিওয়াল থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে সাঙ্গরুর জেলার পুনাওয়াল গ্রামেও দেখা গিয়েছে একই ছবি। হিন্দু পুরোহিতদের পরিবারে জন্ম নেওয়া ৪৮ বছর বয়সি জসপাল শর্মা একটি নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য নিজের জমি দান করেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে মসজিদটির উদ্বোধনের সময় তিনি গোটা গ্রামের মানুষের জন্য ভোজের আয়োজনও করেন।
 
পুনাওয়াল গ্রামে মোট ৫৫০টি পরিবার বসবাস করে। তার মধ্যে মুসলিম পরিবারের সংখ্যা খুবই কম। তবুও মসজিদ নির্মাণে এগিয়ে আসতে দ্বিধা করেননি শর্মা। তাঁর মতে, এটি প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালনেরই একটি অংশ।
 
শর্মা বলেন, “মসজিদটি আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে। দিনে পাঁচবার প্রার্থনার ধ্বনি শোনা যায়, যা পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে। আমাদের ভালো লাগে। আর শুধু আমরাই নই, গ্রামের প্রত্যেকেই এগিয়ে এসেছেন। হিন্দু ও শিখ, সবাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রেখেছেন। কেউ অর্থ দিয়েছেন, আবার কেউ ইট ও সিমেন্ট দান করেছেন।”
 
মালেরকোটলার উমরাপুরা গ্রামেও একটি স্থানীয় ধর্মীয় উপাসনালয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছেন সুখজিন্দর সিং পান্ধের ও তাঁর ভাই। তাঁদের কাছে এই কাজ কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনেরও একটি উপায়। দেশভাগের সময় তাঁদের দাদু পশ্চিম পাঞ্জাব ছেড়ে ভারতে চলে এসেছিলেন।
 
পুনরুদ্ধার করা মসজিদের খালি মেঝেতে বসে মুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে চা পান করতে করতে পান্ধের বলেন, “এখানে কাউকে আলাদা চোখে দেখা হয় না। ঈদ হোক কিংবা শিখদের অন্যতম পবিত্র উৎসব গুরুপরব, দুই সম্প্রদায়ের মানুষই সমান উৎসাহে উৎসব পালন করেন।”
 
শিখ সম্প্রদায়ের বিবি রাজিন্দর কৌর নিজের গ্রামের একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য পরিবারের জমি দান করেছেন
 
তিনি আরও বলেন, “আমরা একসঙ্গে বসবাস করি। দেশের অন্য কোথাও যা-ই ঘটুক না কেন, এখানে ভালোবাসা ও ঐক্যের পরিবেশ বজায় থাকে। জাতি কিংবা ধর্ম নির্বিশেষে কোনও মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা পাঞ্জাবের বিবেক মেনে নিতে পারে না।”
 
পাঞ্জাবের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও ধর্মীয় সহাবস্থানের ঐতিহ্যের কথাও তুলে ধরেন পান্ধের। তাঁর মতে, এই অঞ্চলের ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতির পারস্পরিক আদানপ্রদান গভীরভাবে প্রোথিত। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ষোড়শ শতাব্দীর সুফি সাধক হজরত মিঁয়া মীরের কথা উল্লেখ করেন। জনপ্রিয় বিশ্বাস অনুযায়ী, শিখ ধর্মের পবিত্রতম উপাসনাস্থল অমৃতসরের হরমন্দির সাহিব বা স্বর্ণমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
 
পাঞ্জাবের প্রাক্তন শাহী বা প্রধান ইমাম মৌলানা হাবিব-উর-রহমান সানি লুধিয়ানভির অনুপ্রেরণায় গত নয় বছরে অমুসলিম গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় ১৬৫টিরও বেশি মসজিদ পুনরুদ্ধার বা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দেশভাগের পর তৈরি হওয়া দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন সাধারণ মানুষ।
 
২০২১ সালে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে পাঞ্জাবের শাহী ইমামের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মৌলানা মুহাম্মদ উসমান রেহমানি লুধিয়ানভি। তাঁর মতে, দেশভাগ পাঞ্জাবের স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামোকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। কিন্তু সেই বিভাজনের উত্তরাধিকারকে অতিক্রম করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখনও পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার পথ বেছে নিচ্ছেন।
 
পঞ্জাবের মালারকোটলায় নবনির্মিত মসজিদে সন্ধ্যার নামাজ আদায় করতে সমবেত
 
মৌলানা মুহাম্মদ উসমান রেহমানি লুধিয়ানভি বলেন, “দেশভাগ পাঞ্জাবের স্বাভাবিক সামাজিক বুননকে ছিঁড়ে দিয়েছিল। এই রাজ্য নিজেই একটি বিপ্লব। অনলাইনে মেরুকরণ ও বিভাজন অত্যন্ত প্রকট। কিন্তু বাস্তবে আমাদের গ্রামের সাধারণ মানুষ এখনও একে অপরকে রক্ষা করার পথই বেছে নিচ্ছেন।”
 
পাঞ্জাবের গ্রামগুলিতে মসজিদ পুনর্নির্মাণের এই উদ্যোগ তাই শুধুমাত্র ধর্মীয় উপাসনাস্থল ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া শিকড়ের টান, পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর মানবিক অঙ্গীকার। যে মাটিতে একদিন সাম্প্রদায়িক হিংসা মানুষের জীবন ও সম্পর্ককে বিপর্যস্ত করেছিল, সেই মাটিতেই আজ নতুন করে গড়ে উঠছে বিশ্বাস ও সম্প্রীতির সেতু।


শেহতীয়া খবৰ