৪২০ বছরের ঐতিহ্য! বিখ্যাত পেটকাটি দুর্গার বিসর্জনে নদীর দুই পাড়ে হিন্দু-মুসলিমের জনসমুদ্র, সম্প্রীতির উজ্জ্বল ছবি জঙ্গিপুরে
Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 1 h ago
৪২০ বছরের ঐতিহ্য! বিখ্যাত পেটকাটি দুর্গার বিসর্জনে নদীর দুই পাড়ে হিন্দু-মুসলিমের জনসমুদ্র, সম্প্রীতির উজ্জ্বল ছবি জঙ্গিপুরে
তরুণ নন্দী / কলকাতা
৪০০ বছরেরও পুরোনো এই পুজোর ঐতিহ্য। ‘পেটকাটি দুর্গা’র বিদায়বেলায় নদীর দুই পাড়ে ভিড় জমাল হাজার হাজার হিন্দু-মুসলিম মানুষেরা। ১২ ঘণ্টার বিসর্জনে নৌকাবাইচে মাতল মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর। মধ্যরাত পেরোতেই শুরু হয়েছিল যাত্রা। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিমা নিয়ে বেহারা ও গ্রামবাসীরা পাড়ি দিয়েছিলেন নির্দিষ্ট জায়গায়। তারপর নৌকায় চাপিয়ে আখরি নদী পেরিয়ে ভাগীরথীর পথে যাওয়া হয় প্রতিমা নিয়ে। মানুষের উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও দেবীর বিদায়বেলায় আবেগে চোখ ছলছল করছিল উপস্থিত সকলের।
রাত থাকতেই নিরঞ্জন পর্ব দেখার জন্য নদীর দুই পাড়ে তখন হাজার হাজার মানুষের ভিড় বাড়ছিল। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের চোখ ছিল ৪২০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘পেটকাটি দুর্গা’র বিসর্জনের ছবিটা একবার দেখতে। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের গদাইপুরে এ যেন লোকবিশ্বাস আর সম্প্রীতির এক উজ্বল দৃষ্টান্ত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পুরোনো প্রথা মেনেই একাদশীর সকালে জঙ্গিপুর শ্মশানঘাটে সম্পন্ন হল বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী পুজো পেটকাটি দুর্গার নিরঞ্জন পর্ব। মণ্ডপ থেকে নদীপথ, তারপর বিসর্জন ঘাট, দীর্ঘ ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলল এই নিরঞ্জন। মায়ের বিদায়বেলায় এই দৃশ্যকে নিজের চোখে দেখতে উপচে পড়ল দর্শনার্থীদের ভিড়।
কেন মাকে ‘পেটকাটি দুর্গা’ নামে ডাকা হয়? গদাইপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজোর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে নানা কাহিনিতে। চার শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই পুজো আজও সমানভাবে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। দেবীর বিশেষ পরিচিতি ‘পেটকাটি দুর্গা’ নামে। এই নামের পিছনে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাস রয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলেছে সকলের মধ্যে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজের নানা পরিবর্তনে বদলেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কিন্তু জীবনযাত্রায় আধুনিকতার ছাপ এলেও বদলায়নি এই পুজোর বিসর্জন-পরম্পরা। পুজোর চার দিন ধরে আরাধনার পর দশমীর দিন থেকেই শুরু হয় দেবীর দীর্ঘ বিদায়যাত্রা। আর সেই বিদায়পর্ব ঘিরেই থাকে মানুষের প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা।
নিয়ম মেনে বুধবার রাত প্রায় ১২টা নাগাদ মন্দির থেকে বের করা হয় মুর্শিদাবাদের প্রাচীন পুজোর অন্যতম পেটকাটি দুর্গার প্রতিমা। বেহারা ও গ্রামবাসীদের কাঁধে চাপিয়ে মা দুর্গাকে নিয়ে যাও য়া হয় আখরি নদীর ঘাটে। সেখান থেকে নৌকায় চাপিয়ে প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় ভাগীরথীর পথে, জঙ্গিপুর সদর ঘাটের দিকে। প্রতিমা মণ্ডপ থেকে বের করে নিরঞ্জন পর্ব সম্পন্ন হতে লেগে যায় ১২ ঘণ্টারও বেশি সময়। আর এই দীর্ঘ নিরঞ্জন পর্ব দেখার জন্য নদীর প্রতিটি ঘাটে অপেক্ষা করেন হাজার হাজার নানা ধর্ম বর্নের মানুষ।
বলা ভালো, প্রতি বছরের মত এবারও পেটকাটি দুর্গার বিসর্জনকে ঘিরে জঙ্গিপুর সদর ঘাটে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। আশপাশের এলাকার অন্যান্য দুর্গাপ্রতিমাও এসে পৌঁছয় ঘাটে। বসে মেলা, মানুষের ভিড়ে জমে ওঠে নদীতীর। ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচও এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। নদীর দুই পাড়ে দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস আর বিসর্জন পর্ব, সব মিলিয়ে জঙ্গিপুরের এই দৃশ্য যেন বাংলার নিজস্ব লোকসংস্কৃতির এক অনন্য ছবি। বহু মানুষের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই পুজোকে ঘিরে যেন তৈরি হয় এক সামাজিক মিলনমেলা।
এই বিসর্জনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত এখানেই। দেবীকে বিদায় জানাতে নদীর দুই পাড়ে ভিড় করেন হিন্দু-মুসলিম-সহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। কারও কাছে এটি পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ, কারও কাছে বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ। পেটকাটি দুর্গার নিরঞ্জন পর্বে সবার মধ্যেই রয়েছে একই উৎসাহ, একই অপেক্ষা।
পুজোর কটা দিন যেন কোনও বিভেদের রেখা চোখে পড়ে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পেটকাটি দুর্গার বিসর্জন তাই সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল বার্তাও বহন করে। ৪২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই প্রথা বয়ে চলেছে, তা আজও হাজার হাজার মানুষকে নদীর দুই পাড়ে টেনে আনে। সব মিলিয়ে পেটকাটি দুর্গার বিসর্জন যেন হয়ে উঠেছে বাংলার লোকঐতিহ্যের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।