দেবকিশোর চক্রবর্তী
উড়ন্ত বিমানের দরজা খুলতেই সামনে অসীম নীল আকাশ, নিচে তুলোর মতো সাদা মেঘ। কয়েক সেকেন্ডের প্রস্তুতি, তারপরই শূন্যে ঝাঁপ। ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার গতিতে মুক্ত পতন। নির্দিষ্ট উচ্চতায় প্যারাশুট খুলে নিখুঁতভাবে মাটিতে অবতরণ। এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাই আজ জলপাইগুড়ির ডামডিমের মেয়ে মহিমা ছেত্রীর জীবনের অঙ্গ। আর এই সাহসিকতার জোরেই তিনি ইতিহাস গড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা স্কাইডাইভার হিসেবে।
জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমার ডামডিম গ্রাম পঞ্চায়েতের এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা মহিমার জীবন শুরু হয়েছিল আর পাঁচজনের মতোই। সেনা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা, তারপর আইন নিয়ে স্নাতক। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন জওয়ান এবং পরে রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্সের কর্মী বাবা অর্জুন ছেত্রীর অনুপ্রেরণা তাঁকে সবসময় সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে শিখিয়েছে। সেই সাহসই একদিন তাঁকে নিয়ে যায় অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের অন্যতম কঠিন শাখা, স্কাইডাইভিংয়ের জগতে।
বর্তমানে একটি পেট্রোকেমিক্যাল সংস্থায় সিকিউরিটি এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত মহিমা নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের সময়ই স্কাইডাইভিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। এরপর নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পাড়ি দেন থাইল্যান্ডে। কঠোর আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ শেষে অর্জন করেন 'এ' ক্যাটাগরির স্কাইডাইভিং লাইসেন্স। এই লাইসেন্স পাওয়ার মাধ্যমে তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলা স্কাইডাইভার হিসেবে নতুন ইতিহাস রচনা করেন।
ইতিমধ্যেই মহিমা ১৩ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ৩০টিরও বেশি সফল স্কাইডাইভ সম্পন্ন করেছেন। প্রতিটি জাম্পের আগে দীর্ঘ প্রস্তুতি, আবহাওয়ার বিশ্লেষণ, বিমানের উচ্চতা, বাতাসের গতি, প্যারাশুট নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল আয়ত্ত করতে হয়। কারণ স্কাইডাইভিং এমন একটি খেলা, যেখানে সামান্য ভুলও প্রাণঘাতী হতে পারে। সেই কঠিন পরীক্ষায় প্রতিবারই সফল হয়েছেন বাংলার এই সাহসী তরুণী।তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না।
বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস স্কাইডাইভিংয়ে প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, বিমানের ভাড়া এবং প্রতিটি জাম্পের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। সেই খরচের বড় অংশই বহন করেছেন নিজের উপার্জন থেকে। প্রয়োজন হলে ঋণও নিতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা কখনও তাঁর স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি।
এখন মহিমার লক্ষ্য আরও বড়। তিনি ৫০০টিরও বেশি স্কাইডাইভ সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে চান। সেই লক্ষ্য পূরণে সরকারি ও কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতারও আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
মহিমার এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বকে সম্মান জানাতে সম্প্রতি তাঁর ডামডিমের বাড়িতে গিয়ে সংবর্ধনা দেন মাল বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী বুলু চিক বাড়াইক। পুষ্পস্তবক, সম্মানপত্র এবং শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁর এই অসামান্য সাফল্যকে কুর্নিশ জানানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মহিমা আজ শুধু ডামডিম বা জলপাইগুড়ির নন, তিনি গোটা পশ্চিমবঙ্গের গর্ব।
মহিমা ছেত্রী
বাংলায় অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ইতিহাসে মহিমা ছেত্রীর নাম ইতিমধ্যেই স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। কারণ তিনি শুধু ১৩ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ঝাঁপ দেননি, ভেঙে দিয়েছেন সামাজিক সংকোচ, আর্থিক বাধা এবং অসম্ভবের ধারণাকেও। তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে, সাহস, অধ্যবসায় আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে বাংলার মেয়েরাও বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
আজ মহিমা ছেত্রী শুধু একজন স্কাইডাইভার নন, তিনি বাংলার অসংখ্য তরুণীর কাছে স্বপ্নপূরণের প্রতীক। তাঁর প্রতিটি জাম্প যেন নতুন করে বলে, ইতিহাস কখনও শুধু মাটিতে লেখা হয় না, কখনও কখনও তা লেখা হয় আকাশের বুকেও।