জিআই স্বীকৃতির পর নতুন নজির, বীরভূমের তাঁতিদের বোনা ৩০ ফুটের মসলিনের তিরঙ্গা উড়বে ডিভিসির আকাশে

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 13 h ago
জিআই স্বীকৃতির পর নতুন নজির, বীরভূমের তাঁতিদের বোনা ৩০ ফুটের মসলিনের তিরঙ্গা উড়বে ডিভিসির আকাশে
জিআই স্বীকৃতির পর নতুন নজির, বীরভূমের তাঁতিদের বোনা ৩০ ফুটের মসলিনের তিরঙ্গা উড়বে ডিভিসির আকাশে
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসলিনের সুনাম এবার পৌঁছে গেল জাতীয় গৌরবের অন্যতম প্রতীক তিরঙ্গার বয়নে। পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের উদ্যোগে এবং বীরভূমের দক্ষ তাঁতিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে ৩০ ফুট লম্বা ও ২০ ফুট চওড়া বিশাল মসলিনের জাতীয় পতাকা। ডিভিসি (দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন)-র ৭৯তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বুধবার ১০০ ফুট উঁচু পতাকাদণ্ডে এই বিশেষ তিরঙ্গা উত্তোলন করা হবে।
 
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ৩০০ থেকে ৫০০ কাউন্টের অতিসূক্ষ্ম মসলিন জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার নানা উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই ডিভিসির কাছ থেকে আসে বিশাল আকারের জাতীয় পতাকা তৈরির বরাত। এই দায়িত্ব গ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদ এবং বীরভূমের 'মসলিন তীর্থ' প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁতিরা।
 
প্রতীকী ছবি
 
আজ বীরভূমের সিউড়ির আবদারপুরে খাদি কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকাটি হস্তান্তর করা হয়। জেলার জেলাশাসক ধবল জৈন ভার্চুয়াল মাধ্যমে ডিভিসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর ও অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) সুখময় নায়েকের হাতে এই বিশেষ তিরঙ্গা তুলে দেন। ডিভিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পতাকাটি উত্তোলন করা হবে।
 
এই পতাকা তৈরি মোটেই সহজ কাজ ছিল না। সাধারণ কাপড়ের তুলনায় মসলিন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কোমল। এত বড় আকারে জাতীয় পতাকা তৈরির অভিজ্ঞতা আগে ছিল না কারও। ফলে শুরুতে সংশয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন কাটুনি ও তাঁতিরা। পতাকা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে মোট ছ'টি মসলিন থান, অর্থাৎ প্রায় ১২টি শাড়ির সমপরিমাণ কাপড়। শুধু সুতো তৈরির কাজেই যুক্ত ছিলেন ১২ জন কাটুনি এবং বয়নের দায়িত্ব সামলেছেন ১০ জন দক্ষ তাঁতি। প্রায় দেড় মাস ধরে দিন-রাত পরিশ্রম করে তাঁরা এই অসাধ্য সাধন করেছেন।
 
মসলিন তৈরির প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জটিল। তুলো থেকে সুতো তৈরি, সুতো প্রস্তুত, রং, তাঁতে বসানো, সব মিলিয়ে মোট ১৩টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এত বড় পতাকা ১০০ ফুট উচ্চতায় দীর্ঘ সময় উড়বে, তাই ঝড়-বৃষ্টি, প্রবল হাওয়া এবং রঙের স্থায়িত্বের বিষয়টিও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় পতাকার নির্ধারিত মান বজায় রাখতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের বিশেষজ্ঞদেরও পরামর্শ নেওয়া হয়।
 
জেলাশাসক ধবল জৈন এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, জেলার তাঁতিরা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। প্রথমবার এত বড় মাপের মসলিনের জাতীয় পতাকা তৈরির দায়িত্ব পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ ছিল, কিন্তু শিল্পীদের দক্ষতা ও নিষ্ঠাই সেই আশঙ্কাকে সাফল্যে পরিণত করেছে।
 
প্রতীকী ছবি
 
পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের বীরভূমের জেলা আধিকারিক গোপালকৃষ্ণ বসুর কথায়, ডিভিসির বরাত পাওয়ার পর শুরুতে মনে হয়েছিল কাজটি হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু শিল্পীদের আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। স্পিনিং সুপারভাইজার জ্যোৎস্না দাস এবং উইভিং সুপারভাইজার পরিতোষ দাসও জানান, এই কাজ তাঁদের কাছে শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং দেশের জন্য গর্বের এক দায়িত্ব ছিল।
 
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত বছর জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর বীরভূমের তাঁতিরা জেলা পরিষদের জন্য সেলাইবিহীন একটি মসলিনের জাতীয় পতাকা তৈরি করেছিলেন। সেই কাজের সাফল্য দেখেই ডিভিসি এবার আরও বড় আকারের পতাকার বরাত দেয়। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা দিবসের আগে একই মাপের আরও তিনটি মসলিনের জাতীয় পতাকা তৈরির অর্ডারও দেওয়া হয়েছে।
 
বীরভূমের এই সাফল্য শুধু একটি জাতীয় পতাকা তৈরির গল্প নয়। এটি বাংলার প্রাচীন মসলিন শিল্পের পুনর্জাগরণের প্রতীক, গ্রামীণ কারিগরদের দক্ষতার স্বীকৃতি এবং ‘ভোকাল ফর লোকাল’-এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জেলার তাঁতিদের হাতে বোনা এই তিরঙ্গা তাই শুধু দেশের আকাশেই উড়বে না, বাংলার ঐতিহ্য ও শিল্পসম্ভারের গৌরবও বহন করবে সমান মর্যাদায়।


শেহতীয়া খবৰ