স্রেফ ‘বাংলা’ বলায় সোজা বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’! সুইটি বিবি ও সোনালি বিবির স্বামী সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অনুপ্রবেশকারীর ‘কলঙ্ক’ কাটিয়ে ফিরলেন ভারতে
Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 1 d ago
স্রেফ ‘বাংলা’ বলায় সোজা বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’! সুইটি বিবি ও সোনালি বিবির স্বামী সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অনুপ্রবেশকারীর ‘কলঙ্ক’ কাটিয়ে ফিরলেন ভারতে
তরুণ নন্দী / কলকাতা
অবশেষে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে এল জয়। অনুপ্রবেশের ‘কলঙ্ক’ মুছে আদালতের নির্দেশে এক বছর পর দুই সন্তানকে নিয়ে দেশে ফিরলেন সুইটি বিবি। ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশের জেলে ঠাঁই হয়। অবশেষে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দুই নাবালক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে নিজের মাতৃভূমি অর্থ্যাৎ ভারতের মাটিতে পা রাখলেন বীরভূমের পাইকর গ্রামের বাসিন্দা সুইটি বিবি।
নানা দুর্দশার মধ্য দিয়ে একটা বছর পার করে সুইটি বিবি বুধবার দুপুরে মালদহের মহদিপুর আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। একই গ্রামের দানেশ শেখসহ আরও তিন জন তাঁর সঙ্গে ফিরেছেন। বাংলাদেশ থেকে জেলমুক্তি ঘটে ভারতে ঢুকতেই পরিবার পরিজনদের ফিরে পাওয়ার মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তৈরি হয়ে গেল এক আবেগঘন মুহূর্ত।
সুইটি বিবির স্বামী
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত বছরের ২২ জুন। পরিবার ও পুলিশ সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের পাইকর গ্রাম থেকে পেটের তাগিদে দিল্লিতে ফেরিওয়ালার কাজ করতে গিয়েছিলেন সোনালি বিবি, তাঁর স্বামী দানেশ শেখ এবং প্রতিবেশী সুইটি বিবি। গ্রাম ছেড়ে রাজধানীতে যাওয়ার পিছনের কারণ ছিল অভাবের সংসারে দু-মুঠো অন্নের সংস্থান করা। কিন্তু দিল্লিতে যেতেই সোনালি বিবিদের জীবনে নামে আসে ‘অভিশাপ’। জানা যায়, রাজধানী কাজে গিয়ে স্রেফ ‘বাংলা ভাষায়’ কথা বলার অপরাধে তাঁরা দিল্লি পুলিশের সন্দেহের তালিকায় চলে আসেন।
প্রশাসনিক তৎপরতায় অনুপ্রবেশকারী তকমা গায়ে লাগিয়ে দিয়ে তাঁদের অসম সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ‘পুশ ব্যাক’ করে বাংলাদেশে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ। নিজেদের দেশের মাটিতেই অনুপ্রবেশকারী তকমা জুটে যাওয়ার এই নির্মম পরিহাসে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সংখ্যালঘু পরিবার দুটি। পুশব্যাকের পর বাংলাদেশে গিয়ে ঠাঁই হয়েছিল শ্রীঘরে। কিন্তু নিজেরা চরম খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। তাঁদের স্বসম্মানে দেশে ফিরিয়ে আনতে শুরু হয়েছিল অধিকার রক্ষার মূল লড়াই। প্রথমে কলকাতা হাইকোর্ট এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় এই সর্বশান্ত পরিবার। আইন লড়াইয়ে তাঁদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আইনজীবীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল।
আইনি সব জটিলতা কাটিয়ে গত বছর ডিসেম্বর মাসেই সোনালির ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয়। সোনালি বিবির লড়াইয়ের পথ ধরেই বাকিদের ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে পরিবার। আইনজীবীদের ধারালো সওয়াল সুপ্রিম কোর্টে প্রমাণ করে দিয়েছে তাঁরা অনুপ্রবেশকারী নন, এ দেশেরই বাসিন্দা। দেখা যায়, আদালতের ঐতিহাসিক রায়ের ওপর ভিত্তি করেই বুধবার বাকি চারজনের ফেরার পথ সুগম হয়। সোনালি বিবির স্বামী সহ অনান্যদের ফিরে আসাকে স্বাগত জানিয়ে রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন।
সুইটি বিবি ও দানেশ শেখদের ঘরে ফেরার আনন্দে এখন উৎসবের মেজাজ বীরভূমের পাইকর গ্রামে। তবে এই ঘটনা নিয়ে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভারতীয় নাগরিক পরিচয় যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে বোধহয় এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল। প্রশ্ন উঠছে, স্রেফ ভাষার ওপর ভিত্তি করে কোনো ভারতীয় নাগরিকের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। তবে একথা ঠিক, আইনি লড়াইয়ে সোনালি বিবির এই জয় আগামী দিনে অনুরূপ সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ নজির হয়ে থাকবে।