২০২৭ সালের হজে বাড়তে পারে খরচ! কেন ব্যয়বহুল হচ্ছে পবিত্র যাত্রা, কী বলছে নতুন হজ নীতি?
মালিক আসগর হাশমি / নয়াদিল্লি
২০২৬ সালের হজযাত্রার সময় ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে আলোচনা হয়েছিল, তা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, হজযাত্রা এখন আর আগের মতো সাশ্রয়ী নেই। আপনি যদি ২০২৭ সালে পবিত্র হজে যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে এখন থেকেই আর্থিক বাজেট তৈরি করা প্রয়োজন। এই ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ভারত সরকার নয়, বরং সৌদি আরবে বেড়ে যাওয়া পরিষেবা ব্যয় এবং সেখানে কার্যকর হওয়া নতুন অর্থনৈতিক নীতিগুলিই দায়ী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৭ সালের হজ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের যাত্রীদের জন্য আগের তুলনায় আরও ব্যয়বহুল হতে পারে।
এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিমান জ্বালানির দামের ধারাবাহিক বৃদ্ধি। হজের সময় বিশেষ ফ্লাইটের পাশাপাশি নিয়মিত আন্তর্জাতিক উড়ানও পরিচালিত হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে বিমান সংস্থাগুলিও ভাড়া বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা হজযাত্রীদের ওপরই পড়ে।
আরেকটি বড় কারণ হলো মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান। হজ-সংক্রান্ত অধিকাংশ পরিষেবার মূল্য সৌদি রিয়াল বা মার্কিন ডলারে পরিশোধ করা হয়। যেসব দেশের মুদ্রা ডলারের তুলনায় দুর্বল হয়েছে, সেসব দেশের যাত্রীদের নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই কারণেই ভারতসহ বহু দেশে হজ প্যাকেজের খরচ বাড়তে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার সংসদের ধর্মীয় বিষয়ক কমিটিও সম্প্রতি এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিটির সভাপতি মারোয়ান দাচো স্পষ্টভাবে বলেছেন, সৌদি আরবের মূল্যবৃদ্ধি ও করব্যবস্থা কোনো দেশই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইন্দোনেশিয়ার হজ ও উমরাহ মন্ত্রণালয়ও ব্যয় বৃদ্ধির চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছে, সৌদি আরবে মূল্যবৃদ্ধি, বিমান জ্বালানির ব্যয়, সরকারি পরিষেবার ফি এবং ডলারের বিপরীতে দুর্বল মুদ্রা।
ইতিহাসও প্রমাণ করে, যখনই সৌদি আরব কর বৃদ্ধি করেছে, তখনই বিশ্বজুড়ে হজের ব্যয় বেড়েছে। ২০১৮ সালে সৌদি সরকার হজ ও উমরাহ পরিষেবার ওপর ৫ শতাংশ কর আরোপ করে এবং ২০২০ সালে মূল্য সংযোজন কর (VAT) ১৫ শতাংশে উন্নীত করে। এর ফলে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া এবং বহু আরব দেশে হজ প্যাকেজের মূল্য বেড়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৭ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে।
তবে সব দেশে হজের চূড়ান্ত ব্যয় এক নয়। ইন্দোনেশিয়ার মতো কিছু দেশ নিজেদের নাগরিকদের স্বস্তি দিতে ‘হজ ফান্ড ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’-র মাধ্যমে ভর্তুকি প্রদান করে। অন্যদিকে, অনেক দেশে সম্পূর্ণ ব্যয় সরাসরি যাত্রীদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়। সেখানে হজ ফান্ড ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি হজযাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝার একটি অংশ বহন করে। আবার অনেক দেশে এই পুরো ব্যয় সরাসরি তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়। এই কারণেই দেশভেদে হজ প্যাকেজের দাম ভিন্ন হয়।
প্রতীকী ছবি
এদিকে, কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ২০২৭ সালের নতুন হজ নীতি ঘোষণা করেছেন এবং অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। আগ্রহী যাত্রীরা হজ কমিটি অব ইন্ডিয়ার সরকারি ওয়েবসাইট এবং ‘হজ সুবিধা’ (Haj Suvidha) অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন। সৌদি আরবের নির্ধারিত সময়সীমা মেনে পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ এবং সময়মাফিক করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
ভারত সরকারের নতুন হজ নীতিতে তীর্থযাত্রীদের সুবিধা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবার ভারতীয় হজ কমিটি এবং বেসরকারি হজ অপারেটরদের মধ্যে আসনের অনুপাত হবে ৭০:৩০। হজ কমিটির অধীনে থাকবে ১,২২,৫১৮টি আসন এবং বেসরকারি খাত পাবে ৫২,৫০৭টি আসন। ভারতের হজ কোটা বাড়ানোর জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
মিনায় সোফা-কাম-বেডের ব্যবস্থা, মক্কা ও মদিনার মধ্যে হাই-স্পিড ট্রেন এবং হোটেল-মানের আবাসনের সুবিধা থাকবে। ২০ দিনের ‘শর্ট হজ প্যাকেজ’ও বহাল থাকবে। পূর্ব ভারতের যাত্রীদের সুবিধার্থে কলকাতাকেও নতুন যাত্রা শুরুর কেন্দ্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের হজের চূড়ান্ত অপেক্ষমাণ তালিকার শীর্ষ ২০ শতাংশ আবেদনকারী এবার অগ্রাধিকার পাবেন। পাশাপাশি, রাজ্যভিত্তিক হজ পরিদর্শকের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রতি ১৩৫ জন যাত্রীর জন্য একজন পরিদর্শক নিয়োগ করা হবে (আগে এই অনুপাত ছিল ১৫০:১)। এছাড়া, সৌদি আরবের চিকিৎসা মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। যাত্রাকালে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কঠোর স্ক্রিনিং করা হবে।
এবার প্রথমবারের মতো আবেদনপত্র যাচাই, নথিপত্রের সত্যতা পরীক্ষা, বিমান পরিকল্পনা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং যাত্রী সহায়তার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর ব্যাপক ব্যবহার করা হবে। সরকার এমন একটি AI-ভিত্তিক ডিজিটাল সহায়ক তৈরি করছে, যা হিন্দি, উর্দুসহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় ২৪ ঘণ্টা তথ্য প্রদান করবে। এর ফলে প্রথমবারের হজযাত্রী এবং প্রবীণরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন।
২০২৬ সালের হজ সফলভাবে পরিচালনার জন্য ভারতীয় হজ মিশন সৌদি আরবের হজ ও উমরাহ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুটি ‘লাব্বাইতুম’ পুরস্কার অর্জন করেছে। সেরা সমন্বয় ও যোগাযোগ বিভাগে ভারত প্রথমবারের মতো এই সম্মান পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতীয় হজ ব্যবস্থাপনার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে চিত্রটি স্পষ্ট। ২০২৭ সালের হজের সম্ভাব্য ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ভারত সরকার নয়, বরং সৌদি আরবে পরিষেবা ব্যয়, কর, বিমান জ্বালানির মূল্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই দায়ী। তবে ভারত সরকার আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করেছে এবং যাত্রীদের জন্য একাধিক নতুন সুবিধা যুক্ত করেছে। তাই যারা আগামী বছর পবিত্র হজে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের উচিত সময়মতো আবেদন করার পাশাপাশি সম্ভাব্য বাড়তি ব্যয়ের কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই আর্থিক প্রস্তুতি শুরু করা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: ২০২৭ সালের হজ কেন আরও ব্যয়বহুল হতে পারে?
উত্তর: সৌদি আরবে পরিষেবা ফি, কর, হোটেল ব্যয়, বিমান জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে।
প্রশ্ন: ভারত সরকার কি হজের খরচ বাড়িয়েছে?
উত্তর: না। ব্যয় বৃদ্ধির মূল কারণ সৌদি আরবের অর্থনৈতিক নীতি এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধি।
প্রশ্ন: ২০২৭ সালের হজের জন্য কীভাবে আবেদন করা যাবে?
উত্তর: ‘হজ কমিটি অব ইন্ডিয়া’-র সরকারি ওয়েবসাইট এবং ‘হজ সুবিধা’ (Haj Suvidha) অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করা যাবে।
প্রশ্ন: ২০২৭ সালের হজে কী কী নতুন সুবিধা থাকবে?
উত্তর: হাই-স্পিড ট্রেন, উন্নত আবাসন, শর্ট হজ প্যাকেজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-ভিত্তিক সহায়তা, কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আরও বেশি সংখ্যক হজ পরিদর্শকের সুবিধা পাওয়া যাবে।