নাগপুর / মহারাষ্ট্র
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বিদ্বেষ, বর্ণবৈষম্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের আবহে ভারতের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরতে নাগপুরে অনুষ্ঠিত হল হজরত বাবা তাজউদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর ১০৪তম বার্ষিক উরস মোবারক উপলক্ষে এক বিশেষ সুফি আন্তঃধর্মীয় সম্মেলন। "জাতীয় সংহতি, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং হৃদয়ের সম্প্রীতি", এই মূল ভাবনাকে সামনে রেখে ৮ জুলাই বাবা তাজউদ্দিন দরগাহ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতারা এক মঞ্চে উপস্থিত হন।
উরসের সূচনা হয় ঐতিহ্যবাহী 'পরচম কুশাই' বা পবিত্র পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের এক লক্ষেরও বেশি ভক্ত উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাবা তাজউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ সর্বধর্মের মানুষের কাছে ভালোবাসা, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
সম্মেলনের আয়োজন করে ভারতীয় সর্বধর্ম সংসদ, যার নেতৃত্বে ছিলেন জাতীয় আহ্বায়ক মহর্ষি ভৃগু পীঠাধীশ্বর শ্রী গুরুজি গোস্বামী সুশীলজি মহারাজ। সহযোগিতায় ছিল আজমের শরিফের চিশ্তি ফাউন্ডেশন, যার প্রতিনিধিত্ব করেন দরগাহ আজমের শরিফের গাদ্দি নশিন হাজি সৈয়দ সালমান চিশ্তি। আয়োজক ছিল বাবা তাজউদ্দিন আউলিয়া ট্রাস্ট, যার চেয়ারম্যান জনাব পিয়ারে জিয়া খান এবং সম্পাদক জনাব তাজ আহমেদ।
সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাজি সৈয়দ সালমান চিশ্তি বলেন, বর্তমান বিশ্ব যখন যুদ্ধ, বর্ণবিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক স্বার্থে মানবিক মূল্যবোধের অপব্যবহারের সংকটে রয়েছে, তখন ভারত সুফি সাধক, গুরু, যোগী এবং আল্লাহর অলিদের শিক্ষা, "সবার প্রতি ভালোবাসা, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়", এই চিরন্তন আদর্শের মাধ্যমে বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে। তাঁর কথায়, বাবা তাজউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি সম্প্রীতির এক জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে সব ধর্মের মানুষের হৃদয় একই সুরে স্পন্দিত হয়।
ভারতীয় সর্বধর্ম সংসদের জাতীয় আহ্বায়ক শ্রী গুরুজি গোস্বামী সুশীলজি মহারাজ বলেন, "এসো, আমরা একসঙ্গে চলি। প্রতিটি ধর্মই একই মহাসাগরের দিকে প্রবাহিত একটি নদী। নাগপুরের এই পবিত্র ভূমি থেকে আমরা সমগ্র দেশে জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিতে চাই।"
আচার্য সুশীল মুনি মিশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি যোগ মনীষী আচার্য শ্রী বিবেক মুনি মহারাজ বলেন, অহিংসা ও ভালোবাসাই সব ধর্মের চিরন্তন ভিত্তি। সাধু-সন্তদের মিলন মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।
দিল্লি শিখ গুরুদ্বারা ম্যানেজমেন্ট কমিটির প্রধান উপদেষ্টা এবং গুরুদ্বারা বাংলা সাহিবের প্রাক্তন সভাপতি পরমজিৎ সিং চাঁদোখ বলেন, গুরু নানক দেবজি শিখিয়েছিলেন, সকলের মধ্যেই একই ঈশ্বরীয় আলো বিরাজমান। বাবা তাজউদ্দিনের দরগায় সেই আলোরই প্রতিফলন দেখা যায়।
অখিল ভারতীয় রবিদাসিয়া ধর্ম সংগঠনের জাতীয় মুখপাত্র স্বামী বীর সিং হিতকারীজি মহারাজ বলেন, সন্ত রবিদাসজির স্বপ্নের ‘বেগমপুরা’ ছিল দুঃখহীন সমাজ। এই ধরনের আন্তঃধর্মীয় উদ্যোগ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকেই এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ভারত-তিব্বত সহযোগ মঞ্চের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আচার্য ইয়েশি ফুন্টসক বলেন, করুণাই সর্বজনীন ধর্ম। হিমালয় থেকে নাগপুর, সব জায়গায় একই বার্তা, সকল প্রাণীর কল্যাণ এবং সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা।
হায়দ্রাবাদ থেকে যোগ দিয়ে সৈয়দ আলি মুস্তাফা কাদরি মুসাভি বলেন, দাক্ষিণাত্যের আউলিয়া ও নাগপুরের আউলিয়ারা একই ভাষায় কথা বলেন, সেই ভাষা হলো ঈশ্বরীয় প্রেমের ভাষা।
অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বাবা তাজউদ্দিন আউলিয়া ট্রাস্টের চেয়ারম্যান জনাব পিয়ারে জিয়া খান বলেন, "বাবা তাজউদ্দিন আউলিয়া সমগ্র মানবজাতির। দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের এই পবিত্র অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাতে পেরে আমরা গর্বিত।" ট্রাস্টের সম্পাদক জনাব তাজ আহমেদ লক্ষাধিক ভক্ত এবং প্রশাসনের প্রতি সফল আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সম্মেলনের আগে প্রতিনিধিদল নাগপুরের ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর স্মারক, দীক্ষাভূমি-তে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং সংবিধানের ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মূল্যবোধ রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনে সুফি সাধক, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিনিধির বক্তব্যের পাশাপাশি ভারতের সমন্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে কাওয়ালি পরিবেশন করা হয়। শেষ পর্যন্ত উপস্থিত প্রতিনিধিরা একসুরে ঘোষণা করেন, ঐক্যই শক্তি, আর মানবতা, সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞাই বিভাজন ও সংঘাতমুক্ত বিশ্বের একমাত্র পথ।