দুবাইয়ের স্বাদ এবার গুয়াহাটিতে! আরবীয়ান রন্ধনশৈলীর অনন্য জগৎ তুলে ধরছেন উদ্যোক্তা শাকিবা মহম্মদ
মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি
একটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং জীবনধারার অন্যতম পরিচয় বহন করে সেই দেশের খাদ্যভাণ্ডার। বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষ শুধু নতুন দেশ বা সংস্কৃতির প্রতিই নয়, নতুন নতুন খাবারের স্বাদের প্রতিও সমানভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে খেজুর, জাফরান, অলিভ অয়েল, পিস্তাচিও এবং সুগন্ধি মসলার অনন্য সংমিশ্রণে মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্যসংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। হাজার বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই রন্ধনশৈলী শুধু সুস্বাদু খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অতিথি আপ্যায়ন, পারিবারিক বন্ধন এবং সংস্কৃতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
গত কয়েক বছরে ভ্রমণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের মাধ্যমে আরবীয়ান খাবারের জনপ্রিয়তা ভারতের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি অসমেও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শাওয়ার্মা, মান্দি, কাবসা, পার্সিয়ান রাইস, আদানা কাবাব, বাকলাভা এবং কুনাফার মতো সুস্বাদু খাবার এখন বহু খাদ্যরসিকের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহের মধ্যেই গুয়াহাটির এক মহিলা উদ্যোক্তা দুবাইয়ে অর্জিত দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অসমে আরবীয়ান খাবারের স্বাদ ও সংস্কৃতিকে আরও বিস্তৃত করার এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুরু করেছেন। তিনি হলেন গুয়াহাটি মহানগরীর পাঞ্জাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা শাকিবা মহম্মদ।
'আওয়াজ–দ্য ভয়েস'-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শাকিবা মহম্মদ বলেন, "আমি প্রায় ১১ বছর দুবাইয়ে ছিলাম। সেখানে থাকার সময় শুধু আরবীয়ান খাবার উপভোগই করিনি, বরং এর প্রস্তুত প্রণালী, মসলার ব্যবহার এবং খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। অসমে ফিরে আসার পর উপলব্ধি করি, এই ব্যতিক্রমী খাদ্যসংস্কৃতিকে এখানকার মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আমি বাড়িতেই কিছু আরবীয়ান খাবার ও মিষ্টি তৈরি করা শুরু করি। প্রথমে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের জন্য বাকলাভা, কুনাফা, পার্সিয়ান রাইস, মান্দি ইত্যাদি তৈরি করতাম। ধীরে ধীরে সেই খাবারের স্বাদ অনেকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। গুয়াহাটির মানুষের আন্তর্জাতিক ধরনের নতুন খাবারের প্রতি আগ্রহ দেখে বুঝতে পারি, এই ক্ষেত্রটিকে ব্যবসায়িকভাবেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।"
শাকিবা জানান, আরবীয়ান খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর পরিমিত মসলার ব্যবহার এবং উৎকৃষ্ট মানের উপাদান। অনেকেই মনে করেন, আরবীয়ান খাবার মানেই অতিরিক্ত মসলা বা তেলযুক্ত খাবার। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এই খাবারে মসলার পরিমাণের চেয়ে সুগন্ধ এবং উপাদানের গুণগত মানের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কাবসা রাইস
শাকিবা মহম্মদ বলেন, "অনেকেই আরবীয়ান খাবার বলতে শুধু শাওয়ার্মা বা মান্দির নাম জানেন। কিন্তু আরবীয়ান রন্ধনজগৎ এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্যভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মান্দি (Mandi), কাবসা রাইস (Kabsa Rice), মাচবুস (Machboos), পার্সিয়ান রাইস (Persian Rice), শাওয়ার্মা (Shawarma), হুমুস (Hummus), ফালাফেল (Falafel), মুতাব্বাল (Moutabal), তাব্বুলেহ (Tabbouleh) এবং ফাত্তুশ (Fattoush)-এর মতো জনপ্রিয় খাবারের পাশাপাশি বাকলাভা (Baklava), কুনাফা (Kunafa), বাসবুসা (Basbousa), উম্ম আলি (Umm Ali), খাবুজ, পিটা ব্রেড এবং মামুল (Maamoul)-এর মতো ঐতিহ্যবাহী খাবারও অত্যন্ত জনপ্রিয়।"
সাধারণত আরবীয়ান খাবারে অলিভ অয়েল, উৎকৃষ্ট মানের বাটার, ঘি, বাসমতি চাল, জাফরান, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, ধনে, প্যাপরিকা, গোলমরিচ, শুকনো লেবু (Dried Lime), জা'আতার (Za'atar), সুমাক (Sumac), বাহারাত (Baharat), অরেঞ্জ ব্লসম ওয়াটার, রোজ ওয়াটার, তাহিনি, পিস্তাচিও, আমন্ড, আখরোট, খেজুর, পাইন নাটস এবং ফিলো পেস্ট্রির মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়। এগুলোই খাবারে অনন্য সুগন্ধ এবং গভীর স্বাদ এনে দেয়।
বাকলাভা ও বাসবুসা
শাকিবা মহম্মদ বলেন, "অসমীয়া এবং আরবীয়ান খাদ্যসংস্কৃতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। অসমীয়া খাবারে সাধারণত সরিষার তেল, খার, টক, মাছ, শাকসবজি এবং স্থানীয় উপাদানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। খাবারের প্রাকৃতিক স্বাদ অক্ষুণ্ণ রাখাই অসমীয়া রন্ধনশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে, আরবীয়ান খাবারে অলিভ অয়েল, সুগন্ধি মসলা, ড্রাই ফ্রুটস, বাদাম এবং ধীরে ধীরে রান্না করা মাংসের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ঈদ, বিয়ে বা পারিবারিক উৎসবে বৃহৎ পরিসরে অতিথি আপ্যায়নের জন্য বিশেষ খাবার প্রস্তুত করা মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।"
অসমে আরবীয়ান খাবার প্রস্তুতের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শাকিবা বলেন, "আরবীয়ান খাবার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান গুয়াহাটির বাজারে সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত অরেঞ্জ ব্লসম ওয়াটার, ফিলো পেস্ট্রি, উন্নতমানের পাইন নাটস, উৎকৃষ্ট মানের অলিভ অয়েল, পিস্তাচিও, জাফরান, জা'আতার, সুমাক এবং বাহারাতের মতো মসলা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনলাইনের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে খাবার তৈরির খরচও যথেষ্ট বেড়ে যায়।"
আদানা কাবাব ও শাওয়ার্মা
বিশেষ করে বাকলাভা এবং কুনাফার মতো মিষ্টি তৈরি করা বেশ ব্যয়বহুল। শাকিবা বলেন, "এই মিষ্টিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ড্রাই ফ্রুটস, বিশুদ্ধ বাটার, পিস্তাচিও, আমন্ড, আখরোট, মধু এবং বিশেষ ফিলো পেস্ট্রি ব্যবহার করা হয়। এই সব উপাদানের দাম বেশি হওয়ায় এগুলোর প্রস্তুত খরচও অনেক বেশি হয়।"
বর্তমানে শাকিবা 'বেক ট্রি' নামে একটি ইনস্টাগ্রাম পেজ এবং একই নামে একটি ক্লাউড কিচেনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বেকারি সামগ্রী ও বিশেষ খাবারের অর্ডার গ্রহণ করছেন। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, কর্পোরেট অনুষ্ঠান কিংবা ৪০–৫০ জন বা তারও বেশি মানুষের জন্য ক্যাটারিং পরিষেবাও দিয়ে আসছেন। ভবিষ্যতে তিনি তাঁর ক্যাটারিং মেনুতে আরও বেশি সংখ্যক আরবীয়ান খাবার যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছেন। পাশাপাশি কলাকৃতি সংঘের উদ্যোগে আরবীয়ান রান্নার একটি বিশেষ কুকিং ক্লাস আয়োজনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জনপ্রিয় খাবার এবং মিষ্টি হাতে-কলমে তৈরি করার কৌশল শিখতে পারবেন।
পার্সিয়ান রাইস
শাকিবা বিশ্বাস করেন, অসমের খাদ্যরসিকরা সবসময় নতুন স্বাদকে সাদরে গ্রহণ করেন। সঠিক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত উপাদান এবং আগ্রহ থাকলে আরবীয়ান খাবারও অদূর ভবিষ্যতে অসমের খাদ্যসংস্কৃতির একটি সুপরিচিত অংশ হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় খাদ্যের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখেই বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের স্বাদকে আপন করে নেওয়ার এই উদ্যোগ অসমের খাদ্যশিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিতে পারে।
উল্লেখ্য, ছোটবেলা থেকেই রান্নার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল শাকিবার। তিনি তাঁর শৈশব দিদার সঙ্গে শিলংয়ে কাটিয়েছেন এবং দিদার কাছ থেকেই রান্না শিখেছেন। পড়াশোনা চলাকালীনই কেক, কুকিজসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যের অর্ডার পেতে শুরু করেন। বিয়ের পর ২০০০ সালে তিনি দুবাইয়ে যান। পরে ২০১১ সালে অসমে ফিরে এসে গ্রাহকদের ভালোবাসা ও উৎসাহে আবারও বেকারির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করার কাজ শুরু করেন।
মটন লেগ রোস্ট
নিজের সন্তান, স্বামী এবং মায়ের প্রতি দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার পাশাপাশি তিনি বহু রান্নার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। তিনি মাস্টারশেফ সিজন–৩-এও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া 'প্রিয় বন্ধু'-র কেক প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কার, জি প্লাস-এর হোম বেকার প্রতিযোগিতায় টপ–৩ প্রতিযোগীর স্থান এবং ব্লু প্যারাডাইস-এর রান্নার প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। শাকিবার বিশ্বাস, প্রতিভা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রত্যেক নারীই স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেন।