সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে, আসক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই: গুয়াহাটিতে ব্রিকসের মাদকবিরোধী সম্মেলনের তাৎপর্য

Story by  Pallab Bhattacharyya | Posted by  Aparna Das • 14 h ago
সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে, আসক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই: গুয়াহাটিতে ব্রিকসের মাদকবিরোধী সম্মেলনের তাৎপর্য
সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে, আসক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই: গুয়াহাটিতে ব্রিকসের মাদকবিরোধী সম্মেলনের তাৎপর্য
 
  পল্লব ভট্টাচার্য

মাদক পাচার আজ আর কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি সীমান্ত, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ৬–৭ জুলাই গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ব্রিকসভুক্ত ১১টি দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধানদের (Heads of Anti-Drug Agencies Meeting) গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের অধীনে নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (NCB) আয়োজিত এই সম্মেলন শুধু একটি কূটনৈতিক বা বহুপাক্ষিক বৈঠক নয়, বরং আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তার একটি শক্তিশালী বার্তা।
 
বর্তমানে অরক্ষিত সীমান্ত, এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন এবং গোপন রাসায়নিক গবেষণাগারের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য পরিবার, দুর্বল হয়ে পড়ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং হুমকির মুখে পড়ছে জাতীয় নিরাপত্তা। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার এবং বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’-এর নিকটবর্তী হওয়ায় সম্মেলনের স্থান হিসেবে গুয়াহাটিকে বেছে নেওয়াও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, সমস্যার সবচেয়ে তীব্র প্রভাব যেখানে পড়ছে, সেখান থেকেই এর বিরুদ্ধে সম্মিলিত লড়াই শুরু করতে হবে।
 
গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের মাদকবিরোধী সংস্থাগুলির প্রধানদের বৈঠকের একটি মুহূর্ত
 
দুই দিনের এই সম্মেলনের কাঠামো বর্তমান সময়ের মাদক সমস্যার বহুমাত্রিক জটিলতাকেই প্রতিফলিত করে। এর মূল ভিত্তি তিনটি কৌশলগত অগ্রাধিকার, সিন্থেটিক মাদক এবং প্রিকার্সর রাসায়নিকের অপব্যবহার রোধ, সদস্য দেশগুলির মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি ও যৌথ অভিযান আরও শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। এই লক্ষ্যগুলিকে সামনে রেখে ছয়টি বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে তাৎক্ষণিক মাদক আটকাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, ডার্কনেটভিত্তিক পাচার, নতুন ধরনের সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থ, বৈশ্বিক প্রিকার্সর সরবরাহ শৃঙ্খলের সুরক্ষা, মাদকের চাহিদা কমানোর নতুন পদ্ধতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে।
 
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন নজরদারি, সাইবার ফরেনসিক, ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্র্যাকিং, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য এবং সমন্বিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। একই সঙ্গে মাদকের চাহিদা হ্রাস এবং পুনর্বাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, মাদকাসক্তিকে শুধুমাত্র অপরাধ হিসেবে নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
 
এই সম্মেলন ভারতের সদ্য ঘোষিত ‘ভিশন ডকুমেন্ট অন নারকোটিক্স কন্ট্রোল ২০২৬–২০২৯’-এরও পরিপূরক। এই নীতিপত্রে কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রিকার্সর রাসায়নিক ও সিন্থেটিক মাদকের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সম্প্রসারণ এবং নারকো কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের মাধ্যমে উন্নত সমন্বয়ের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
 
গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের মাদকবিরোধী সংস্থাগুলির প্রধানদের বৈঠকের একটি মুহূর্ত
 
ভারতের মাদকবিরোধী অভিযান ইতোমধ্যেই রেকর্ড পরিমাণ মাদক জব্দ, দোষীদের বিরুদ্ধে বাড়তি সাজা এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের আর্থিক তদন্তের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ফল দিয়েছে। তবে সরকার সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছে যে, শুধুমাত্র গ্রেফতার বা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়। একটি পাচারচক্র ভেঙে দিলেও, যদি আসক্তির কারণে বাজারের চাহিদা অব্যাহত থাকে, তবে নতুন চক্র গড়ে উঠতে সময় লাগে না। তাই গুয়াহাটির এই বৈঠক কেবল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ নয়, একই সঙ্গে চাহিদা কমানোর ওপর জোর দিয়ে একটি সমন্বিত কৌশলের সূচনা করছে।
 
জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে মাদকাসক্তিকে বিশ্বজুড়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে; এটি কেবল অপরাধ বা নৈতিক ব্যর্থতা নয়। মাদকের ক্ষতি শুধু অতিরিক্ত মাত্রায় সেবনের ফলে মৃত্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়। অনিরাপদ ইনজেকশন ব্যবহারের মাধ্যমে এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি-এর সংক্রমণ বাড়ায়, মানসিক রোগকে তীব্র করে, হৃদ্‌রোগ ও স্নায়বিক সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, কর্মক্ষমতা কমায়, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যাহত করে এবং পরিবারকে ভেঙে দেয়।
 
বিশেষ করে নাইটাজিনস (Nitazenes)-এর মতো অত্যন্ত শক্তিশালী সিন্থেটিক ওপিওয়েড এবং নতুন সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এসব পদার্থ প্রায়ই গোপন ল্যাবরেটরিতে পরিবর্তিত রাসায়নিক সংমিশ্রণে তৈরি হয়, যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে ব্যবহারকারীদের অনিশ্চিত এবং অনেক সময় প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। তাই প্রতিটি মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু একজন রোগী নন; তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের মানসিক যন্ত্রণা, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক কলঙ্ক।
 
গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা
 
এই কারণেই পুনর্বাসনকে আধুনিক মাদকনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। শুধু ডিটক্সিফিকেশন বা স্বল্পমেয়াদি কাউন্সেলিংয়ের মধ্যেই পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শেষ হওয়া উচিত নয়। প্রকৃত পুনর্বাসনের অর্থ হলো শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদার মাধ্যমে একজন মানুষকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বেকারত্ব, সামাজিক বঞ্চনা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পুনরায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই দক্ষতা উন্নয়ন ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কোনো অতিরিক্ত কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; বরং সফল মাদক নিয়ন্ত্রণ নীতির অপরিহার্য অংশ। প্রতিটি নেশামুক্তি কর্মসূচির সঙ্গে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, জীবনদক্ষতা শিক্ষা, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ যুক্ত করা উচিত।
 
কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ডিজিটাল পরিষেবা, নির্মাণ, আতিথেয়তা, উৎপাদন, হস্তশিল্প কিংবা উদীয়মান প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে পুনর্বাসিত ব্যক্তিরা আর্থিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক আত্মবিশ্বাস ফিরে পান, যা দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাগুলিকে পুনর্বাসিত ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে এগিয়ে আসতে হবে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সহজ ঋণ ও পরামর্শের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।
 
ভারত ইতোমধ্যেই ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর ড্রাগ ডিমান্ড রিডাকশন এবং নেশা মুক্ত ভারত অভিযান-এর মাধ্যমে উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ নিয়েছে। সারা দেশে শত শত নেশামুক্তি কেন্দ্র চালু হয়েছে, সচেতনতা কর্মসূচি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং জাতীয় নেশামুক্তি হেল্পলাইন চিকিৎসা পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। স্বেচ্ছায় চিকিৎসা নিতে এগিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা এই উদ্যোগগুলির প্রতি জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধিরই প্রমাণ। তবে পরবর্তী ধাপে জোর দিতে হবে পরিষেবার মান, সহজলভ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর। নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলিকে এমন সমন্বিত পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষক এবং কর্মসংস্থান সংস্থাগুলি একসঙ্গে কাজ করবে।
 
গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা
 
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। পর্তুগাল দেখিয়েছে, আসক্তির সঙ্গে যুক্ত অপরাধমূলক কলঙ্ক কমিয়ে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ালে অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক সেবনে মৃত্যু, এইচআইভি সংক্রমণ এবং কারাবন্দির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। থাইল্যান্ড স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সহায়তায় কমিউনিটি-ভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা চিকিৎসার পরও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তরের (UNODC) ScaleUp উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে উত্তেজক মাদকের আসক্তির কার্যকর চিকিৎসা দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
 
অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার সঙ্গে কমিউনিটি-ভিত্তিক পুনর্বাসনের সমন্বয়ে চীনের অভিজ্ঞতাও চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। যদিও কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নয়, তবে সব অভিজ্ঞতাই একটি বিষয় স্পষ্ট করে, মাদকাসক্তিকে মূলত স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলে কেবল কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি স্থায়ী ফল পাওয়া যায়।
 
গুয়াহাটির এই সম্মেলন মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককেও তুলে ধরেছে। বর্তমানে মাদক পাচারের অর্থ সংগঠিত অপরাধচক্র, জঙ্গি কার্যকলাপ, সন্ত্রাসবাদ, অর্থপাচার এবং দুর্নীতিকে শক্তিশালী করছে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অঞ্চলে মাদক উৎপাদন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, অরক্ষিত সীমান্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনপদ সংগঠিত পাচারচক্রের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে অসম একদিকে যেমন মাদক পাচারের করিডর, তেমনি এই লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
 
তাই সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু নিয়মিত পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি, গোপন ল্যাব ধ্বংস, প্রিকার্সর রাসায়নিকের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ সম্পদের আর্থিক তদন্ত, সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং শুল্ক, গোয়েন্দা, আর্থিক নিয়ন্ত্রক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়। একই সঙ্গে অবৈধ চাষ ও পাচারের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
ঠিক এই জায়গাতেই ব্রিকস একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশ্বের প্রধান মাদক উৎপাদক, পাচারপথ এবং ভোক্তা অঞ্চলগুলিকে একত্রিত করে এই জোট মানবজাতির দুই-পঞ্চমাংশেরও বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রযুক্তি, আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য, প্রিকার্সর নিয়ন্ত্রণ, সাইবার ফরেনসিক এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সদস্য দেশগুলির সম্মিলিত দক্ষতা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে। রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি স্থায়ী ব্রিকস অ্যান্টি-ড্রাগ লিয়াজোঁ অফিসার্স মেকানিজম গঠন করা হলে যৌথ অভিযান আরও কার্যকর হবে।
 
নতুন সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থ শনাক্ত ও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে একটি যৌথ আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সাইবার তদন্ত, আর্থিক ফরেনসিক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডার্কনেট নজরদারির ওপর যৌথ প্রশিক্ষণ সদস্য দেশগুলির সক্ষমতা আরও বাড়াবে। পাশাপাশি পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও ব্রিকসের উচিত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা পদ্ধতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পুনর্বাসন মডেল নিয়ে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যা বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির জন্য উপযোগী সমাধান তৈরি করবে।
 
সবশেষে, গুয়াহাটির এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণাপত্রের সৌন্দর্যের ওপর নয়, বরং তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। মাদক নিয়ন্ত্রণের লড়াই শুধু থানা বা আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এটি পৌঁছাতে হবে বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, পরিবার এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে। স্কুল থেকেই প্রতিরোধমূলক শিক্ষা শুরু করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাকে নেশামুক্তি চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। প্রযুক্তিকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে কাজে লাগাতে হবে, তবে মানবাধিকারের প্রতি সম্মান বজায় রেখেই।
 
সরকারকে যেমন মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, তেমনি আসক্ত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, সুযোগ এবং পুনর্বাসনের পথও খুলে দিতে হবে। পুনর্বাসনের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু নেশামুক্ত জীবন নয়, বরং একজন উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও যেন কেবল আনুষ্ঠানিক বৈঠকে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাস্তব ফল নিশ্চিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধানদের বৈঠক এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসেছে। এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ভারত দেশে মাদকবিরোধী লড়াইকে আরও জোরদার করছে, নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলছে এবং বিশ্বজুড়ে এই উপলব্ধি বাড়ছে যে, মাদকাসক্তি ও মাদক পাচার, দুটিই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত সমস্যা, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
 
যদি গুয়াহাটি এই সম্মেলনের মাধ্যমে যৌথ উদ্বেগকে দীর্ঘমেয়াদি সম্মিলিত পদক্ষেপে রূপ দিতে সক্ষম হয়, তবে তা প্রমাণ করবে যে মাদকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ নয়; বরং আরও শক্তিশালী সমাজ, যে সমাজ সতর্কতার সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা করে, সচেতনতার মাধ্যমে সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত রাখে এবং সহমর্মিতা, সুযোগ ও আশার মাধ্যমে নাগরিকদের পাশে দাঁড়ায়।
 
(লেখক অসম সরকারের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিচালক; অসম লোকসেবা কমিশনের প্রাক্তন সভাপতি এবং 'আওয়াজ- দ্য ভয়েস অসম'-এর প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা)


শেহতীয়া খবৰ