বিদেশি নাগরিকত্বের মোহ, বিপদে পাশে দাঁড়াল ভারত! কাতার বিমানবন্দরে ১৫ দিন ধরে আটকে প্রাক্তন ভারতীয় নারী
আওয়াজ দ্য ভয়েস / নয়াদিল্লি
চকচকে বিদেশি নাগরিকত্ব, উন্নত জীবনের স্বপ্ন আর কোটি টাকার বিনিয়োগ, সবকিছুই মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যেতে পারে, যদি বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ না থাকে। সেই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ এখন কাতারের রাজধানী দোহা। সেখানে গত ১৫ দিন ধরে হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে রয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক নারী। বৈধ পাসপোর্ট না থাকায় কাতারের কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিমানবন্দর ছেড়ে শহরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। অথচ যে দেশের নাগরিকত্ব পেতে তিনি বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন, সেই দেশই সংকটের সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বিপরীতে, মানবিকতার পরিচয় দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে ভারত সরকার।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই সংকটের সময় সেই দেশই তাঁর দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছে, যার নাগরিকত্ব তিনি বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন। অন্যদিকে, মানবিকতার পরিচয় দিয়ে ভারত সরকার নিজের প্রাক্তন এই নাগরিককে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
নাজনিন মোহাম্মদ
এই ঘটনাটি ‘বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব’ (Citizenship by Investment) প্রকল্পের ঝুঁকি এবং নিজের মাতৃভূমির গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। উন্নত ভবিষ্যৎ এবং বিদেশের চাকচিক্যের আশায় অনেকেই ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। কিন্তু সংকটের সময়ই বোঝা যায়, কোন দেশ সত্যিই পাশে দাঁড়ায় আর কোন দেশ শুধু অর্থের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে।
কী এই পুরো ঘটনা?
মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা প্রায় ৫০ বছর বয়সি নাজনিন মোহাম্মদের কাছে কাতারের বৈধ রেসিডেন্স পারমিট (কাতার আইডি) রয়েছে। তাঁর স্বামী ইমতিয়াজ মালিক কাতার এয়ারওয়েজে কর্মরত। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের পরিবার দোহায় বসবাস করছে। ২০০২ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এই দম্পতির তিন ছেলে, উজায়ের, ওমর এবং ওয়াইস। তাঁদের মধ্যে দুই ছেলে তুরস্কের নাগরিক, আর একজন এখনও ভারতীয় নাগরিক।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কয়েক বছর আগে নাজনিন ও ইমতিয়াজ একটি বড় সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা স্বেচ্ছায় ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। নাজনিনের আগের ভারতীয় পাসপোর্ট নম্বর ছিল Z3286473 এবং তাঁর স্বামীর ভারতীয় পাসপোর্ট নম্বর ছিল Y9170771। এরপর তাঁরা তুরস্কে বিনিয়োগ করে সেখানকার নাগরিকত্ব অর্জন করেন।
তুরস্কে বিনিয়োগই কাল, শুরু হলো বিপদ
২০২২ সালে এই দম্পতি তুরস্কে একটি সম্পত্তি কিনেছিলেন। তাঁদের দাবি, সম্পূর্ণ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এই বিনিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা বুঝতেই পারেননি যে তাঁরা একটি বড় প্রতারণার শিকার হয়েছেন। যে প্রকল্পে তাঁরা বিনিয়োগ করেছিলেন, সেই প্রকল্পের ডেভেলপার একটি অপরাধমূলক তদন্তের আওতায় ছিল। পরে তুরস্কের পুলিশ ওই ডেভেলপারকে গ্রেফতার করে এবং সরকার সম্পত্তিটিও বাজেয়াপ্ত করে।
এই আইনি জটিলতা মেটাতে গত ১৬ জুন নাজনিন ও তাঁর স্বামী তুরস্কে যান। সেখানে তাঁরা একজন আইনজীবীও নিয়োগ করেন, যাতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেশ করে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন। কিন্তু ইস্তাম্বুলে পৌঁছানোর পরই তাঁদের জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। তুরস্কের কর্তৃপক্ষ কোনো স্পষ্ট কারণ না জানিয়েই তাঁদের দুজনের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে।
নাজনিন মোহাম্মদের পাসপোর্ট
স্বামী কারাগারে, স্ত্রীকে করা হলো ডিপোর্ট
পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়ার পর তুরস্ক প্রশাসন স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করে দেয়। তাঁদের দুটি পৃথক আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ইমতিয়াজ মালিক এখনও তুরস্কের কারাগারে বন্দি রয়েছেন। অন্যদিকে, ১৭ জুন নাজনিনকে পাসপোর্ট ছাড়াই দোহায় ডিপোর্ট করা হয়। তাঁর কাছে কাতারের আইডি থাকায় তাঁকে তুরস্ক থেকে কাতারগামী বিমানে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়।
কিন্তু প্রকৃত বিপদ শুরু হয় কাতারে পৌঁছানোর পর। ১৭ জুন থেকে নাজনিন হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই আটকে রয়েছেন। কাতারের নিয়ম অনুযায়ী শহরে প্রবেশের জন্য বৈধ ভ্রমণ নথি অর্থাৎ পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক। পাসপোর্ট না থাকায় কাতারের কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিমানবন্দর ছেড়ে বাইরে যেতে দিচ্ছে না।
তুরস্ক সরকারের উদাসীন মনোভাব
এই পুরো ঘটনায় তুরস্ক সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক। বিনিয়োগের নামে অর্থ গ্রহণ করে নাগরিকত্ব দিলেও, আইনি সংকটে নিজেদের নাগরিকদের পাশে দাঁড়ায়নি তারা। নাজনিন ও তাঁর স্বামীকে আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার যথাযথ সুযোগও দেওয়া হয়নি।
বরং তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা স্পষ্ট করে যে, কিছু দেশের কাছে নাগরিকত্ব কেবল একটি ব্যবসায়িক চুক্তি। নতুন নাগরিকদের মানবাধিকার বা নিরাপত্তার প্রতি তাদের তেমন কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন নাজনিন
বিমানবন্দরে আটকে থাকার কারণে নাজনিনের শারীরিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। তিনি একাধিক গুরুতর রোগে আক্রান্ত। সম্প্রতি তাঁর পেটে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এছাড়া তিনি উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড এবং ডায়াবেটিসে ভুগছেন। দীর্ঘদিন বিমানবন্দরে আটকে থাকায় তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা পাচ্ছেন না।
অন্যদিকে, দোহায় থাকা তাঁর সন্তানদের অবস্থাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর দুই নাবালক ছেলে বর্তমানে দোহায় একাই রয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন অটিজমে আক্রান্ত এবং নিয়মিত থেরাপি ও বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। অন্য ছেলে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার মানসিক চাপ তার পড়াশোনাকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। এই পরিস্থিতিতে দুই সন্তানই গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছে।
সংকটে ত্রাতা ভারতীয় দূতাবাস
তুরস্ক সরকারের কাছ থেকে কোনো সহায়তা না পেয়ে নাজনিন মানবিক কারণে দোহায় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের দ্বারস্থ হন। বর্তমানে তিনি ভারতীয় নাগরিক নন, আইনগতভাবে তিনি তুরস্কের নাগরিক। তবুও ভারতীয় দূতাবাস তাঁর পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে।
ভারতীয় দূতাবাস অবিলম্বে বিষয়টি নয়াদিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) নজরে আনে। মানবিক দৃষ্টিকোণ এবং নাজনিনের ক্রমাবনতিশীল শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে ভারত সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সূত্রের খবর, বিদেশ মন্ত্রকের নির্ধারিত কিছু শর্ত ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ভারতীয় দূতাবাস চলতি সপ্তাহেই নাজনিনকে একটি 'ইমার্জেন্সি সার্টিফিকেট' (জরুরি ভ্রমণ সনদ) দেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করছে। এটি একটি অস্থায়ী ভ্রমণ নথি, যার মাধ্যমে তিনি দোহা বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে ভারতে আসতে পারবেন।
নাগরিকত্ব বদলানোর আগে ভাবুন
এই ঘটনা তাঁদের জন্য বড় শিক্ষা, যাঁরা উন্নত জীবন ও উন্নত সুযোগ-সুবিধার আশায় নিজের মাতৃভূমির নাগরিকত্ব ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। যে কোনো দেশের নাগরিকত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ভেবেচিন্তে নেওয়া উচিত। কারণ সংকটের সময় শেষ পর্যন্ত সেই দেশই পাশে দাঁড়ায়, যার সঙ্গে আপনার শিকড় জড়িয়ে থাকে।
তুরস্কের মতো যেসব দেশ বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব প্রদান করে, তারা অনেক সময় বিপদের মুহূর্তে দায়িত্ব নিতে পিছিয়ে যায়। অন্যদিকে, ভারত সরকারের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তারা তাদের প্রাক্তন নাগরিকদের প্রতিও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখে। নাজনিনের আশা, খুব শিগগিরই তিনি এই প্রশাসনিক জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে নিরাপদে ভারতে ফিরতে পারবেন।