সাতারার শিল্পীর তুলিতে গঙ্গা-যমুনি সংস্কৃতি, প্রদর্শনী নিউইয়র্কে

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 14 h ago
সাতারার শিল্পীর তুলিতে গঙ্গা-যমুনি সংস্কৃতি, প্রদর্শনী নিউইয়র্কে
সাতারার শিল্পীর তুলিতে গঙ্গা-যমুনি সংস্কৃতি, প্রদর্শনী নিউইয়র্কে
 
ভক্তি চালক

এই গল্পের সূত্রপাত ২০২৩ সালে। উত্তরপ্রদেশে সাংবিধানিক পদে থাকা এক নেতা হিন্দু উৎসবের সময় মুসলমানদের দোকান বসানো নিয়ে একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। সেই ঘটনা বহু মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেছিল। তার প্রতিক্রিয়া পৌঁছে গিয়েছিল মহারাষ্ট্র পর্যন্ত, আর সেখানেও তা প্রতিফলিত হয়েছিল একটি ক্যানভাসে।
 
উত্তরপ্রদেশের সেই ঘটনাটি শিল্পী প্রমোদ কুরলেকরের সংবেদনশীল মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ওই মন্তব্যের জবাব তিনি শিল্পের মাধ্যমে দেবেন। সেই সংকল্প থেকেই জন্ম নেয় ‘হিজ নারচারার’ (His Nurturer) শীর্ষক চিত্রকর্ম।
 
পাশ্চাত্য দর্শকদের সঙ্গে চিত্রশিল্পী কুরলেকর
 
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য বার্তা বহনকারী প্রমোদের এই চিত্রকর্ম এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তাঁর আঁকা ছবিটি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ও বৃহত্তম নিলাম সংস্থা সোথেবির নিউইয়র্ক প্রদর্শনীতে স্থান পেতে চলেছে। ‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রমোদ কুরলেকর তাঁর সংগ্রাম এবং এই ব্যতিক্রমী ছবির পেছনের কাহিনি তুলে ধরেছেন।
 
প্রমোদ কুরলেকরের বাড়ি সাতারা জেলার নুনে গ্রামে। সাতারা বরাবরই সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রমোদ বলেন, “আমার পুরো শৈশব কেটেছে ধর্মীয় সম্প্রীতির পরিবেশে। আমার চারপাশে হিন্দু ও মুসলমানরা সবসময় শান্তি ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে বসবাস করেছেন। আমার শিল্পশিক্ষক ছিলেন আর. বি. কুলকার্নি এবং এস. এস. শেখ। ছোটবেলায় আমি কখনও বুঝতেই পারিনি যে তাঁরা ভিন্ন ধর্মের মানুষ।”
 
তিনি আরও বলেন, “জাত, ধর্ম, এসব আমাদের জন্মের পর সমাজ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। জন্মের সময় আমাদের সঙ্গে একটি সাধারণ নামও জুড়ে থাকে না। তারপরও এসবের জন্য মানবতাকে ভুলে যাওয়া নিছক বোকামি। হিন্দু ধর্মে সাধু-সন্তরা ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর শিক্ষা দিয়েছেন, যার অর্থ সমগ্র পৃথিবীই একটি পরিবার। তাহলে এত ঘৃণা কেন?” এই ভাবনা থেকেই ‘হিজ নারচারার’-এর জন্ম।
 
 
ছবির ভাবনা
 
চিত্রকর্মটির ধারণা সম্পর্কে প্রমোদ কুরলেকর বলেন, “উত্তরপ্রদেশের ওই নেতার মন্তব্য আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল। আমি মন্তব্যটিকে অত্যন্ত ভুল বলে মনে করেছি। একজন শিল্পী হিসেবে আমার সংবেদনশীল মন তা মেনে নিতে পারেনি। আজ সবাই একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখছে, আর এর প্রভাব দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর পড়ছে। আমাদের সব ব্যবসা-বাণিজ্যই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাই যদি কেনাবেচা জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে হয়, তবে তা সমাজের বুনোটের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।”
 
তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি ধর্মেই কিছু খারাপ মানুষ থাকে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু যদি আমরা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতি অনুসরণ করি, তাহলে নিরপরাধ মানুষদেরই অন্যায়ের শিকার হতে হবে।”
 
বিশ্বের দরবারে গঙ্গা-যমুনি তেহজিব
 
‘হিজ নারচারার’ ২০২৪ সালে পোর্ট্রেট সোসাইটি অব আমেরিকার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সম্মানিত হয়। এরপর ২০২৫ সালে আর্ট রিনিউয়াল সেন্টারের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ৫,০০০টি ছবির মধ্যে এই চিত্রকর্ম তৃতীয় স্থান অধিকার করে। এবার সেই ছবিই নিউইয়র্কে সোথেবির প্রদর্শনীতে বিশ্বের সামনে উপস্থাপিত হতে চলেছে।
 
সোথেবি এই ছবিটির ভিত্তিমূল্য ২৫,০০০ থেকে ৩৫,০০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ২১ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা) নির্ধারণ করেছে। প্রমোদ বলেন, “আমার উদ্দেশ্য কখনও পুরস্কার জেতা ছিল না। আমি শুধু চেয়েছিলাম, আমার ভাবনাটি যত বেশি মানুষের কাছে সম্ভব পৌঁছাক। আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ এই যে, আমার চিন্তাধারা এখন একটি বিশ্বমঞ্চ পেয়েছে।”
 
তিনি আরও বলেন, “সোথেবির পক্ষ থেকে আমাকে নিলামের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সত্যি বলতে কী, অন্তরের গভীরে এখনও আমি ছবিটি বিক্রি করতে চাই না। কিন্তু যদি আমি এটি বিক্রির জন্য না দিতাম, তাহলে হয়তো তারা প্রদর্শনীতেও রাখত না। কারণ নিলাম এবং প্রদর্শনীই তাদের মূল উদ্দেশ্য। তাই শেষ পর্যন্ত আমি ছবিটি পাঠাতে সম্মত হই।”