দেশভাগ পেরিয়ে আসা রাধাকৃষ্ণ, আজও জ্বলছে ঝুলনের প্রদীপ সাড়ে তিনশো বছরের ঐতিহ্য—কষ্টিপাথরের কৃষ্ণ ও অষ্টধাতুর রাধাকে ঘিরে এখনও অটুট কুলদেবতার আরাধনা

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 22 h ago
দেশভাগ পেরিয়ে আসা রাধাকৃষ্ণ, আজও জ্বলছে ঝুলনের প্রদীপ
দেশভাগ পেরিয়ে আসা রাধাকৃষ্ণ, আজও জ্বলছে ঝুলনের প্রদীপ

শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

ঝুলনের দোলনায় দুলছেন রাধা-কৃষ্ণ। পাশে সারি সারি পুতুল, ছোটদের হাতে সাজানো মণ্ডপ, আর বাড়ির উঠোনজুড়ে উৎসবের আবহ। এই উঠোনেই একসময় বসে পারিবারিক আলোচনা থেকে শুরু করে আড্ডা—সংসারের কত গল্পেরই না সাক্ষী হয়েছে। আজ সেই পরিচিত উঠোনেই সেজে উঠেছে ঝুলনের মণ্ডপ, যেখানে পরিবারের প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি, আনন্দ আর ঐতিহ্য যেন একসঙ্গে মিলেমিশে গেছে।
 
বাইরে থেকে দেখলে এ যেন আর পাঁচটা বাঙালি পরিবারের ঝুলন উৎসব। কিন্তু হুগলি জেলার ভদ্রেশ্বর শহরের চক্রবর্তী পরিবারের এই ঝুলনের গল্পে জড়িয়ে আছে সাড়ে তিনশো বছরের ইতিহাস, দেশভাগের যন্ত্রণা, ভিটেমাটি ছেড়ে আসার স্মৃতি এবং উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনমনীয় সংকল্প।
 
আজকের দিনে যখন বাঙালির ঘর থেকে ঝুলন উৎসব ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, ঝুলনের পুতুল দিয়ে সাজানো মণ্ডপের ঐতিহ্যও প্রায় বিলুপ্তির পথে, তখন ভদ্রেশ্বরের এই পরিবার যেন অন্য এক সময়ের দরজা খুলে দেয়। এখানে এখনও কুলদেবতা রাধাকৃষ্ণকে ঘিরে পালিত হয় ঝুলন। আর সেই রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তিই পরিবারের কাছে শুধু দেবতা নন—তাঁরা যেন কয়েক শতাব্দীর পারিবারিক স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের জীবন্ত সাক্ষী।
 
ঢাকার ঠাকুরদালান থেকে ভদ্রেশ্বরের ঠাকুরঘর চক্রবর্তী পরিবারের বর্তমান অভিভাবক নারায়ণ চক্রবর্তী জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল বাংলাদেশের ঢাকায়। সেই সময় থেকেই পরিবারের ঠাকুরদালানে পূজিত হয়ে আসছেন এই রাধাকৃষ্ণ।কষ্টিপাথরে নির্মিত শ্রীকৃষ্ণ এবং অষ্টধাতুর রাধার এই যুগল মূর্তির বয়স ঠিক কত, তার লিখিত হিসাব পরিবারের কাছেও নেই। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পারিবারিক স্মৃতি বলছে, প্রায় ৩৫০ বছর ধরে এই মূর্তির আরাধনা হয়ে আসছে।
 
নারায়ণবাবুর কথায়, তাঁর পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই যুগল মূর্তি পরিবারের কুলদেবতা হিসেবে পূজিত। বারো মাসে তেরো পার্বণের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে ছিল তাঁদের পারিবারিক জীবন। পুজো-পার্বণ, উৎসব-অনুষ্ঠান—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিলেন রাধাকৃষ্ণ।দেশভাগ এল, বদলে গেল ঠিকানা—বদলাল না কুলদেবতার ঠিকানাতারপর এল ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়—দেশভাগ।ভিটেমাটি, সম্পত্তি, পরিচিত পরিবেশ—সবকিছু পিছনে ফেলে বাংলাদেশ থেকে এপার বাংলায় চলে আসতে হয় চক্রবর্তী পরিবারকে। কিন্তু সেই কঠিন সময়েও একটি জিনিস তাঁরা ফেলে আসতে পারেননি।রাধাকৃষ্ণের সেই যুগল মূর্তি।
 
পরিবারের কাছে তাঁরা শুধু পাথর ও ধাতুতে তৈরি প্রাচীন বিগ্রহ ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন বংশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশ্বাস, স্মৃতি, আশ্রয় এবং কুলপরম্পরার প্রতীক। তাই দেশভাগের ঝড়ে ঠিকানা বদলালেও রাধাকৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়েই এপার বাংলায় পা রাখেন পরিবারের সদস্যরা।
হুগলি জেলার ভদ্রেশ্বর শহরে নতুন করে জীবন শুরু করার পর ধীরে ধীরে তৈরি হয় নতুন সংসার, নতুন ঠাকুরঘর। আর সেই নতুন ঠাকুরঘরেও যথাযোগ্য মর্যাদায় স্থান পান ঢাকার পুরনো বাড়ি থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা রাধাকৃষ্ণ।সাড়ে তিনশো বছরের কৃষ্ণ, অষ্টধাতুর রাধা চক্রবর্তী পরিবারের ঠাকুরঘরে আজও যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে সেই প্রাচীন যুগল মূর্তি।কষ্টিপাথরের কৃষ্ণ—গাঢ় কালো পাথরে নির্মিত, আর তাঁর পাশে অষ্টধাতুর রাধা।
 
সময়ের ক্ষত তাঁদের গায়ে থাকলেও পরিবারের কাছে তাঁদের গুরুত্ব একটুও কমেনি। বরং প্রজন্ম যত এগিয়েছে, তাঁদের ঘিরে বিশ্বাস ও আবেগ আরও গভীর হয়েছে।নারায়ণ চক্রবর্তী বলেন, এই মূর্তির সঠিক বয়স তিনিও জানেন না। তবে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনে এসেছেন, কয়েক শতাব্দী ধরে এই যুগলই তাঁদের পরিবারের কুলদেবতা। তাঁর প্রপিতামহের সময়েও এই বিগ্রহ ঠাকুরঘরে পূজিত হতেন।তাঁর বিশ্বাস, জীবনের নানা ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে পরিবারকে আগলে রেখেছেন এই রাধাকৃষ্ণ। তাই কুলদেবতার প্রতি শ্রদ্ধা শুধু পুজোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—তাঁদের সংরক্ষণও পরিবারের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
 
ঐতিহ্য এবার ছোটদের হাতে পরিবারের চার ভাইয়ের মধ্যে বর্তমানে এই প্রাচীন বিগ্রহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে নারায়ণ চক্রবর্তীর হাতে। তবে তিনি জানেন, এই দায়িত্ব তাঁর একার নয়। একদিন তা চলে যাবে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে।আর সেই উত্তরাধিকার হস্তান্তরের কাজ যেন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।পরিবারের ছোটরা এখন নিজেরাই আগ্রহ নিয়ে ঠাকুরঘরের বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে। বড়দের দেখে শিখছে পুজোর নিয়ম, সাজসজ্জা, আয়োজন। এবারের ঝুলনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
 
বাড়ির কচিকাঁচাদের হাতেই তৈরি হয়েছে ঝুলনের মণ্ডপ। নিজেদের পছন্দমতো সাজিয়েছে তারা। আর সেই সাজানো ঝুলনে পরিবারের বড়রা শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছেন সেই সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো কষ্টিপাথরের কৃষ্ণ ও অষ্টধাতুর রাধাকে।এ যেন নিছক একটি উৎসব নয়—এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে ইতিহাস তুলে দেওয়ার মুহূর্ত।৭৬ বছর বয়সেও চোখে সেই পুরনো দিনের ঝুলন পরিবারের প্রবীণতম সদস্যদের অন্যতম ৭৬ বছরের কল্যাণী চক্রবর্তী। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। তারপর থেকেই দেখে আসছেন এই পরিবারের পুজো-পার্বণ ও ঝুলনের পরম্পরা।ঠিক কত বছরের পুরনো এই পুজো, তার হিসাব তাঁর কাছেও নেই। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একইভাবে রাধাকৃষ্ণের আরাধনা হয়ে আসতে দেখেছেন তিনি।
 
তাঁর চোখে এই উৎসবের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়—এটি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, পরিবারের সকলকে একসঙ্গে বেঁধে রাখার একটি উপলক্ষ।
বর্তমানে পরিবারের সদস্যসংখ্যা প্রায় ১৫-১৬ জন। উৎসব এলেই সকলে একত্রিত হন। নিজেদের হাতে আয়োজন, নিজেদের হাতে সাজসজ্জা, নিজেদের মধ্যেই আনন্দ—একটি ছোট সংসার যেন পরিণত হয় এক বৃহৎ পারিবারিক উৎসবের আসরে।জাতি-বর্ণের ঊর্ধ্বে উৎসবের আনন্দ
চক্রবর্তী পরিবারের উৎসব শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সারা পাড়ার প্রতিবেশীরা জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে নিয়মিত তাঁদের পুজো-পার্বণ ও অনুষ্ঠানে সামিল হন। এবারের ঝুলনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আশপাশের মানুষ স্বেচ্ছায় আনন্দে যোগ দিয়েছেন, আর পরিবারের সদস্যরাও তাঁদের আন্তরিক অতিথি আপ্যায়নে বরণ করে নিয়েছেন।
 
যে ঝুলনের পুতুল আজ হারিয়ে যাচ্ছে,একসময় বাংলার বহু বাড়িতে ঝুলন মানেই ছিল ছোট ছোট পুতুল দিয়ে তৈরি এক বিস্ময়কর জগৎ। কোথাও কৃষ্ণলীলা, কোথাও গ্রামবাংলার দৃশ্য, কোথাও সংসারের ছবি—শিশুদের কল্পনা আর বড়দের শিল্পবোধ মিলিয়ে তৈরি হত ঝুলনের মণ্ডপ।কালের স্রোতে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং উৎসব পালনের ধরন বদলে যাওয়ায় ঝুলনের সেই পুতুল-সাজানো জগৎ এখন আর খুব একটা দেখা যায় না।
 
সেই জায়গাতেই হুগলি জেলার ভদ্রেশ্বর শহরের চক্রবর্তী পরিবারের ঝুলন যেন বিশেষ বার্তা দেয়।এখানে এখনও পুতুল দিয়ে সাজানো হয় ঝুলনের মণ্ডপ। আর সেই আয়োজনের মূল কারিগর এখন পরিবারের শিশুরাই।উৎসবের থেকেও বড় যে উত্তরাধিকার ,চক্রবর্তী পরিবারের এই ঝুলন তাই শুধু একটি পারিবারিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি যেন বাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ছোট্ট কিন্তু উজ্জ্বল নিদর্শন।দেশভাগ পরিবারটির ঠিকানা বদলে দিয়েছে। সময় বদলেছে। বদলেছে জীবনযাত্রা। অনেক পুরনো উৎসবের জৌলুসও ম্লান হয়েছে। কিন্তু বদলায়নি একটি বিষয়—কুলদেবতার প্রতি বিশ্বাস এবং তাঁকে ঘিরে থাকা পারিবারিক পরম্পরা।
 
ঢাকার পুরনো ঠাকুরদালান থেকে হুগলি জেলার ভদ্রেশ্বর শহরের নতুন ঠাকুরঘর—সাড়ে তিনশো বছরের পথ পেরিয়ে আজও একইভাবে পূজিত হচ্ছেন কষ্টিপাথরের কৃষ্ণ ও অষ্টধাতুর রাধা।আর সবচেয়ে আশার কথা, এই উত্তরাধিকার থেমে নেই।আজ পরিবারের প্রবীণরা যে দায়িত্ব এতদিন বহন করেছেন, তা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বাড়ির কচিকাঁচাদের হাতে। তারা শুধু দেখে শিখছে না, নিজেরাই অংশ নিচ্ছে। নিজেরাই সাজাচ্ছে ঝুলন, নিজেরাই উৎসবের আনন্দে মেতে উঠছে।
 
তাই চক্রবর্তী পরিবারের ঝুলন আসলে একটি পরিবারের উৎসবের গল্প নয়। এটি হারিয়ে যেতে বসা বাঙালিয়ানাকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার গল্প।যে রাধাকৃষ্ণকে দেশভাগের ঝড়ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি, সময়ের স্রোতও তাঁদের আরাধনা থামাতে পারেনি। আজও সেই কুলদেবতার সামনে প্রদীপ জ্বলে, পূজা হয়, ঝুলন দোলে।আর সেই দোলনার ছন্দে যেন শোনা যায় একটাই কথা—ঐতিহ্য হারিয়ে যায় না, যদি কেউ তাকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে জানে।
 
হুগলি জেলার ভদ্রেশ্বর শহরের চক্রবর্তী পরিবার সেই বিশ্বাসেরই এক জীবন্ত নিদর্শন।