Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 16 h ago
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিলিগুড়িতে
তরুণ নন্দী / কলকাতা
ভারতের মানচিত্রে আকারে ছোট, কিন্তু কৌশলগত গুরুত্বে বিশাল, শিলিগুড়ি করিডর। মাত্র কয়েক দশক কিলোমিটার বিস্তৃত এই সরু ভূখণ্ডই উত্তর-পূর্ব ভারতের আট রাজ্যকে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত করে রেখেছে। তাই ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত এই করিডরের নিরাপত্তা শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরবঙ্গের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক ভূকৌশল।
এই সংবেদনশীল অঞ্চলকে ঘিরে নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিলিগুড়িতে একটি বিশেষ ‘ত্রিকোণ নিরাপত্তা বলয়’ বা Triangular Security Grid-এর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। ধুবড়ি, কিষাণগঞ্জ ও চোপড়াকে কেন্দ্র করে এই নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য হল করিডরের বিভিন্ন প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজ্য প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেনস নেক’?
শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্ব বোঝার জন্য ভারতের ভৌগোলিক মানচিত্রের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর অংশ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এই করিডরের একদিকে নেপাল ও ভুটান, অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্ত। কাছেই রয়েছে সিকিম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সীমান্ত।
অর্থাৎ, এই একটি অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে ভারতের একাধিক আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিরাপত্তা পরোক্ষভাবে জড়িত। কোনও কারণে এই করিডরের সড়ক ও রেল যোগাযোগ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই ‘চিকেনস নেক’কে শুধুমাত্র একটি যোগাযোগপথ হিসেবে নয়, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার লাইফলাইন হিসেবেও দেখা হয়।
ত্রিকোণ নিরাপত্তা বলয় কীভাবে কাজ করবে?
প্রস্তাবিত নিরাপত্তা কাঠামোর মূল ভাবনা হল করিডরকে একটি নির্দিষ্ট দিক থেকে নয়, একাধিক কৌশলগত অবস্থান থেকে নজরদারির আওতায় আনা। ধুবড়ি, কিষাণগঞ্জ ও চোপড়াকে ঘিরে গড়ে উঠতে চলা এই ত্রিভুজাকার নিরাপত্তা কাঠামো সক্রিয় হলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং করিডরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
আধুনিক প্রযুক্তিও এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। ড্রোন নজরদারি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, রিয়েল-টাইম তথ্য আদানপ্রদান এবং গোয়েন্দা তথ্যের দ্রুত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সীমান্তে অস্বাভাবিক গতিবিধি শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ, নিরাপত্তার ধারণাটি এখন শুধু সীমান্তে জওয়ান মোতায়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ‘মানুষ + প্রযুক্তি + গোয়েন্দা তথ্য + দ্রুত প্রতিক্রিয়া’, এই চার স্তম্ভই হতে পারে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক ভূকৌশলেও ‘চিকেনস নেক’ গুরুত্বপূর্ণ
শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পৌঁছেছে। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত সংযোগস্থল।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও যোগাযোগ, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে ভারতের বৃহত্তর Act East সংযোগ, সব ক্ষেত্রেই উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা নয়; এর অর্থ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সংযোগ ব্যবস্থাকেও সুরক্ষিত রাখা।
চীন প্রসঙ্গেও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শিলিগুড়ি করিডরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মাত্রা রয়েছে। এর কাছেই রয়েছে সিকিম ও উত্তরবঙ্গের সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চল। আরও উত্তরে রয়েছে ভারত-চীন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এই কারণে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা শুধু সাধারণ নাগরিক পরিবহণের জন্য নয়, প্রয়োজনে সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ দ্রুত উত্তর সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় এই ধরনের যোগাযোগপথ এখন ‘Strategic Infrastructure’ হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি সড়ক, রেললাইন, সেতু বা গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা তাই সামরিক পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিলিগুড়িতে
সীমান্ত সুরক্ষা কেন বড় চ্যালেঞ্জ?
চিকেনস নেকের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ, পাচার, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি বা অন্যান্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও রাজ্য প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সীমান্ত নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, সীমান্ত নিরাপদ না হলে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই বিএসএফ, এসএসবি, রাজ্য পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
‘তিস্তা প্রহার’ থেকে বাস্তব সামরিক প্রস্তুতি
শুধু প্রশাসনিক নিরাপত্তা নয়, সামরিক প্রস্তুতির দিক থেকেও উত্তরবঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা ও উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় সামরিক মহড়া ভারতীয় বাহিনীকে পাহাড়, নদী ও সীমান্তবর্তী ভূখণ্ডে দ্রুত অভিযান এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অনুশীলনের সুযোগ দেয়।
এর ফলে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা ও রসদ সরবরাহ, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ সচল রাখা এবং উত্তর-পূর্বে সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
নিরাপত্তার নতুন ধারণা: শুধু কাঁটাতার নয়
চিকেনস নেককে নিরাপদ করতে সীমান্তে কাঁটাতার গুরুত্বপূর্ণ হলেও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিধি তার চেয়ে অনেক বড়। গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ, জাতীয় সড়ক, সেতু, বিমানবন্দর, টেলিকম নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও একই নিরাপত্তা ছাতার আওতায় আনতে হবে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিলিগুড়িতে
কারণ ভবিষ্যতের সংঘাত শুধু স্থলসীমান্তে হবে না। ড্রোন, সাইবার আক্রমণ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যযুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ফলে ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কতটা নিরাপদ হবে শিলিগুড়ি করিডর?
ত্রিকোণ নিরাপত্তা বলয় বাস্তবায়িত হলে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা কাঠামো নিঃসন্দেহে আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত বলে ধরে নেওয়া যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে, সীমান্তে কার্যকর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যের দ্রুত আদানপ্রদান এবং সংকটের সময় দ্রুত প্রতিক্রিয়া।
এর পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বিকল্প সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগের পরিকাঠামো যত বাড়বে, একটি মাত্র করিডরের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতাও তত কমবে। অর্থাৎ, ‘চিকেনস নেক’কে সুরক্ষিত করার পাশাপাশি তার বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থাও তৈরি করা জাতীয় নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হওয়া উচিত।
একটি সরু ভূখণ্ড, কিন্তু ভারতের বিশাল নিরাপত্তা প্রশ্ন
শিলিগুড়ি করিডর তাই নিছক একটি সরু স্থলপথ নয়। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের জীবনরেখা, উত্তর সীমান্তের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূকৌশলগত মানচিত্রের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পয়েন্ট।
প্রতীকী ছবি
অমিত শাহের ঘোষিত ত্রিকোণ নিরাপত্তা বলয় সেই কারণে শুধু একটি নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনা নয়, এটি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও সমন্বিত করার একটি প্রচেষ্টা।
‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা যত শক্তিশালী হবে, ততই শক্তিশালী হবে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সংযোগ। আর সেই কারণেই মাত্র কয়েক দশক কিলোমিটার চওড়া এই ভূখণ্ডের গুরুত্ব ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার মানচিত্রে এতটাই বড়।